মাধবীলতা ও মার্চের মধ্যাহ্ন

বর্ষার ভরা নদীর বুকে হঠাৎ করে ভেসে উঠা শুশুকের মতো ভেসে উঠে সব। সেই নদী এখন শুকিয়ে গেছে । ভরা নদী এবং ব্রহ্মপুত্রের বুকে ফুস করে ভেসে আবার পরক্ষণেই ডুব দেয়া শুশুক- দুটোই এখন স্মৃতি। উড়ে যাওয়া পাখির পালকের মতো রয়ে গেছে নদীর রেখা। শুশুকেরা কোথায় কে জানে। নদীর কথা মনে হলেই আমার মনে পড়ে ব্রহ্মপুত্রের কথা। মনে পড়ে শুশুকের কথা। কিন্তু সবচেয়ে বেশি মনে পড়ে মাধবীলতার কথা। বিশেষ করে যখন মার্চের নিদাঘ দুপুরে কোনো গাছের অদৃশ্য কোণ থেকে কোকিল কিংবা ঘুঘু ডেকে উঠে অথবা পাড়ার কোনো মাইকে বজ্রকন্ঠে বেজে উঠে- আর যদি একটা গুলি চলে…।

কিন্ত, হায়, পরিহাস, আজো আমার চেনা হয়নি মাধবীলতা। শুধু কি তাই? রবি ঠাকুরের “ওই মালতীলতা দোলে”কে ভুল করে কতো দিন যে ‘মাধবীলতা দোলে’ বলে গুনগুন করে গেয়ে গেছি! আমি আসলে জবা, গোলাপ, রজনীগন্ধা, হাস্নুহেনার মতো পরিচিত কিছু ফুলের বাইরে অন্য সব ফুলদের তেমন চিনিই না। ক্লাস এইট নাইনে পড়ার সময় ড্যাফোডিল নামের ফুল নিয়ে লেখা ইংরেজি কবিতার ক্লাসে কে যেন স্যারকে জিজ্ঞেস করেছিল, স্যার ড্যাফোডিল ফুল কুনডা? এর বাংলা কী? স্যার খেকিয়ে উঠে বলেছিলেন, এই সব ইংলিশ ফুল। তর অতো ফুল চিননের দরকার নাই, সামারি মুখস্ত কর। তার মানে এই নয় যে গ্রামের হাইস্কুলের শিক্ষক আমাদের কৌতূহলে পানি ঢেলে দিয়েছিলেন বলেই ফুল বিষয়ে আমার আগ্রহ কমে গেছে। সত্যি বলতে কী, কোন বিষয়ে যে আমার খুব কৌতূহল আছে সেটা আমি নিজেও জানি না। মাধবীলতা যেমন আমি চিনি না, তেমনি চিনি না করবী ফুলও। ইন্টারমিডিয়েটে পাঠ্য ছিল আত্মজা ও একটি করবী গাছ নামের একটা গল্প। সে গল্পের বাবাটা একটা করবী গাছ লাগাতে চেয়েছিল, ফুলের জন্য নয়, করবী ফুলের বিচির জন্য। ‘চমৎকার বিষ হয় করবী ফুলের বিচিতে’ -পরীক্ষার খাতায় প্রসঙ্গ উল্লেখপূর্বক ব্যাখ্যা লিখবার জন্য ছাইপাশ কত্তো কিছু মুখস্ত করেছি। কিন্তু করবী গাছকে আমার চেনা হয়নি। আমার ভেতরে বিষের অভাব ছিল না। নতুন করে বিষদায়িনী করবী গাছ চেনার মানে ছিল না কোনো।

থাক, আমি বরং মাধবীলতার কথাই বলি। গ্রাম থেকে মফস্বল শহরের কলেজে পড়তে এসেছিলাম আমরা। আমরা মানে আমি, ফোরকান আনাম । থাকি কলেজের হস্টেলে। সেদিন ব্রহ্মপুত্রের পাড়ের সবুজ মাঠে বিকেলের আড্ডা সেরে যাচ্ছিলাম জালালদের বাসায়। ওর বাসায় আগে যাওয়া হয়নি। জালাল আমাদের নিয়ে চলে। কথা বলে কম। আনাম সিগারেট কেনার জন্য একটা দোকানে দাঁড়ায়। জালাল চা পান সিগারেট কিছুই খায় না। ও বাধ সাধে, বলে, এখন সিগারেট খেলে আর তোদের আমাদের বাসায় নিয়ে যেতে পারব না?

  • কেন? আমার সিগারেট খাওয়ার সাথে তোদের বাসায় যাওয়া বা না যাওয়ার কী সম্পর্ক? খেকিয়ে জিজ্ঞেস করে আনাম।
  • আছে। বাবা ঠিক সিগারেটের গন্ধ পাবে ।আর পরে আমাকে এর জবাবদিহি করতে হবে। জালাল কৈফিয়ত দেয়ার ভঙ্গিতেই জানায়।
  • আমি তো নিজের বাপের পয়সাতেই সিগারেট খাই। তাতে অন্যের বাপের কী। হঠাৎ করেই বেশ রেগে গিয়ে বলে আনাম। এর সাথে যোগ করে, যাহ, তোদের বাসাতেই যাবো না।

বলেই উলটো দিকে হাঁটা শুরু করে। পরিস্থিতির আকস্মিক পরিবর্তনে আমরা বিভ্রান্ত বোধ করি। ওর ঝগড়াটে কথায় যার বেশি আহত হওয়ার কথা সেই জালালই থামায় আনামকে। বলে, প্লিজ দোস্ত, মাইন্ড করিস না। মা তোদের জন্য নাস্তা রেডি করে বসে থাকবে। এখন না হয় সিগারেটটা নাই বা খেলি। প্লিজ চল। এরপর আমরাও যোগ দেই জালালের সাথে।আনাম আর গো ধরে না। গোধূলী মাড়িয়ে আমরা এগুতে থাকি জালালদের বাড়ির দিকে।

পথের ধারে সাদা ছোট্ট দো’তলা বাড়ি। নামফলকে বাড়ির নাম “মাধবীলতা” এসব নাম নিয়ে আমার কখনো কোনো বাড়তি কৌতূহল হয় না। এসব নামকে বরং আমার কেমন আদিখ্যেতা মনে হয়। ফুলের রাজা গোলাপ হলেও এই নামে আমি কোনো বাড়ির নাম দেখিনি যেমন দেখি করবী, রজনীগন্ধা, মাধবীলতা- এই সব ফুলের নামে।আমরা চার বন্ধু আজিজ সড়কের পাশের অই বাড়ির সামনে দিয়ে যাওয়ার সময় আনাম খেয়াল করেছিল সাদা মার্বেল পাথরের উপর খোদাই করে কালো কালির প্রলেপ দিয়ে লেখা ‘মাধবীলতা”। খুব নিরিখ করে না দেখলে চোখে পড়বে শুধু ‘বীলতা’ ‘মাধ’ লেখার কালো রঙ মুছে গেছে। নদী মরে গেলেও যেমন রেখা থেকে যায় মাধবীলতা’র মাধ মুছে যাওয়ার পরও আনামের শকুন চোখ মাধবীলতার পদরেখা ধরে আবিষ্কার করে বাড়িটির নাম মাধবীলতা।

আনাম জালালের দিকে তাকিয়ে বলেছিল, বেশ ইন্টারেস্টিং, না? জালাল বলে, কী ইন্টারেস্টিং?

কেন, এই বাড়ির নামটা? ময়মনসিংহ শহরে দেখলাম বাড়ির নাম ছালেহা কুটির, মাতৃছায়া, রওশন ভিলা। এমন রোমান্টিক নাম একটাও দেখলাম না। মাধবীলতা। বাহ।

জালাল বলে, মুখে কপট হাসি, কই মাধবীলতা? আমি তো দেখছি বীলতা। আসলে এটা হওয়া উচিত ছিল বোলতা । ওর অর্থবোধক হাসিতে বুঝি ওর কথার ভাবসম্প্রসারণ করতে হবে। জালাল আমদের আড্ডায় অধিকাংশ সময়ই শ্রোতার ভূমিকাই পালন করে। কিন্তু যখন কিছু বলে তখন সেটা ভাবসম্প্রসারণের লাইনের মতো অনেক সময় নেয় সম্প্রসারিত হওয়ার।

আমাদের পীড়াপিড়িতে জালাল জানায় মাধবীলতা নাসরিনদের বাড়ি। গলায় পানি আটকে গেলে যেমন হয়, নাসরিনের কথা শুনে আমাদের কারু কারুর তেমনটি হলো। শ্যামলা,ছিপছিপে গড়নের নাসরিন ছেলেমহলে আলোচনার বিষয় হলেও প্রায় সবাই ওর সাথে নিরাপদ দূরত্বই বজায় রাখে। মফস্বল শহরের কো এডুকেশনের কলেজে হাতে গোনা ক’জন মেয়ে পড়ে। হুড- ঢাকা রিক্সায় এসে সোজা মেয়েদের কমনরুম, সেখান থেকে লেকচারারদের পেছন পেছন ক্লাসে যাওয়া- এর বাইরে মেয়ে সহপাঠীদের দেখা পাওয়া যায়না। কিন্তু নাসরিন কলেজের ফাংশানে গান গায়, বিতর্ক প্রতিযোগিতায় অংশ নেয়। সবচেয়ে বড় কথা রীতিমতো রাজনীতি করে। হাতে গোনা যে অল্প কয়েকজন কলেজে ছাত্র ইউনিয়ন করতো নাসরিন ছিল তাদের অন্যতম। আমরা শুনেছি নাসরিনের বাবা বেশ উচ্চ শিক্ষিত, সংস্কৃতিসেবী এবং একই সাথে বেশ সচ্ছল সজ্জন মানুষও। অন্য মেয়েরা যেখানে ছেলে সহপাঠিদের সাথে একদমই কথা বলে না, নাসরিন সেখানে রীতিমতো ভোকাল। বিশেষ করে অন্যায় বা অন্যায্য কথার উচিত জবাব দিয়ে নাসরিন ইতোমধ্যে সতীর্থদের সমীহ আদায় করে নিয়েছে।

তার মানে,জালাল প্রকারান্তরে নাসরিনকে যে বোলতা অভিধায় ভূষিত করেছে, সে অভিধায় আমাদের আপত্তি করার তেমন কিছু থাকে না। তারপরেও আমরা জালালকে জিজ্ঞেস করি, নাসরিনকে বোলতা বলার অন্য কোনো কাহিনী আছে কী না। আবারো মিচকে হেসে জালাল বলে, নাহ, আর কী থাকবে। আবারো ওর কথায় আমরা রহস্যের গন্ধ পাই। আনাম ফোড়ন কাটে, অই মিচকে জালাল নিশ্চয় বোলতার কামড় খেয়েছে। বলেই খ্যাক খ্যাক করে পিত্তি জ্বালানো হাসি হাসে। জালালের পেটের কথা বের করার জন্য আমরাও সুর মেলাই আনামের কথায়। আমাদের সম্মিলিত বুলিংয়ে জালালকে বিপর্যস্ত দেখায়। ওর চোখমুখ লাল হয়ে উঠে। আনাম সেই সুযোগে আবার বলে, দ্যাখ, লাল্টুস জালাল কেমন ব্লাশ করছে। তারপর জালালের দিকে তাকিয়ে বলে, বলে ফ্যাল দোস্ত, নাসরিন তোকে কেন প্যাদানি দিয়েছিল?

কী বাজে বকিস? আমি নাসরিনের প্যাদানি খাবো কেন? আমি কি তোর মতো লাফাঙ্গা যে মেয়ে দেখলেই প্রেমে পড়ে যাব? জালাল আত্মপক্ষ সমর্থনের ভঙ্গিতে বলে।

এরপর নাসরিনকে জালালের প্রেম নিবেদন এবং এই প্রেক্ষিতে নাসরিনের হাতে জালালের নাজেহাল হওয়ার কল্পিত দৃশ্যপট নিয়ে আমরা আরো কিছুক্ষণ রগড় করি। এবং জালাল শেষ পর্যন্ত নাসরিনকে বোলতা বলার আসল কাহিনী খোলাসা করতে বাধ্য হয়।

কিছুদিন আগের ঘটনা। মহল্লার এক ছেলে প্রায়ই নাসরিনকে অনুসরণ করতো। পয়সাওয়ালা ফ্যামিলির ছেলে। বাবার রড সিমেন্টের বড় দোকান। আবার রাজনীতিও করে। মুসলিম লিগার। তবে জালালরা ওই ছেলেকে ভদ্র, ভাল ছেলে বলেই জানে। আমাদের কলেজ থেকেই কিছুদিন আগে বিএ না বিএসসি পাশ করেছে। একদিন নাসরিনদের কাজের ছেলের হাতে চিঠি পাঠিয়েছে নাসরিনের কাছে। চিঠি মানে প্রেমপত্র। চিঠির সম্ভাষণ না কি ছিল ‘মাধবীলতা’। আর ছিল- ‘ তোমাদের বাড়ি মাধবীলতার মাধ তো মুছে গেছে। আছে বীলতা। কবে যে এটা বোলতা হয়ে যাবে কে জানে? ইত্যাদি। তারপর একদিন, রাস্তায় সেই ছেলেকে পেয়ে নাসরিন নিয়েছিল একহাত। বেশ কয়েকজনের সামনেই বলেছিল, আর কোনো দিন আপনাকে আমার পেছনে দেখলে বা চিঠিফিঠি পাঠালে বোলতার কামড় কাকে বলে টের পাবেন। ছেলেটা আগুন-লাগা ঘর থেকে বের হবার মতো সন্ত্রস্ত ভঙ্গিতে নিষ্ক্রান্ত হয়েছিল নাসরিনের সামনে থেকে।

দেশে আসে সত্তুরের নির্বাচন। আমরা তখনো ভোটার হইনি। কলেজে ইতিমধ্যেই হাতে খড়ি হয়েছে ছাত্ররাজনীতির। ছাত্রলীগের মিছিলে যাই মাঝেমধ্যে। ওইটুকুই। ১৯৭০ এর ডিসেম্বরের নির্বাচনে নৌকার কর্মী হিসেবে আমাদের ব্যস্ততার সীমা থাকে না। বঙ্গবন্ধু পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হবে, এই স্বপ্নে বিভোর হয়ে আমরা জয় বাংলা স্লোগানে পাড়া মাতাই। বাড়ির পয়সা খরচ করে গলাকাটা বাজারে টানাই বিশাল নৌকা। সেই নৌকা ছিঁড়ে ফেলার চেষ্টা করলে মুসলিম লিগার হেলিম মৌলভীর লোকজনের সাথে মারামারিও করি। মায়ের কাছে অভিযোগ আসে মৌলভী সাহেবের লোকজনের নিকট থেকে।‘মুসলেহ উদ্দীন মাস্টার সাহেবের মতো সম্মানী মানুষের ছেলে গুন্ডামি করে’- ইত্যাকার অভিযোগ। মা আমাকে বোঝান, নৌকা করবি ভাল কথা, কিন্তু মারামারি করতে হবে কেন?

বিশাল জয় পেয়েছে আওয়ামী লীগ। ইলেকশনের তিন মাস পেরোলেও ক্ষমতা হাতে পান না বঙ্গবন্ধু। পরিস্থিতি ক্রমশই সঙ্গীন হয়ে উঠে। মিছিলে সোচ্চার থাকে কলেজ প্রাঙ্গণ। ফার্স্ট ইয়ারের ছাত্র আমি। তারপরও কীভাবে যেন আমিও হয়ে গেছি নেতা গোছের। মিছিলের সামনেই থাকি। আমাদের মিছিলে এখন যোগ দেয় নাসরিন ও আরো ক’জন মেয়ে। ৭ই মার্চের ভাষণে বঙ্গবন্ধু আমাদের রক্তকে আরো তাতিয়ে দেন। সে সময় একদিন, মেয়েদের কমন রুমের সামনে, ঘরের ছায়ায় দাঁড়িয়ে নাসরিন বলেছিল, বঙ্গবন্ধুর ভাষণ শুনেছো? ইসস, ভাবলেই রক্তে তোলপাড় জাগে, না? কীভাবে বললেন, আর যদি একটা গুলি চলে…। সে যতোটুকু সম্ভব ভরাট গলায়, তর্জনী উঁচিয়ে বঙ্গবন্ধুর নকল করে আবার বলে, আর যদি একটা গুলি চলে… । আমি মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকি শ্যামলা মেয়েটার দিকে। নাসরিন আমার দিকে তাকায় না। নিজের মনেই যেন বলে, আমার মন বলছে, এবার সত্যিই যুদ্ধ শুরু হবে। এরপর আমাকে বলে, ইলেকশনের সময় তুমি নাকি নৌকা ছেঁড়া নিয়ে কাদের সাথে মারামারি করেছো। কার কাছে জানি শুনলাম। এবার কিন্তু সত্যি সত্যি যুদ্ধে নামতে হবে। নাসরিন এমনভাবে বলে যেন সে আমাদের ক্লাসমেট না, কোনো মায়াবতী শিক্ষিকা, যিনি দুষ্টু ছেলের মাথায় হাত বুলিয়ে বলছেন, লক্ষীসোনা এত দুষ্টুমি করতে হয় না, পড়ালেখাতেও মনোযোগ দিতে হয়। সেদিন নাসরিনকে আমার অন্যরকম ভাল লেগেছিল।

সে-ই ছিল নাসরিনের সাথে আমার শেষ দেখা। যুদ্ধের ঘনঘটা শুরু হতেই কলেজ বন্ধ হয়ে গেল। আমি এবং আমার মতো কলেজের হস্টেলে থেকে পড়াশোনা করা গ্রামের ছেলেরা ফিরে এলাম গ্রামে।

যুদ্ধের আঁচ আমাদের গ্রামে লাগল যুদ্ধ শুরু হওয়ার মাস খানেক পর থেকে। আমাদের প্রতিদিনের অভিধানে যুক্ত হলো নতুন কিছু শব্দ- মুক্তিযুদ্ধ, মুক্তিযোদ্ধা, হানাদার, গুলি, মেশিনগান, এসএমজি, এলএমজি, শান্তি কমিটি, রাজাকার, আলবদর ইত্যাদি।শুনতে পাই কলেজ ইউনিভার্সিটির ছাত্র শিক্ষক, বিভিন্ন শ্রেণি পেশার মানুষ দলে দলে যাচ্ছে মুক্তিযুদ্ধে।তবে আমাদের এলাকার চেনাপরিচিত কেউ যুদ্ধে গেছে এমন খবর পাই না।

আমার বুঝতে অসুবিধা হয় না বাড়ির সবার আমার উপর বাড়তি নজর। বড় দুই ভাই আছে, একজন চাকুরিজীবী, অন্যজন বয়সে আমার চেয়ে বছর দু’য়েকের বড়। যুদ্ধে যাবার বয়স তাদেরই। কিন্তু তাদের কেউ যুদ্ধে যাবে, এমন আশংকা নেই। আশংকা আমাকে নিয়েই। মা একদিন, গায়ে হাত দিয়ে বলেন, তোদের বাবা বেঁচে নেই। তোরাই আমার অবলম্বন। হুট করে যুদ্ধে যাস নে বাপ। এক জীবনে যে কষ্টের ভেতরে আছি, নতুন করে আমার কষ্ট আর যেন বাড়াসনে। মাকে আমি মুখের কথায় আশ্বস্ত করি ঠিকই। কিন্তু মনে মনে পুরো প্রস্তুতি নিই, সুযোগ খুঁজি যুদ্ধে যাওয়ার। কিন্তু কোথায় যাবো, কীভাবে যাবো কিছুই জানি না। কানে খবর আসে , নদীর ওপাড়ে হোসেনপুরে মুক্তিযোদ্ধাদের ক্যাম্প আছে। কোনরকমে ওখানে গিয়ে পড়লেই হলো। এরপর ট্রেনিং, অস্ত্র যোগাড় সব ওরাই করবে।

এক সকালে নামাজের জন্য প্রস্তুতি নিতে মা গেছেন ঘরের বাইরে, বাড়ির অন্যান্যরা তখনো ঘুমে। সন্তর্পনে ঘর থেকে বেকো সাইকেলটা বের করে, চটের থলেতে বাড়তি একটা শার্ট আর লুঙ্গি নিয়ে বের হই হোসেনপুরের উদ্দেশ্যে। খুরশিদমহলের বটতলার খেয়াঘাটে যেতে আমার আধা ঘন্টাও লাগে না । কিন্তু আমাকে অপেক্ষা করতে হয় নদী পাড় হওয়ার জন্য খেয়া নৌকার জন্য। পুরাতন ব্রহ্মপুত্রের উপর ব্রিজটা তখনো হয়নি। নদী পার না হয়ে হোসেনপুর যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। আমি অপেক্ষা করি। ততক্ষণে বাড়ির সবাই টের পেয়ে গেছে যে আমি সাইকেল নিয়ে পালিয়েছি। তার মানে মুক্তিবাহিনীতে নাম লেখানোর জন্য আমার গৃহত্যাগ ।মার কান্নাকাটির জেরে আমার খোঁজে বিভিন্ন দিকে সাইকেল নিয়ে বের হয় চার পাঁচ জন। সেই সার্চ পার্টির একজন- মেছেরা থেকে বেড়াতে আসা ফুফাতো ভাই, মিলন ভাই- পেয়ে যায় বটতলায় খেয়া নৌকার জন্য অপেক্ষমান আমাকে। আমি যুদ্ধে যাওয়ার জন্য বাড়ি থেকে পালিয়েছি জেনে মা অজ্ঞান হয়ে আছেন- এমন খবরে মায়ের করুণ মুখটা আমাকে উদবেলিত করে। “ তোমার বয়স এখনো সতেরোই পেরোয়নি, আঠারর নিচে কাউকে তো মুক্তিবাহিনীতে নেবে না” –এসব এবং এমন আরো কিছু কথা দিয়ে বুঝিয়েভাজিয়ে বাড়ি নিয়ে আসেন মিলন ভাই। শেষ পর্যন্ত আমার আর যুদ্ধে যাওয়া হয়নি।

স্বাধীন বাঙলা বেতারে শুনি আপেল মাহমুদের গান- “তীর হারা এই ঢেউয়ের সাগর পাড়ি দেবো রে/আমরা ক’জন নবীন মাঝি’’। এমন একজন মাঝি হওয়ার রোমান্টিক ভাবনা আমাকে আচ্ছন্ন করে। আবারো উদ্যমে শান দেই, পরক্ষণেই মায়ের করুণ মুখ ঝড়ো বাতাসের মতো আমার উদ্যমের নিভু নিভু বাতিটা ঝপাৎ করে নিভিয়ে দেয়। আমার আর হওয়া হয় না সেই নবীন মাঝি । শুনি রক্তে- জোয়ার -তোলা “জীবনের রঙে মনকে টানে না/ফুলের ওই গন্ধ কেমন জানিনা/জোছনার দৃশ্য চোখে পড়ে না/তারাও তো ভুলে কভু ডাকে না।” শুনি আর আরো ক্লিষ্ট হই, ক্ষুদ্র হই। কিন্তু পরক্ষণেই আবিষ্কার করি আমি তো বেশ আছি ফুলের গন্ধ, জোছনার দৃশ্য -সব নিয়ে। সারাদিন টই টই করে ঘুরে বেড়াই, ক্যারাম খেলি। পাক বাহিনীর সম্ভাব্য বিমান আক্রমণ থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য বাড়ির পেছনে সবার সাথে মিলে ট্রেঞ্চ খুঁড়ি । আবার পাক সেনারা আসছে শুনে মায়ের তাড়ায় পালাই বিড়াল-তাড়িত ইদুঁরের মতো, আরো প্রত্যন্ত গ্রামে।

মাঝে মধ্যেই মনে পড়ে নাসরিনের কথা। মাধবীলতার কথা। নিজের মধ্যেই সংকুচিত হয়ে এতোটুকু হয়ে যাই। কী বলবে নাসরিন যখন সে জানবে যে আমি যুদ্ধে যাইনি?

থানা শহর গফরগাঁয়ে, যেখানে আমাদের কলেজ, পাক সেনাদের ক্যাম্প আছে। আমি ছাত্রলীগ করতাম, ইলেকশনের সময় নৌকার জন্য মারামারিও করেছি। সুতরাং আমার জন্য গফরগাওঁ যাওয়া সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। আর আমার নিজের ভেতরেও আছে আরেক অলঙ্ঘনীয় প্রাচীর- নাসরিনের সাথে দেখা হয়ে যাওয়ার ভয়।

মুক্তিযুদ্ধের শেষ দিকে একদিন হঠাৎ করেই দেখা হয় আনামের সাথে। আমাদের গ্রামের বাজারের উপর দিয়ে যাচ্ছিল কোথাও । একথা সেকথার পর আনাম জানায়, জালালের খবর জানিস? শালা তো আসলেই মিচকে!

  • না, জানি না। কেন কি করেছে ও? আমি খুব আগ্রহ নিয়ে জানতে চাই।
  • শালা তো মুক্তি হয়েছে। সাথে নিয়ে গেছে ওর বোলতাকে।
  • মানে? আমি ইলেক্ট্রিক শক খাওয়ার অনুভূতি নিয়ে জিজ্ঞেস করি।
  • জালাল আর নাসরিন এক সাথে যোগ দিয়েছে মুক্তিবাহিনীতে।

আমি বাকরুদ্ধ হয়ে নির্ণিমেষ তাকিয়ে থাকি আনামের দিকে। আমার অপৌরুষ আমাকে বিদ্ধ করে। আমার মনে হয় বিশাল এক কালো ব্যাকগ্রাউন্ডে আমার কাপুরুষতা ঝলঝল করে জ্বলছে। আনাম তার কতটুকু খেয়াল করে আমি জানি না। শুধু শুনি ও বলছে, প্রথমে সবাই ভেবেছিল জালাল নাসরিনকে নিয়ে ভেগেছে। পরে জানাজানি হয় ভেগেছে ঠিকই কিন্তু তা মুক্তিবাহিনীতে যোগ দেয়ার জন্য।

হৃদয়ে রণাঙ্গন নিয়ে আমি আনামের কথা শুনি । মনে হয় আমি যেন একটা পানিভর্তি স্পঞ্জের বল। আর আনাম মুঠোর সমস্ত শক্তি দিয়ে চেপে নিংড়ে দিচ্ছে আমাকে। আনাম বলে, পরিবারের সবার সামনেই রাজাকাররা পাকসেনাদের নিয়ে পিটিয়ে মেরেছে নাসরিনের বাবাকে। নাসরিনদের উপরও হয়তো অত্যাচার হয়েছে। সেটা কী বা কী রকম লোকজন তেমন জানে না। এ পর্যায়ে আনাম আমার কাঁধে রাখা ওর হাত দিয়ে আমার কাঁধে আলতো চাপ দিয়ে বলে, বুঝিসই তো। গা থেকে গন্ধপোকা সরানোর মতো যখন কাঁধ থেকে আমি আনামের হাতটা সরাই, তখন আবার কথা বলে আনাম, পাক বাহিনীর ওদের বাড়ি আক্রমণ আর ওর বাবার মৃত্যুর কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই ঘটে অই ঘটনা।
আমি যেন নতুন কোনো কাহিনী শুনছি, এমনভাবে জিজ্ঞেস করি- কোন ঘটনা?

  • আরে অই যে, জালাল আর নাসরিনের মুক্তিযুদ্ধে যাওয়া।
    আনাম আবেগহীন, নিরাসক্ত ভঙ্গিতে বলে। কেন জানি ওর বলার ভঙ্গিটা আমার ভাল লাগে না। আমি মনে মনে ওকে গালি দেই, শালা তুই একটা রাজাকার।

যে হৃদয় ছিল এক সময় রণাঙ্গন, এখন সেখানে ব্রহ্মপুত্রের খরা। তবু সেখানে শুশুক ভাসে।বিশেষ করে মার্চের এই সময়ে। আমি কল্পনায় দেখি -হেরিং বোনের প্যাটার্নে সাজানো লাল ইটের রাস্তা, ক্রমগ্রাসমান সভ্যতার চোখ এড়িয়ে ইটের ফাঁকে গজিয়ে উঠা দু’য়েকটি সবুজ, রাস্তার দু’পাশে শাড়ির পাড়ের মতো চিকন সাইকেল চলার পথ।কোনো এক গোধূলী বেলায় একজন মানুষ, মুখে অযত্নে বেড়ে উঠা খোঁচা খোঁচা দাড়ি। তিনি সাইকেলে সমাসীন,সাইকেলের হ্য্যান্ডেলে ঝোলানো চটের ব্যাগ।মনে হয় ভারী কিছু একটা আছে ওখানে। এক পা মাটিতে ঠেকিয়ে তিনি কথা বলেন কারুর সাথে। তাঁর হাতে জ্বলন্ত সিগারেট, রেলের সিগনাল বাতির মতো উঠছে নামছে। দেখে যেন মনে হয় চিনি উহারে। আমি মনে মনে বলি। আমি এগিয়ে যাই তাঁর কাছে, জিজ্ঞেস করি , আরে আপনি , মানে , তুই জালাল না? তোর হাতে সিগারেট? কেমন আছে তোর মাধবীলতা? তোর বোলতা?

মনিরুস সালেহীন

মনিরুস সালেহীন

ড. আহমেদ মুনিরুছ সালেহীন
জন্ম- ২৯ আগস্ট ১৯৬৫, গফরগাঁও, ময়মনসিংহ। 

পেশায় সরকারি চাকুরে

আগ্রহ মূলত গল্প, কবিতা, প্রবন্ধ, ভ্রমণ কাহিনী

প্রকাশিত গ্রন্থ- 
বেকেটের দুঃস্বপ্নের পৃথিবী (প্রবন্ধ)
কাহলিল জিবরানের বালু ও ফেনা (ভূমিকা ও অনুবাদ) 
হাকুনা মাতাতা ( ভ্রমণ গল্প)
যে মুক্তিযোদ্ধার নাম ছিল জননী (গল্পগ্রন্থ),  
বাইরে এখন রৌদ্র বেশি (ছড়া- প্রবচন),  
যেতে যেতে পথে (জার্নাল) 

ই-মেইল: ahmedmsaleheen@gmail.com

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

%d bloggers like this: