মাঈন উদ্দিন জাহেদের অলৌকিক প্রণোদনা: বিষয় ও শিল্পরূপ

কবি মাঈন উদ্দিন জাহেদ (জন্ম. ১৯৭২, চট্টগ্রাম) বিশ শতকের নব্বই দশকের কবি। শিক্ষকতা পেশা হলেও কবিতা চর্চাই তাঁর নেশা ও সাধনা। ইতোমধ্যে তাঁর তিনটি কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হয়ছে। প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থগুলির নাম – সেপ্টেম্বরের ইলশে রোদ ঘিয়ে বিষ্টি (২০০৫), নিখিলেশ কেমন আছো (২০১৭), অলৌকিক প্রণোদনা (২০১৯)। ‘নিখিলেশ কেমন আছো’ কাব্যগ্রন্থের জন্য পেয়েছেন ‘বাংলাদেশ সাহিত্য ও সংস্কৃতি পরিবার-(বাসসপ)’ সম্মাননা-২০১৮। কবিতাচর্চা, প্রবন্ধ রচনা ও ভাষা গবেষণায় তাঁর পান্ডিত্য পরিলক্ষিত হয়। অলৌকিক প্রণোদনায় কবির সামাজিক ও আধ্যাত্মিক মনোভূমি বাঙ্ময় হয়ে উঠেছে। অলৌকিক প্রণোদনা কাব্যগ্রন্থকে কবি দুভাগে বিন্যস্ত করেছেন। প্রথম ভাগে রয়েছে ম্যুরালে মিথ্যে পূর্ণিমা এবং দ্বিতীয় ভাগে রয়েছে অলৌকিক প্রণোদনা। ম্যূরালে মিথ্যে পূর্ণিমায় ২৯ টি কবিতা এবং অলৌকিক প্রণোদনায় ১৯টি কবিতা সংকলিত হয়েছে। ম্যুরালে মিথ্যে পূর্ণিমায় সমকালীন জীবন, প্রেম, স্মৃতি, মানবতাবোধ, দ্রোহ-বিপ্লব ও শিল্পচেতনা প্রকটিত হয়েছে। অলৌকিক প্রণোদনায় কবি পবিত্র হাজ্বে গমনের স্মৃতিকে কাব্যভাষায় রূপান্তর করেছেন, যেখানে মহান স্রষ্টা এবং তাঁর প্রিয় বান্দা রসুল মুহাম্মাদ স.-এর প্রতি তাঁর ভালবাসা উৎসারিত হয়েছে।
সমকাল কবি-সাহিত্যিকগণের একটি প্রিয় অনুষঙ্গ। ‘সময়ের ধারাপাত’, ‘৩ মাঘ ১৪২৪’, ‘যাপনের নীলখাম’, ‘যাপনের অধিবিদ্যা’, ‘সহজ জীবন’ ও ‘ভোর সঙ্গীত’ কবিতায় সমকালীন জীবনের নানান বিষয় পরিস্ফুটিত হয়েছে।
‘ধবল জোছনায় চলে কালো বায়সের চক্বর-বক্বর খেলা’-পঙ্ক্তির মাধ্যমে কবি সমকালীন রাজনৈতিক কূটচালকে উল্লেখ করেছেন। অতীতে জগৎশেঠ, মীর জাফর আর ঘসেটি বেগমের ষড়যন্ত্রে বাংলার স্বাধীনতা সূর্য অস্তমিত হয়েছিল, বর্তমানে তাদের প্রেতাত্মা যেন সমাজে বিচরণ করছে। যারা গণতন্ত্র ও স্বাধীনতার জন্য সংগ্রাম করেছে, তারা আজ শৃঙ্খলিত। কবির ভাষায়-
১৯৯২’র সুবর্ণদিনে-
মুক্তি পেয়েছিল এ মৃত্তিকা ইতিহাসের দ্বিচারী রণনীতি থেকে
সে আয়োজনে বাংলা মুলুকে গান শুনিয়েছিল এক সুরেলা কোকিল;
যাকে মাংসের লোভে বাঁধিয়াছে খাঁচার লৌহ শিকে-
কোনো এক স্বৈরিণী লোলুপ বেদেনি।
গানের সুর অসুরের বেদনা ঢাকতে
ক্রন্দন তরঙ্গ আজ আকাশে বাতাসে করছে জারি-সারি গান। / সময়ের ধারাপাত

বাংলাদেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব অক্ষুণ্ন রাখতে দেশের অনার্য তরুণদের প্রতি কবি উদাত্ত আহবান জানিয়েছেন। সীমান্তের কাঁটাতারে প্রতিনিয়ত ক্ষত-বিক্ষত হচ্ছে এ দেশের ফেলানিরা, দেশের সম্পদ ইলিশ ভোগের অধিকার দেশবাসীর না থাকলেও প্রতিবেশি রাষ্ট্রে তা চালান হয়ে যায়, ট্রানজিট দিলেও তার শুল্ক এ দেশ পায় না। প্রৌঢ় সুবিধাভোগীরা বিভিন্ন চুক্তি স্বাক্ষরে এ দেশে আসে এবং হাসিমুখে প্রত্যাবর্তন করে। কবির ভাষায়-

আমাদের আকাশে এখন বুড়ো শকুনের ছায়া
ডানা ঝাঁপটিয়ে যায় প্রৌঢ়ত্বের হিংস্র থাবা।
আর্য মানচিত্র এঁকে চক্বরে সাজায় বালাখানা; / ৩ মাঘ ১৪২৪

‘যাপনের নীলখাম’ কবিতায় বহমান সময়ে মানুষের বোধ, প্রেম-কাম, তাড়না, স্বপ্ন ও আশা যে ক্রমান্বয়ে ফিকে হয়ে যাচ্ছে, সে বিষয়ে কবি আক্ষেপ প্রকাশ করেছেন। কবি জিজ্ঞাসা করেছেন-‘এ কেমন সময় পেরুচ্ছি আমরা ?/ উত্তর দিয়ো যাপনের নীলখামে।’ ‘যাপনের অধিবিদ্যা’ কবিতায়ও চলমান জীবন-যাত্রায় বিষাদ পরিলক্ষিত হয় লৌকিকতায়। যাত্রা বা পালাগানের সঙ সেজে কোন প্রশান্তি পাওয়া যায় না। মানুষ এখন ইলেক্ট্রনিক ডিভাইসে আনন্দ ও জ্ঞানধারার ভুবন সৃষ্টি করে নিয়েছে, ডেইলা বা দহলিজে বসে সাল্লাল্লাহ্ পড়ার আনন্দ বিদূরিত হয়েছে। সবাই যেন বাস্তুচ্যুত-চলনচ্যুত , বর্ণে বর্ণে ভালবাসা-নয়তো শেকড়হীন বোবা। এজন্য কবির প্রশ্ন-
না হও প্রেমিক তুমি, না হও ঈশ্বর-ঈশ্বরী
কেনো মাংস গন্ধ খুঁজে শধু হবে মাংসাশী ?/ যাপনের অধিবিদ্যা

সহজ জীবন আর জটিল জীবন যাপনের পার্থক্যও উল্লেখ করেছেন কবি তাঁর কবিতায়। সমাজের উঁচুতলা আর নিচতলার অধিবাসীদের জীবন-যাত্রা, চাল-চলন, রুচি সম্পূর্ণ ভিন্ন। উঁচুতলার অধিবাসীদের অর্থ-বিত্তের প্রাচুর্য থাকলেও অনেক সময় সুখ থাকে না। কবির ভাষায়-
সরল হাসিতে যায় প্রাত্যহিক লোক জীবনধারা-
সেখানে ঈর্ষা আছে, ভেদ আছে, তবে নেই ক্রোধ
ক্ষমতার প্রাত্যহিকে যারা আঁকে বিভেদের বোধ,
তারা কি আনিতে পারে অমন শুভ্র সহজ অজরা ? / সহজ জীবন

সামাজিক জীবন-যাত্রায় অনেক অনাকাঙ্ষিসহত অপরাধ সংঘটিত হয়। অপরাধী বিভিন্ন সুযোগে অসহায় নারীকে ধর্ষণ করে, কখনো একাকী আবার কখনো দলবদ্ধভাবে। এ যেন রাষ্ট্রীয় দুঃশাসন আর নীতিক্ষয়ের চরম উপহার! ধর্ষকের কোন শাস্তি হয় না, পক্ষান্তরে ধর্ষিতা লাঞ্ছিতা হয় দ্বারে দ্বারে। কবি সৎ ও সাহসী পুরুষদেরকে বাস্তবমুখী পদক্ষেপ গ্রহণের আহবান জানিয়েছেন। জায়া-জননী-কন্যা যেন নির্বিঘ্নে সমাজে চলাচল করতে পারে, সেজন্য কবি দুঃশাসনমুক্ত স্বদেশ কামনা করেছেন। কবির ভাষায়-
ধর্ষণের উৎসব না হোক,
না ঝুলুক লাল জিহবা,
বেলতলা খালি থাক-
হোক জায়া-জননী-কন্যা কেশবতী’ / ভোর সংগীত

কবি-সাহিত্যিকগণের অন্যতম একটি প্রিয় অনুষঙ্গ মানব-মানবীর প্রেম বর্ণনা। নর-নারীর হৃদয় ঘটিত লেন-দেন সেখানে মুখ্য হয়ে ওঠে। কবি মাঈন উদ্দিন জাহেদও তাঁর আলোচ্য কাব্যগ্রন্থের ‘মাইকেল অ্যাঞ্জেলার হাত’, ‘মেঘরৌদ্দুর’, ‘চিহ্ন’, ‘এসব গালগল্প’, ‘ম্যুরাল কাহিনী’, ‘সান্ধ্যবেলা’, ও ‘বিমূর্ত জগৎ’ কবিতায় তাঁর প্রেমভাবনা ফুটিয়ে তুলেছেন। ‘মাইকেল অ্যাঞ্জেলার হাত’ কবিতায় কবি প্রেয়সীর হাতকে জগৎবিখ্যাত ভাস্কর মাইকেল অ্যাঞ্জেলা (১৪৭৫-১৫৬৪, ইতালি) নির্মিত ভাস্কর্যের হাতের সঙ্গে তুলনা করেছেন। দশটি আঙ্গুল, তার স্পর্শ ও কম্পন কবির হৃদয়ে শিহরণ জাগায়। ছুঁয়ে যায় একগুচ্ছ তরুণ্যের হাওয়া। ফুলার রোড ধরে হাঁটতে হাঁটতে নীলক্ষেত, নিউ মার্কেট ও বিভিন্ন উইন্ডো শপিং অতিক্রম করতে করতে উচ্চারিত শব্দগুলো যেন কবিতা হয়ে যাচ্ছে। তখন সবকিছু লাবণ্যপ্রভা, কবিতা কল্পরূপ। প্রেয়সীর পরশ যেন কবিতাময়-
কতো মুহূর্ত কতো ক্ষণ আজ শুধু রোমন্থন
আজ শুধু কবিতার শব্দ সজানো,
আজ শুধু শব্দাবেগ জড়ানো;
কবিতা ও জীবন মুখোমুখি। / মাইকেল অ্যাঞ্জেলোর হাত

‘মেঘরৌদ্দুর’ কবিতায় কবির দৈনন্দিন ভালবাসার চিত্র পরিস্ফুটিত হয়েছে। একচিলতে রোদ বেলকনির উড়ন্ত হাওয়া, প্রেয়সীর ছুঁড়ে দেওয়া উড়ন্ত হাসি, মেঘ ও রৌদ্দুর, হেঁটে যাওয়া সমুদ্রের তীর, প্রেয়সীর জানালা, বিস্মৃত যাপনের গল্প, নীল শাড়ি, লাল শার্ট ইত্যাদি কবির মনে ভালবাসার শিহরণ জাগায়। কবির ভাষায়-


ভালোবাসি এই অমাবস্যা রাতে ঝিঁঝির চিৎকার
ভালোবাসি থাকবে না এমন নিশি
ভোর হবে ক্রমাগত…
ক্রমাগত…
ভালোবেসে ফতুর হবো- / মেঘরৌদ্দুর

‘চিহ্ন’ কবিতায় প্রৌঢ় বেলায় যৌবনের স্মৃতি রোমন্থন করেছেন কবি। বয়সের ছাপ পরিস্ফুটিত হয় দাড়ি, গোঁফ ও মাথার চুলে, কখনো চোখের দৃষ্টিতে বা কেশশূন্য মাথায়; তখন স্মৃতিতে জেগে ওঠে দূরন্ত কৈশোর। দূরন্ত বেলার ঘাম ঝরে প্রৌঢ়ের নস্টালজিয়ায়। এলাচুলে হাতড়ায় তারা মেঘের নূপুর, টিএসসি, অপরাজেয় বাংলা আর ঘাসের দুপুর। ম্লানে ঘ্রাণে প্রাণে মগ্নতার সৌরভ ছড়ায়, ফিরে যায় তারুণ্যেও যুগল উৎসবে।
এসব রোমন্থন সময়ের তাড়া খেয়ে যাওয়া
সব মেঘ ঝরে যায়, থাকে বয়সী আগুন হাওয়া।/ চিহ্ন

‘এসব গালগল্প’ কবিতায় সংসার জীবনে দুজনের একজন পরপারে পাড়ি জমালে অন্যজনের জীবনে যে শূন্যতা ও বেদনাবোধের সৃষ্টি হয়, কবি তার ভাষারূপ উপস্থাপনের পাশাপাশি প্রেম ও কামের স্বরূপ উপস্থাপন করেছেন। কবির ভাষায়-
লোকে আজকাল ফেরি করে প্রেম ও গান
আসর জমিয়ে রাখে রূপ-রুপি-মদ্য-মৌজে
কী যায় এসবের স্বার্থ-ব্যর্থ খোঁজে ?
এসব গালগল্প আমি-তুমি থাকা, না থাকাতে।/ এসব গালগল্প

‘ম্যুরাল কাহিনি’ অর্থাৎ প্রাচীর চিত্রের কাহিনীকে কবি ব্যক্তির প্রেম-ভালবাসার জীবন কাহিনি হিসেবে উল্লেখ করেছেন। গৌরী নাম্নী রমণীকে কবি ভালবাসেন, অথচ মুখ দিয়ে স্বীয় ভালবাসার কথা কখনও তাকে জানানো হয়নি; কিন্তু গৌরি ঠিকই জেনে গিয়েছে কবি তাকে ভালবাসেন। বিধাতা নারীকে দিয়েছেন এক সূক্ষ্ম বিচারবোধ, ফলে সে সহজেই পুরুষের মানচিত্র অনুধাবন করতে সক্ষম হয়। চট্টগ্রাম শহরের জামাল খান মোড়ে স্থাপিত ম্যুরাল চিত্র তরুণ-তরুণীদের যুগলপ্রেমের বার্তা বহন করে। একদিকে বাংলাদেশের ইতিহাস-ঐতিহ্য অপরদিকে কপোত-কপোতীর হৃদয়ের আর্তি এ চিত্রে পরিস্ফুটিত হয়েছে। ফলশ্রুতিতে সেলফি তোলার প্রতিযোগিতাও পরিলক্ষিত হয়।
দ্যাখো, প্রতিদিন কীভাবে তরুণ-তরুণী তীব্র আবেগে
নিজস্বী তোলে আমাদের ম্যুরালছবি আড়ালে ;
আমরা আড়ালে থেকে অমর কীর্তি হয়ে
কখন যে পুরো বাংলাদেশের হৃদয় হয়ে উঠি, ম্যুরালে। / ম্যুরাল কাহিনি

‘সান্ধ্যবেলা’ কবিতায় সাহিত্য সভায় আগত বন্ধুদের মুগ্ধতা কোন এক রমণীকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়, যার বাচনভঙ্গী, আবৃতি ও মিষ্টি-মধুর কণ্ঠের রবীন্দ্র সঙ্গীত পরিবেশন সবাইকে মোহাবিষ্ট করে। বন্ধুদের কারো চোখে প্রেম, কারো চোখে কামাগ্নি প্রজ্জ্বলিত ছিল। সেই রমণী হঠাৎ করে নিজেকে গুটিয়ে নেয়। কিন্তু যে হৃদয় ও চোখ তাকে প্রকৃত ভালোবাসায় সিক্ত করেছিল, সে তার অনুসন্ধানে ব্যাপৃত থেকে ব্যর্থ হয়। তখন সে আপন হৃদয়ের জ্বালা নিরবধি বইতে থাকে আর নার্সিসাসে আক্রান্ত হয়।
সে মায়াটা হয়তো এখন আপন প্রেমে নার্সিসাস ও আত্মভোলা।
সে ছায়াটা হয়তো তাতেই থেমে গিয়েই সরিয়ে ফেলে ক্ষরণ জ্বালা। / সান্ধ্যবেলা

‘বিমূর্ত জগৎ’ কবিতায় প্রেয়সীর পরশ, তার স্মৃতি ও যাপনের সুখময়তাকে কবি নান্দনিক ভাষায় উল্লেখ করেছেন। প্রিয়জনের সন্ধানে কবি মোহাম্মদপুরের অলি-গলি, অপরাজেয় বাংলার পাদদেশ, হাকিম চত্বর, বাংলা একাডেমির পুকুরঘাট একাই চলেছেন, কিন্তু সাক্ষাৎ পাননি। সতেরো শতকের মমতাজের মত তিনি তাকে খুঁজেছেন কিন্তু যখন সাক্ষাৎ পাননি, তখন তার হৃদয়ের রক্তক্ষরণ পরিস্ফুটিত হয়েছে।
আসে না কাঙ্ষিন্ত স্বর এ হৃদয়ে জাগাবারে,
ভাসে শুধু স্মৃতিমন্থন, কিছু কথা কহিবারে। / বিমূর্ত জগৎ

স্মৃতি মানব জীবনের অবসর যাপনের স্বর্ণালি আলোছায়া। স্মৃতির জানালায় জেগে ওঠে অতীতের দিনলিপি। কবি মাঈন উদ্দিন জাহেদের চারটি কবিতায় অতীত দিনের স্মৃতিচারণ ঘটেছে। কবিতাগুলির নাম-‘গুলনাহার দিস্তান’, ‘কুশল’, ‘শিল্পী চাকমা’, এবং ‘বিশ বছর পর একদিন’। ‘গুলনাহার দিস্তান’ কবিতায় বয়সের ভারে ন্যুব্জ এক রমণীর জীবন কাহিনি বর্ণিত হয়েছে। গুলনাহার এখন মোটা কাঁথার সাথে বিছানায় লেপ্টে আছে। অথচ একদিন তার সব ছিল- নরম বিছানা, গতর, রূপ, যৌবন, সংসার, বন্ধন, সমাজ ; স্বামী সংসার, ছেলেমেয়ে, নাতি নাতনি এবং প্রপৌত্র। নাতনির বাচ্চারাও এখন সামনের দালান থেকে ‘বড় মা’ ‘বড় মা’ বলে ডাক দেয়। গুলনাহার এবং তার প্রপৌত্রের স্বর এখন একই রকম হয়ে গেছে। সমাজে প্রচলিত একটা প্রবাদ আছে, ‘বুড়ো হলে মানুষ শিশু হয়ে যায়’ ; শিশুর মত বলতে পারে না তার প্রস্রাব-পায়খানার সময়। গুলনাহার যেন এ প্রবাদেরই বাস্তব প্রতিফলন। তার শারীরিক এরূপ অবনতিতে স্বজনদের মনে ব্যথা-বেদনা জাগরিত হয়। গুল নাহারের প্রায়ই হুঁশ থাকে না, খাদ্য-পানীয়েরও চাহিদা নেই, আধো ঘুম-আধো জাগরণে তার সময় অতিবাহিত হয়। আর যখনই জাগে-তখনই স্বজনের ঘ্রাণ নেয়ার সাধ জাগে তার মনে। কিন্তু তার বুকে ঘ্রাণ নেয়ার কেউ আর এখন নেই তার কাছে। পুত্র, নাতি, প্রপৌত্র সবাই জমিজমার ঘ্রাণ আস্বাদনে বিভোর। চান্নিপ্রহর রাতেও গুলনাহার স্মৃতিকাতর হয়ে ওঠে। তার চারটি মেয়ে সংসারী হয়ে পরের বাড়িকে আপন করেছে, নিজের বাড়িতে অবস্থানরত পুত্র, প্রপৌত্র, পুত্রবধূরা কেউ-ই আনন্দে বা যাপনে তার সঙ্গী হয় না; শুধু তার মল-মূত্র পরিষ্কারের সময় কর্কশ হয় ওঠে তাদের অনুযোগের ডালি। মায়াহীন এ বৈশ্য সংসারের প্রতি গুলনাহারের অভিযোগ প্রকট।
তীব্র অভিযোগ গুলনাহার বলে না কেনো-
এ সমাজ সংসারে কখন পেচ্ছাব করে দেবে ?
কখন হেগে দেবে-মায়াহীন এ বৈশ্য সংসারে ? / গুলনাহার দিস্তান

‘কুশল’ কবিতায় গোলাপ-বৃত্তান্ত বর্ণিত হয়েছে। গোলাপমুগ্ধতায় এক গোলাপপ্রেমী একবার অনেক গোলাপ লাগিয়েছিলেন। চারাওয়ালা থেকে সারসহ আরও প্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি ক্রয় করে গাছগুলির অনেক যত্ন নিয়েছিলেন, কিন্তু প্রস্ফুটিত হয়েছিল শুধু একটি গোলাপ। ওই ব্যক্তির জীবনেও গোলাপ একবারই এসেছিল-সুদূর অতীতে। তার চোখে অনেক মায়া, মায়ার বানে তিনি আক্রান্ত হয়েছিলেন। সেই গোলাপী-ই বলেছিল ব্যস্ত মানুষ তার পছন্দ না। অথচ সেই গোলাপী এখন অনেক ব্যস্ত, কুশল বিনিময়েরও সময় হয় না। হঠাৎ ইথারে ভেসে আসে ‘কেমন আছো?’ গোলাপের রিং টোনও ভিন্ন আমেজে ম্যাসেঞ্জারে অবস্থান করে। মহাকালের এক ধীমান গোলাপপ্রেমী গোলাপ কিনতে গেলেই এখন মুষড়ে পড়েন, তার হৃদয়ের তন্ত্রীতে গোলাপের কাঁটা খচ করে ফুটে যায়। ফলে গোলাপ না কিনে তিনি ফিরে আসেন। কবির ভাষায়-
এতে সময় গড়ানো, শুকিয়ে যাওয়া ভুল, আর হয় না কেনা গোলাপ ফুল। / কুশল

গোলাপের মোহে মোহাম্মদপুরে খা খা দুপুর ঝলসে গেছে দুরন্ত বেলায়। ক্লান্ত বিকেলে সোহরাওর্য়াদী রোড বা উদ্যানে বিহারিদের কাবাব ভাজা বা কোপ্তা খেতে খেতে মেতে উঠেছেন ভূ-রাজনীতির চুলচেরা বিশ্লেষণে। আর মধ্যবিত্তের বিকেল তখন পোড়া মাংসের ঘ্রাণে মশলাময়। বেঁচে আছে শুধু বাঙালির রসনা, আর রসবোধের মৃত্যু ঘটেছে। রসোর্ত্তীণ হওয়ার গল্প এখন শুধু গোলাপে-গল্পে। প্রেয়সীর যাপিত জীবনের গল্প শ্রবণে প্রেমিক-হৃদয় তখন তীর্থের কাকের মত অপেক্ষমান।

‘শিল্পী চাকমা’ কবিতায়ও কবি তার প্রেয়সীর স্মৃতিচারণ করেছেন। জীবনে অনেক দেখা-সাক্ষাৎ হলেও এখন তা স্মৃতির মিনারে রূপান্তরিত। ফলে পরিচিত জনদের কাছে তিনি তার সংবাদ জানতে চেয়েও ব্যর্থ হয়েছেন। তার জন্য হৃদয়ের অলিন্দে জমানো ব্যথা কবিতার ভাষায় তিনি প্রকাশ করেছেন। আর তার দেওয়া একটি ব্যাগকেও তিনি তার অলস যাপনের সঙ্গী করেছেন-

বনরূপার ঝোলা ব্যাগটি আজও যত্নে রেখে দিয়েছি ;
ওখানে এক ব্যাগ রাঙা-মাটি আবেগ ঝুলিয়ে রেখেছি। /শিল্পী চাকমা

দ্রোহ, বিপ্লব ও স্বাধীনতা সংগ্রামের চেতনা সৃজনশীল সত্তাকে আলোড়িত করে। সৃজনের বেদনা উত্থিত হয় স্বাধীন সত্তার বিকাশে। কবির ভাবনায় উৎরোল ঢেউ জাগে দ্রোহের অগ্নিস্ফূলিঙ্গে। ‘সময়ের দায়’, ‘রৌদ্র ঝলকে’, ‘ফাদি আবু সালাহ’, ও ‘স্রোতের স্মারক’ কবিতায় কবির দ্রোহ চেতনা উদ্ভাসিত হয়েছে। পদ্মা-মেঘনা-যমুনার নীল জলে ফোরাতের কালো ছায়া প্রতিবিম্বিত হয় বাংলার প্রান্তরে। কবির হৃদয়তন্ত্রীতে শিহরিত হয় দ্রোহের পংক্তিমালা। মানুষ শুনতে চায় দ্রোহের গান। ইতিহাস রচয়িতাগণ লড়াকুর ক্ষরণ যন্ত্রণার পরিবর্তে মোসাহেবী মনোভাবে সময়ের ছবি অঙ্কন করে। সাধারণ জনগণ ও বোদ্ধা মহল সে ইতিহাস গ্রহণ করে না। তাইতো কবি গেয়ে ওঠেন-
বাঙালি জাগো
জেগে আছে ইতিহাস ;
সময়ের রুদ্রনায়ক।
জাগো
হাওয়ায় দোলে শুধু কাপুরুষ কালিমা। / সময়ের দায়

পৃথিবীর সব আঁধার আঁধার নয়, কিছু আঁধার আলো হয়ে জ্বলে ; যেভাবে আঁধারের অমানিশা পঁচিশে মার্চকে আলোকিত করেছে। প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের সূচনাপর্বে পঁচিশে মার্চের কালোরাত্রিতে শত্রুসেনারা যে জিঘাংসা চরিতার্থ করেছিল, তা তাদের পতনের অন্যতম কারণ হিসেবে দেখা দিয়েছে। অসংখ্য মানুষ অহরহ মরছে দিনে ও রাতে, কারণে-অকারণে, জীবিকা নির্বাহের প্রয়োজনে। পথে-ঘাটে জলপাই রঙের অন্ধকারে কত তনুরা সম্ভ্রম হারায় আর লুটিয়ে পড়ে চিরতরে, তাদের জীবনে কালো আলো হয়ে দেখা দেয় না। পঁচিশে মার্চের কালো আঁধার যেভাবে আলোর বন্যা হয়ে সবুজে এঁকেছিল বাংলাদেশের মানচিত্রের সীমা-পরিসীমা ; আরো এক পঁচিশে মার্চে যদি ধুয়ে যেত বাংলাদেশের সব কালিমা- তাহলে তনুদের আত্মারা শান্তি পেত।
তনুরা তখন বেহেস্তি পাখি হয়ে এ বাঙলা মুলুকে
শালিক হয়ে আনন্দে ডানা ছড়াতো রৌদ্রের ঝলকে। / রৌদ্র ঝলকে

ফিলিস্তিনের স্বাধীনতা সংগ্রামে তারুণ্যের দীপ্ত অহঙ্কার ফাদি আবু সালাহ। কবি তাঁকে স্মরণ করেছেন সংগ্রামের প্রেরণাদাতা হিসেবে। স্বাধীনতা শব্দটি দ্রোহের আকর হয়ে জ্বলেছিল তার বুকে, ফলে কৈশোর পেরিয়ে তারুণ্যের প্রারম্ভে ইসরাইলি হানাদার বাহিনি কেড়ে নিয়েছিল তার পা, তবুও সংগ্রামে-ইনতেফাদা… ইনতেফাদা মিছিলে, পাথরের বৃষ্টি নিক্ষেপে সে কখনো পিছপা হয়নি। এই পদহারা যুবকটিও শেষ পর্যন্ত ইসরাইলি বাহিনির লক্ষবস্তুতে পরিণত হয়। তাঁর বুক ঝাঁঝরা হয় শত্রুসেনার গুলিতে। রক্ত ও বারুদে শোনা যায় ফাদি আবু সালাহ্ জান্নাতের এক অনাঘ্রাণ পুষ্প, তাঁর প্রাণের দাম লুটে নেয় শান্তি বাণিজ্যের নেমক হারাম সওদাগর-জাতিসংঘ । কবি জাতিসংঘের প্রতি তীব্র ঘৃণা জ্ঞাপনের পাশাপাশি বীর ফাদি আবু সালাহ্কে সালাম বা অভিবাদন জানিয়েছেন-
পাথরে পাথর জ্বেলে বুকে জ্বেলে আগুন
ফাদি ফিলিস্তিন মানচিত্রে রচেছিলো সাহসী ফাগুন।
… … … … … … … …
ফাদি আবু সালাহ্! তোমাকে সালাম তোমাকে সালাম! / ফাদি আবু সালাহ্ ! তোমাকে সালাম

পরম আয়েশে ক্ষমতার মসনদে বসে যারা সময় অতিবাহিত করে, ছোপ ছোপ লাল রক্তের চিহ্নকে যারা মুছে দিতে চায়; সাময়িক সুখলাভ তাদের পরম কাম্য হলেও ইতিহাস তাদেরকে কখনো ক্ষমা করবে না। ফুর্তিমগ্ন নিশিযাপন, শুরার মাদকতা, নর্তকীর নূপুরের ছন্দ আর অবৈধ অর্থের ছড়াছড়ি তাদেরকে মাতাল করলেও সময়ের সাহসী সৈনিক জেগে ওঠে আপন ছন্দে।
কবির ভাষায়-
ঘুমাও এখন তন্দ্রার দেবী বাঙালি তোমার নাম
ঘুমের চেয়ে দ্রোহ শ্রেয়- কে বলে ? সব নেমক হারাম। / স্রোতের স্মারক

কবির লেখায় মানবতাবোধ পরিস্ফুটিত হয়েছে। ধর্মের নামে যারা মানুষ হত্যার হোলিখেলায় মেতে ওঠে, কবি তাদের প্রতি ঘৃণা ও ধিক্বার জানিয়েছেন। বিশেষত মিয়ানমারে বৌদ্ধ সন্ত্রাসীদের দ্বারা মুসলমানদের নির্মম হত্যাকান্ডে তিনি ব্যথিত হয়েছেন। ‘এ মিথ্যে পূর্ণিমায়’, শ্যামল প্রান্তর’ ও ‘প্রতিবেশ’ শীর্ষক কবিতায় এসব ভাবনা প্রকটিত হয়েছে। ‘জীব হত্যা মহাপাপ’-যাদের ধর্মগুরুর বাণী। যারা শয়নে-স্বপনে শান্তির বাণী আওড়ায়, তারাই জাতিগত নিধন কর্মকান্ডে বিশ্বের বুকে ‘সেরাদের সেরা’(!) খেতাব অর্জন করেছে। আপাদমস্তক গেরুয়া বসনে আবৃত এসব বৌদ্ধ ভিক্ষু মুসলিম হত্যাকান্ডে, মুসলিমদের আবাসভূমি থেকে উচ্ছেদে, রমণীদের শ্লীলতা হানিতে প্রধান ভূমিকা পালন করেছে। এগারো লক্ষাধিক নারী-পুরুষ শুধু প্রাণ বাঁচানোর তাগিদে প্রিয় জন্মভূমি আরাকানকে পিছে ফেলে বাংলাদেশে ঠাঁই নিয়েছে। রাখাইন অঞ্চল থেকে মুসলিম জনগণকে উচ্ছেদ করে সেখানে মিয়ানমার সরকার ‘অর্থনৈতিক অঞ্চল’ গড়ে তুলতে চায়। আর এ কাজে তাদেরকে সমর্থন জুগিয়েছে চিন, ভারত, রাশিয়া, ইসরাইলসহ বিভিন্ন মুসলিম বিদ্বেষী দেশের রাষ্ট্রনায়ক। বাংলাদেশের পাশেই এ যেন আরেক ফিলিস্তিন! কবি এ নতুন ফিরিস্তিনের অধিবাসীদেরকে বাঁচানোর উদাত্ত আহবান জানিয়েছেন-

কে আছো ?
বাঁচাতে মানুষ- রক্তের নদী বয়ে যায়।
কে আছো ?
হত্যা উল্লাস থামাতে- বাংলার করুণ ডাঙ্গায়। / এ মিথ্যে পূর্ণিমায়

মুসলিম জনগোষ্ঠীর ওপর অত্যাচার-নির্যাতনের স্টিম-রোলার কখনো কি বন্ধ হবে, আঁধার রাতের অমনিশা বিদূরিত হয়ে মুক্তির সোনালি সূর্য কি পৃথিবীতে উঁকি দিবে- এমন শঙ্কা প্রকাশ করেছেন কবি ; বিশেষত ভিক্ষু ও পুরোহিতরা যখন সশস্ত্র মন্ত্রে উজ্জীবিত- তখন বাংলাদেশের মৌলভীরা হয়ে যায় ‘মৌ-লোভী’, তাদের সততার মানদন্ড নিরূপিত হয় আর্থিক লেন-দেনে। দেশের জনসাধারণ শাহবাগ ও শাপলাচত্বরে মুখোমুখি হয়। মুসলিমদের পদস্খলন দেখে এ দেশের বীর সেনানী তিতুমীর ও হাজি শরীয়তউল্লাহ্ হাসেন। প্রগতির জোয়ারে ফুলে ওঠে সাম্যবাদীদের উদর, তবুও ডুবতেই থাকে ফ্লাইওভারের নিচে বহদ্দারহাট চত্বর। সুবিধাবাদীদের লোলুপ দৃষ্টির অন্তরালে সমাজপ্রগতি ব্যাহত হয়। এজন্য কবির শঙ্কা উত্থিত হয়-
কখনো কি কাটবে নিশি ?
কখনো কি হবে ভোর ?
ঘিরে আছে ভিক্ষু ও পুরোহিত মন্ত্র শ্যামল প্রান্তর… / শ্যামল প্রান্তর

‘প্রতিবেশ’ কবিতায়ও কবি চলমান জীবন-যাত্রায় রতি জীবনের বাস্তবতার সমান্তরালে ভিক্ষু সমাজের নৃশংসতা উল্লেখ করেছেন। যেমন-
ঋতুর আড়ালে চলে ঋতুবতী জীবনের রঙের নাচন
তুমি কোন্ ভিক্ষু ? গেরুয়া জমিনে তো রক্তাভ সব রঙ। / প্রতিবেশ

কবি কাব্যচর্চায় স্বীয় শিল্পবোধের পরিচয় উপস্থাপন করেছেন ‘জলসজ্জা’, ‘বোধ’, ‘বেগানা পাখি’, ‘কবি ও কবিতা’ এবং ‘আমি আসবো, তবে…’ কবিতায়। ‘জলসজ্জা’ ও ‘বোধ’ কবিতায় কবি পরাবাস্তব চেতনা চাঁদ, জলসজ্জা, ফুলসজ্জা, জোছনা, প্রেম ও কামকে প্রতিতুলনার মাধ্যমে উদ্ভাসিত করেছেন। যেমন-
আমার সাথে হাঁটতে হাঁটতে চাঁদের লেগেছে কি ক্লান্তি ?
টুপ করে নেমে যায় চাঁদ জলে ;
আমার অমন দেখে হৃদয়ে লাগে ভ্রান্তি-
অভিমান হলে আমাকে ফেলে কেনো এ জলসজ্জা ? / জলসজ্জা

‘বেগানা পাখি’ কবিতায় কবি বুনো পাখি এবং আরবান পাখির গানের প্রতিতুলনায় শব্দশিল্পীর নিপুণ শব্দশৈলী ও সৌকর্যের কথা কবি উল্লেখ করেছেন। সেক্ষেত্রে বিশ শতকের ভাষাবিজ্ঞানী ‘ফার্দিনান্দ দ্য সসুর’-এর কৃতিত্বকে স্মরণ করছেন। ‘কবি ও কবিতা’য় কবি কবিদের অমরত্ব প্রত্যাশী হওয়ার কথা উল্লেখ করেছেন। সব শিল্পী কালোত্তীর্ণ হওয়ার আকাক্সক্ষা করলেও সবাই কিন্তু কালোত্তীর্ণ হতে পারে না। তবে যে সব কবিতা অনন্ত যৌবন ধারণ করে, তদের কথা ভিন্ন। তারস্রষ্টারা কালের অক্ষরে চিরঞ্জীব হয়ে যান। ফলে ‘আমি আসবো, তবে…’ কবিতায় কবি দূরগামী পথ-পরিক্রমায় আবারও ধুলি-ধরায় প্রত্যাবর্তনের প্রত্যাশা ব্যক্ত করেছেন-
আমি আসবো, তবে একটু ধীর লয়ে গাইবো তোমার গান ;
আমি আসবো, ভেঙে দিতে সময়ের সব অভিমান। / আমি আসবো, তবে …

ম্যুরালে মিথ্যে পূর্ণিমায় ইহজীবনের আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন শেষে কবি প্রবেশ করেছেন অলৌকিক প্রণোদনার জগতে। যেখানে একমাত্র তাঁর চাওয়া মহান স্রষ্টার সন্তুষ্টি, সুফি সাধনার শেষপ্রান্ত ফানাফিল্লাহে উপনীত হওয়া। আর এ জন্যই পবিত্র কা’বা শরিফ প্রদক্ষিণ, আদম-হাওয়ার স্মৃতিময় আরাফাত ও জিদ্দায় পরিভ্রমণ, ইবরাহিম-ইসমাইল-হাজেরা এর কর্মকান্ড স্মরণ ও শেষ নবী হজরত মুহাম্মাদ স. এর স্মৃতিমন্থিত মক্কা ও মদিনা সফরে অন্তরে জাগরিত হয়েছে জান্নাতি দোলা। ‘তাসবিহ্’, ‘অলৌকিক প্রণোদনা’, ‘এক উৎসর্গিত নারীর কাসিদা’, ও ‘আলোর প্রহর’ কবিতা মহান রবের ঘর কা’বা শরীফ কেন্দ্রিক। পবিত্র মাসজিদে হারাম তাওয়াফে কবির মনে যে আবেগ-অনুভূতি অনুরণিত হয়েছে, তাকে তিনি ভাষারূপ দান করেছেন। সাত বার পবিত্র কা’বার তাওয়াফে কবি হাতের মধ্যে কাঠের দানার তৈরি তাসবিহ্ দানায় হিসাব ঠিক রাখেন, দানাগুলি ঘুরতে ঘুরতে যেন অদৃশ্য হয়ে যায়। যাদুমায়া বাস্তবতায় কাঠের দানাগুলো যেন একেকটি নক্ষত্র হয়ে যায়, কবিকে ঘুরাতে থাকে কসমো বাস্তবতায়: চারিদিকে শুধু জিকিরের ধ্বনি উচ্চারিত হয়। কা’বাকে ঘিরে সিজদায় নত হয় সব গ্রহ-নক্ষত্র আর কবির সিনায় উচ্চারিত হয় আল্লাহু আল্লাহ…।
এ কোন্ ক্বা’বা ? এ কোন্ বায়তুল আ-তিক ?
তাকে ঘিরে সিজদারত গ্রহ-নক্ষত্র অন্যসব দিক ;
মায়াবাস্তব, ছায়াবাস্তব, তুমি বাস্তবে সবাই।
অলৌকিক মায়ামন্ত্রে জিকির শুনি আমার সিনায়। / তাসবিহ্

‘অলৌকিক প্রণোদনা’য়’ কবিতা থেকেই কাব্যগ্রন্থের নাম গৃহীত হয়েছে অলৌকিক প্রণোদনা। বিশ্ব জাহানের মালিকের প্রতি কবির ভক্তি ও শ্রদ্ধা এখানে অকৃত্রিমভাবে হৃদয়ের সব ব্যাকুলতা নিয়ে উপস্থাপিত হয়েছে। রাস্তার পর রাস্তা মাড়িয়ে কবি যখন হৃদয়ের কাছাকাছি আরশের বারান্দায় পৌঁছে যাবেন, মহান প্রভু তাঁকে ফেরাতে পারবেন না। শব্দের অহঙ্কারে তাঁর বিশ্বাস নেই, তবে কীভাবে তিনি মহান স্রষ্টার নান্দীপাঠ করবেন? আবার স্রষ্টাই অহঙ্কার করতে নিষেধ করেছেন। যার কণ্ঠে নেই কোন সুর, সে কীভাবে দাউদ আ.-এর বীণা বাজাবে? তবুও হৃদয়কে ধারণ করে রাস্তার পর রাস্তা মাড়িয়ে কবিস্রষ্টার দরবারে হাজির হতে চান।

একজন মানুষের জন্য হৃদয়ের ঐশ্বর্য ছাড়া
এমন কোন বাণী নেই তোমার কাছে পৌঁছানোর ;
কীভাবে অস্বীকার করবো চোখের আল্পনা হৃদয়ের প্ররোচনা ?
অলৌকিক প্রণোদণা’য় রাস্তার পর রাস্তা মাড়িয়ে যখন পৌঁছে যাই-
হৃদয়ের কাছাকাছি, তোমার বারান্দায় ; / অলৌকিক প্রণোদনা’য়

‘এক উৎসর্গিত নারীর কাসিদা’ কবিতায় কবি মা হাজেরা-এর প্রতি তাঁর অকৃত্রিম ভক্তি ও শ্রদ্ধার প্রকাশ ঘটিয়েছেন। জনমানবহীন প্রান্তরে মহান রবের আদেশ শিরোধার্য করে দুধের শিশু নিয়ে জীবন শুরু করেছিলেন তিনি। দুধের বাচ্চার তৃষ্ণা মেটাতে সাফা-মারওয়ার মরিচীকায় সাত বার দৌঁড়িয়েছেন তিনি, তারপর পেয়েছেন আবে জমজমের নহর। সিজদায় লুটিয়েছেন নিজের মস্তক, জননীর মুখে হাসি ফুটে উঠেছে। অতঃপর ইবরাহিম আ. গড়েছেন বাইতুল্লাহ্-এর নতুন সংস্করণ। শুরু হয়েছে হাজ্জে বাইতুল্লাহ। সৃষ্টি হয়েছে মাকামে ইবরাহিম, স্থাপিত হয়েছে হাজরে আসওয়াদ। কবি বিমূর্ত চুম্বনে স্পর্শ করেছেন মাকামে ইবরাহিম, মুলতাজিমের সামনে দাঁড়িয়ে খুঁজেছেন পিতা ইসমাইল আ.-এর পদচিহ্ন। তাওয়াফে লক্ষ করেছেন আফ্রিকার কালো মানুষগুলির সাহস ও সংগ্রাম। হাতিমে সিজদায় সাইয়িদিনা মুহাম্মাদ স.-এর স্মৃতিকে স্মরণ করছেন, রসুল স. অসংখ্যবার এই জমিনে সিজদায় অবনত হয়েছেন। পবিত্র কা’বাগৃহ প্রদক্ষিণ শেষে সা-ঈ করেছেন সাফা ও মারওয়া, আর মা হাজেরার স্মরণে অশ্রু বিসর্জন দিয়েছেন-
মা! তোমার স্মৃতি ক্ব’বার দেয়ালে দেয়ালে ঝলসে ওঠে-
বেদনার্ত নারীর কান্নায়-
ভালোবেশে ওরা কাঁদে ও কাঁদায়
উৎসর্গিত নারীর কাসিদা মুলতাজিমে ঝুলে আছে আমার এ মোয়াল্লাকায়। /এক উৎসর্গিত নারীর কাসিদা

‘আলোর প্রহর’ কবিতায় কবি পবিত্র ক্বা’বা ঘর ও মক্কা নগরীর পাথর সভ্যতার কথা স্মরণ করেছেন। পাথুরে জনপদ মক্কা নগরে উজ্জ্বল আলোকশিখা হাতে নবী-রসুলগণের আগমন ঘটেছে। পৌত্তলিকতার অসারতা বুঝিয়ে তাওহিদের বাণী প্রচার করেছেন তাঁরা। আধুনিক যুগে ঈশ্বর কণার অনুসন্ধনে ব্যাপৃত বিজ্ঞান। অথচ এ পাথরময় সভ্যতা তাদের দৃষ্টিতে অনুধাবনযোগ্য হয়নি। ক্বা’বার চারপাশ যেন বলছে কথা, সভ্যতার নাভিমূল দেয়ালে দেয়ালে। জাবালে ক্বা’বায় দাঁড়িয়ে তাই কবি খোঁজেন আলোর ঝর্ণাধারা। যুগে যুগে এখানে হয়েছে মনুষ্যত্বের চাষ। মহান রবের এ ঘরে মাজলুম জনতার ক্রন্দনধ্বনিতে আরশে আজিম প্রকম্পিত হয়। আরাকান-কাশ্মির-ফিলিস্তিন- বাংলাদেশ এক হয়ে যায়। রোকনে ইয়ামিনি, ক্বা’বার দরোজায় রোনাজারি করে সব মাজলুমের মন। ‘লাব্বাইক আল্লাহুম্মা লাব্বাইক’ ধবনিতে কেঁপে ওঠে মক্কার আকাশ-বাতাস, সে ধ্বনি অনুরণিত হয় মহান রবের আরশে। অশ্রুর ঝর্ণায় আর প্রভুর মায়ায় অতিবাহিত হয় রাতের প্রহর-
মক্কার আকাশে আকাশে হয় রোনাজারি ;
তবুও এ এক শহর যেনো পাথরে পাথর-
নিরন্তর কান্নার কোরাসে চলে রাত্রি ভোর ;
পাথর থেকে জন্ম হবে তবে আলোর প্রহর ? / আলোর প্রহর

বিশ্ব মানবতার শান্তির দূত হজরত মুহম্মাদ স.। তাঁর গুণকীর্তনে কবি রচনা করেছেন ‘মুহাম্মাদ স. এর বেদনায়’, ‘আসসালামু আলাইকুম ইয়া রাসুলাল্লাহ’, ‘একদিন সূর্য ও সবুজ দেখে’ এবং ‘সবুজ গম্বুজ’ । বিশ্বনবি হজরত মুহাম্মাদ স. ৫৭০ খ্রিস্টাব্দে জন্মগ্রহণ করেছিলেন পবিত্র ক্বা’বা ঘরের অতি সন্নিকটে। শৈশব অতিক্রান্ত হয়েছে তায়েফে দুধমাতা হালিমাতুস্ সাদিয়ার কুটিরে। তিনি জন্মের পূর্বেই বাবাকে হারান, ছয় বছর বয়সে মাও পাড়ি জমান পরপারে। কৈশোরে প্রথমে দাদা আব্দুল মুত্তালিব এবং পরে চাচা আবু তালিবের অভিভাবকত্বে তাঁর জীবন অতিবাহিত হয়। যৌবনে ব্যবসা-বাণিজ্যে সিরিয়া বা শাম দেশে গমন করেন। তাঁর সততা ও দক্ষতায় মুগ্ধ হয়ে ধনাঢ্য রমণী খাদিজাতুত্ তাহিরা তাঁকে স্বামী হিসেবে বরণ করে নেন। খাদিজার সেবা ও আন্তরিকতায় মুহাম্মদ স. অত্যন্ত মুগ্ধ ও সন্তুষ্ট ছিলেন। তাঁর জীবদ্দশায় তিনি অন্য কোন নারীকে বিয়ে করননি। যুবক বয়সে হিলফুল ফুজুল গঠন এবং নিপীড়িত মানুষের মুক্তির জন্য হেরা গুহায় ধ্যান সাধনায় হজরত খাদিজা রা. ছিলেন তাঁর প্রধান অনুপ্রেরণাদাত্রী। প্রথম ‘অহি’ নাজিলের পর ভীতি-সন্ত্রস্ত অবস্থায় খাদিজার অভয় বাণী তাঁকে সাহস জুগিয়েছে। তাঁর মৃত্যুর পর চরম বেদনা বুকে নিয়েও তিনি মানুষকে আলোর পথে আহবান করেছেন। কবি ভুলক্রমে জান্নাতুল মুয়াল্লায় হজরত খাদিজাতুত্ তাহিরা রা. এর কবরে গিয়ে হাজির হয়েছেন, যেমন পথ হারায় বাংলাদেশ ; মদিনা সনদ থেকে যায় পুঁথিগত তত্ত্বকথায়। কবি স্মরণ করেছেন জননী খাদিজাকে-
খাদিজার রা. প্রিয় সান্নিধ্য , সত্যকে পাওয়ার অলৌকিক প্রণোদনা,
গারে হেরার স্মৃতি, যাপনের আনন্দ বিষাদগীতি,
তুমি কীভাবে ভুলো ইয়া আইয়ুহাল মুদ্দাস্সির ! / মুহাম্মাদ স. এর বেদনায়

‘আসসালামু আলাইকুম ইয়া রাসুলাল্লাহ’ কবিতায় জ্যোতির্ময় পুরুষ আল্লাহর প্রিয় বান্দা হজরত মুহাম্মাদ স.-এর প্রতি কবির সালাম ও ভক্তি-শ্রদ্ধা প্রকাশ ঘটেছে। স্বর্গীয় সেই মহাপুরুষের সমাধিস্থলে যাওয়ার পূর্বে কবির শরীর প্রকম্পিত হয়, প্রতি স্পন্দনে জাগরিত হয় ভয়ের দোলক ; নিশিরাতে হোটেল কক্ষে বসে গুনতে থাকেন প্রহর-মাদিনার এক-একটি ক্ষণ রৌশনিতে ভরপুর। দূর থেকে চোখে দৃশ্যমান হয় মাসজিদুন নববির সুউচ্চ মিনার, সবুজ গম্বুজ যেন বিশ্বাসের স্থিতধী। এ মিনার ডাকছে যেন সুবহি সাদিকে হৃদয়ের আহবানে আস্সালাতু খইরুম মিনান্ নাউম। তুর্কি খিলানগুলো শৈল্পিক ভাঁজে প্রার্থনারত আকাশের দিকে, মিনারগুলো কাতারবন্দী হয়ে প্রভুর ধ্যানে কিয়ামে দন্ডায়মান। মাসজিদে নববির ইমামের সিজদা ও জিকির আশ্চর্যজনক প্রলম্বিত, সেই প্রভাবে ভুল হয়ে যায় জীবনের সব হিসাব-নিকাশ। মহানবী স.এর রওজা মুবারকের প্রবেশ-দ্বার দারুস সালামে প্রকম্পিত শরীরে ও অশ্রুভরা চোখে এলোমেলা হয়ে যায় সব বিত্ত-বৈভব। এমনি উদ্বেলিত চিত্তে কবি রসুল স.কে সালাম দেন ‘আস্সালামু আলাইকুম ইয়া রাসুলাল্লাহৃ আস্সালামু আলাইকুম ইয়া হাবিবাল্লাহ্ …ইয়া সাইয়িদুল খলক্ , ইয়া রহ্ মাল তুললিল আলামিন!’ বলে। চিন্তা করতে থাকেন রসুল স. কি তার সালামের জওয়াব দিবেন, তিনি কি তাঁর দিদার লাভ করবেন! অন্তত স্বপ্নেও যেন একটিবার তিনি তাঁকে দেখতে পান এবং সেই প্রশান্তিতে সবুজ শ্যামলিমা প্রান্তরে ফিরে যেতে পারেন সেই প্রত্যাশা ব্যক্ত করেছেন।

আমাকে দিয়ো দেখা রাসুলাল্লাহ্! স্বপ্নে হলেও একটিবার ;
প্রেমে প্রবুদ্ধ হয়ে এসেছি এ রুক্ষ মায়াহীন মরুর জাজিরায়।
সালামের জওয়াব দিয়ো উম্মাতের করুণায়।
প্রশান্ত হৃদয়ে যেন ফিরে যেতে পারি-
বাংলার সবুজ শ্যামলিমায়। / আসসালামু আলাইকুম ইয়া রাসুলাল্লাহ

‘একদিন সূর্য ও সবুজ দেখে’ এবং ‘সবুজ গম্বুজ’ কবিতাদ্বয়ে রসুল মুহাম্মাদ স.-এর নান্দীপাঠ করা হয়েছে। উন্মুখ সূর্যের আলোকশিখার মত হৃদয় হতে নির্গত হয় রসুল স.-এর প্রতি অগাধ ও নিবিড় ভালোবাসা। হৃদয়ে সেই মহত্তম পুরুষের স্পর্শ কামনা করেন কবি। মেঘর ভেতর থেকে যেমন রহমের বৃষ্টি ঝরে-তেমনি সবুজ গম্বুজের নিচে শায়িত চিরসুন্দর রহমাতে আলমের তাজাল্লিও যেন তার প্রতি বর্ষিত হয়। আর এজন্য কবি তাঁকে অন্তরের অন্তঃস্থল হতে সালাম জানিয়েছেন-
প্রচন্ড প্রতাপে দেখি সবুজে সবুজ ;
অলক্ষ্যে বেরিয়ে আসে হৃদয় সালাম-
সহিষ্ণু পৃথিবী শোকে, পূণ্য চাই,
রাসুল, তোমাকে সালাম। / একদিন সূর্য ও সবুজ দেখে

মাদিনাতুল মুনাওয়ারার পথে পথে হেঁটে হেঁটে কবি রসুলুল্লাহ্ স.-এর পদচিহ্ন খোঁজেন। অজস্র শপিং মলের ফাঁকে খেজুর বীথির করুণ চিহ্ন দেখে তাঁর হৃদয়ও ম্রিয়মাণ হয়ে যায়। ম্রিয়মাণ হয় রসুল স. এর প্রেমে। অথচ সুবর্ণগ্রামে মানুষের উপচে পড়া ভীড়। এরই ফাঁকে তিনি খোঁজেন আহলে সুফ্ফাদের স্মৃতিচিহ্ন, আবু জার গিফারির নীড়। সব নদীর প্রখরতা স্রোতে, আর মুমিনের ভালোবাসা রাসুল স. এর প্রেমে। সেই রাসুলের স্মৃতিচিহ্ন সবুজ গম্বুজ সৌম্য শান্ত ধীমান হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। মাসজিদে নববিতে রিয়াজুল জান্নায় মুমিনের রোনাজারি অনুরণিত হয়।
মসজিদে নববীর রিয়াজুল জান্নায় কাঁদে ক’জন কাঙাল প্রাণ;
হৃদয় সূক্ষ্ম সুতায় কেনো যেন টান খায়, যাপনের এসব তান। /সবুজ গম্বুজ

পবিত্র হারামাঈন শারিফাঈন জিয়ারাতে এসে কবির মনেও জেগেছে নানা কামনা-বাসনা। কবির এসব চিন্তা-চেতনা অনুরণিত হয়েছে ‘শেষ নোট’, ‘আমার মৃত্যু যেন হয়’, ‘আমিও হাল্লাজ’, ‘ফানাগুচ্ছ’, ‘ভালবাসা মরে না’, ‘জুতাজোড়া’, ‘আপন ভূমি’, ‘তাজাল্লি’ ও ‘ইতিকাফ’ কবিতায়। ‘শেষ নোট’ কবিতায় কবি নিজের মৃত্যু সম্পর্কে কথা বলেছেন। মৃত্যুর পূর্বে পরিচিতজনদের কাছে ক্ষমাপ্রার্থনা করেছেন। আর যদি দেনা-পাওনা থাকে, তা পোষ্যদের কাছ থেকে নিয়ে নিতে বলেছেন। মৃত্যুর দিনটি যদি জুমাবার হয়, তাহলে ভালো ; বৃহস্পতিবার হলে আরো ভালো- কেননা ওইদিনে তিনি তাঁর জননীকে কবরে শুইয়ে দিয়ে ভীষণ কেঁদেছিলেন। মানুষের মৃত্যু হলে বিষয়-ভাবনা যে কলহের কারণ হতে পারে, সেদিন তিনি তা অনুধাবন করতে পেরেছিলেন। কবির মৃত্যুর দিন সোমবারও হতে পারে, কারণ ওইদিনে তাঁর বাবা মৃত্যুবরণ করেছেন। বাবার কপাল চুম্বনে তিনি মৃত্যুর শীতলতা অনুভব করেছেন। নিজের মৃত্যু উক্ত তিন দিন ব্যতীত অন্য যে কোন দিনেও হতে পারে, কারণ মৃত্যু কারো পরওয়া করে না- বা এজাজত নিয়ে আসে না। কবি মরমীসত্তা ফরিদুদ্দীন আত্তার বা মানসুর হাল্লাজ নয়, মরুর মায়া বাঁধে যদি তাঁর শরীরে- কেউ যেন অশ্রুসিক্ত না হয়। আরবের প্রতিটি পাথরে চুম্বনের তৃষা নিয়ে তিনি যাবেন জাজিরায়, যেখানে স্পর্শিত হয়েছে রাসুল স.-এর কদম মুবারক। যেখানে এ মহামানবের ঘাম ঝরেছে, রক্ত পড়েছে ; তবুও তিনি পৌঁছে দিয়েছেন সাম্য ও মৈত্রীর বাণী। যদি তিনি স্বদেশে আর না ফিরে আসেন, লক্ষ পরিব্রাজকের পায়ে পিষ্ট হয়ে শুয়ে যান পবিত্র জমিনে, অথবা তাঁর দম ফুরিয়ে যায় ; তাহলে যেন মাদিনার কাছাকাছি কোন স্থানে তাঁকে দাফন করা হয়-
ক্বা’বার পথিক! আমাকে কবর দিয়ো মদিনার কাছাকাছি
যেনো আমি রাসুলুল্লাহর রওজা দূর থেকে হলও দেখতে পাই,
ঘ্রাণ ও স্পর্শে ক্বা’বাকে কাছে পাই। /শেষ নোট

‘আমার মৃত্যু যেন হয়’ কবিতায়ও কবির মৃত্যুভাবনা প্রকাশিত হয়েছে। অর্জিত পূণ্যে জান্নাতপ্রাপ্তি হবে কি না, কবি জানেন না। এজন্য তিনি মহান রবের কাছে মাগফিরাত কামনা করেন ক্বাবা ও মদিনার দরোজায়। রুকনে ইয়ামানি থেকে হাজরে আসওয়াদ পর্যন্ত কান্নার রোনাজারিতে দিল শুকিয়ে যায়। মুলতাজিম থেকে মাকামে ইবরাহিম- আর্তনাদে আরশ কাঁপিয়ে হাতিমে সিজদায় ও ক্বা’বার দেয়াল ছুঁয়ে ছুঁয়ে পাপ আর প্রত্যাশা তরঙ্গিত হয় ইথারে ইথারে। পূণ্যের জলসা থেকে প্রভু যেন তাকে বঞ্চিত না করেন, সেই প্রার্থনা ধ্বনিত হয় তার কণ্ঠে। কুদরতের নিশানা ধরে জমজমের উৎস খোঁজেন কবি, কেউ হয়তো মাজনুন ভাবে; কেউ ভাবেন বাউল। তিনি তো দেখতে গিয়েছেন কুদরতের নিশানা, যে নিশানা পেয়ে ইবরাহিম আ. হয়েছেন খলিলুল্লাহ্, ইসমাইল আ. হয়েছেন জবিহুল্লাহ্ ; আর কবি আশিকুল্লাহ্ হয়ে ক্বা’বায় মৃত্যু কামনা করেছেন। অর্জিত পূণ্যে জান্নাতে যাবেন কি না, কবি তা জানেন না; সে করণে মাসজিদে নববির খিলান ধরে রাসুলুল্লাহর ঘ্রাণ গ্রহণ করেছেন, এই ঘ্রাণ গ্রহণের অজুহাতে মহান রব যেন তাকে জান্নাত দান করেন। প্রতিদিন ১৭৯ নম্বর খিলান ধরে তিনি সিজদায় যান, যেখান থেকে সবুজ গম্বুজ ঠিক আত্মার অর্ধেক হয়ে যায় ; ধ্যানে-জ্ঞানে আবেগের সম্মোহনে রাসুল চৈতন্যে জাগরুক রয়। প্রতিটি ক্ষণ অতিক্রান্ত হয় রাসুলের প্রেমে, আবু বাকার, উমার, উসমান, আলিসহ কাতেবে অহি লেখকগণের পদযুগলের ছোঁয়া খুঁজেছেন সর্বত্র। শাহুদে বদর ও ওহুদের স্মৃতি নিয়ে অশ্রু ঝরিয়েছেন জায়নামাজে, খন্দকের পাহাড় দেখে সালমান ফারসির বাগান খুঁজেছেন মাদিনার প্রান্তরে। রাসুলের মা’জেজা দেখার লোভে মাইলের পর মাইল হেঁটেছেন তিনি। এক পর্যায়ে রিয়াজুল জান্নায় মৃত্যু কামনা করেছেন-

হায়! এসব না খুঁজে হঠাৎ আমার মৃত্যু যদি হয় রিয়াজুল জান্নায় ;
খোদা কি পারবেন তখন আমাকে জান্নাত থেকে ফেরাতে ?
খোদা, আমার মৃত্যু যেন হয় এ পূণ্যময় রিয়াজুল জান্নায়। / আমার মৃত্যু যেন হয়

কবির ভক্ত হৃদয়ের আবেগ-উচ্ছ্বাসের চরম প্রকাশ ঘটেছে ‘আমিও হাল্লাজ’ কবিতায়। পবিত্র হজ্জব্রত পালনে হাজিকে প্রথমে মুজদালিফার উন্মুক্ত প্রান্তরে অবস্থান করতে হয়। এই উন্মুক্ত যাপনে কবির আকাশ হতে ইচ্ছে করে। আকাশে প্রভু যেভাবে বিরাজমান, ঠিক সেভাবে তার পাশে তিনি থাকবেন- এটা তার একান্ত কমনা। পবিত্র ক্বাবাগৃহে রবকে পাওয়ার আগে এ যেন আত্মাকে তৈরি করে নেওয়া, মুলতাজিমে কাঁদার আগে উপলব্ধির সোপানে নিজেকে প্রস্তুত করা; প্রান্তিক জীবনে মৃত্তিকা সংলগ্ন হয়ে মহান প্রভুর দরবারে নিজেকে সমর্পণ করা। আরাফার ময়দানে মুমূর্ষু হতে হতে তিনি স্রষ্টাকে দেখতে চেয়েছেন মুসার মত, তাওয়াফের কদমে কদমে মিলাতে চেয়েছেন নবীদের পায়ের ছাপ। মহানস্রষ্টার কাছে কবি শব্দ-সৌভাগ্যের ঈর্ষা কামনা করেছেন। আশা প্রকাশ করেছেন মানসুর হাল্লাজ হওয়ার-
ইবরাহিমু খলিলুল্লাহ’র মাকাম ছুঁয়ে ছুঁয়ে আনাল হক হয়ে-
যেতে যেতে যেনো বলে ফেলতে পারি ‘আমিও হাল্লাজ’। / আমিও হাল্লাজ

‘ভালবাসা মরে না’ কবিতায় কবি ভালবাসার প্রিয়সত্তাকে খুঁজে পেয়েছেন। এ কবিতায় কবি প্রসঙ্গত প্রফেসর আবদুর রাজ্জাকের একটি উক্তি উদ্ধৃত করেছেন। যেখানে তিনি বলেছেন, ‘যে নগরে যাও না কেন, মানুষ চেনার দুটো জায়গা রয়েছে, একটি হলো কাঁচা বাজার ; অন্যটি লাইব্রেরি।’ কবি মাদিনাকে খুঁজতে খুঁজতে ‘মাকতুবাতে আবদুল আজিজ’ (আবদুল আজিজ গণগ্রন্থাগার)-এ প্রবেশ করেন। সেখানে তাঁর স্মরণে দোলা দিয়ে যায়, সবুজ গম্বুজের সেই ইমামের কথা; যিনি ভালবাসাকে সবার ঊর্ধ্বে রাখতে সবুজ গম্বুজ আগলে রেখেছিলেন। তিনি দৌড়াতে থাকেন গারকাতুল বাকির দিকে, হৃদয়ের সব আকুতি দিয়ে তাঁকে সালাম জানানোর অভিপ্রায়ে। পথেই দেখতে পান আমিরুল মুমিনিন হজরত উসমান গনির কবর, হৃদয় কন্দরে অনুরণিত হয় আরবের ধনাঢ্য ও ক্ষমতাবান বাদশাহের সাধারণ জীবন যাপনের কাল-পরিক্রমার যাত্রাধবনি। একেকটি কবর ঘিরে একেক ধরণের কৌতূহল প্রশমিত করে কবি খুঁজতে থাকেন ইমাম মালিক র. এর কবর, যিনি মাসজিদে নববিকে করেছিলেন অনিশেষ জ্ঞানকেন্দ্র। এক ভিন্ ভাষীর কাছে তিনি পেয়ে যান জান্নাতুল বাকির নকশাচিত্র, দ্রুত স্ক্রিনশর্টে তা সংরক্ষণ করে হাজির হন তাঁর পরম প্রিয়জন ইমাম মালিক র. এর কবরে। দূর থেকে সবুজ গম্বুজ প্রশান্ত হৃদয়ভাষ্যে তাকে জানালো-
ভালোবাসো, ভালোবাসে, ভালোবাসা মরে না,
ভালোবাসাকে যতন করে রেখে দিতে হয় ঠিক সবুজ গম্বুজের মতো। / ভালোবাসা মরে না

‘জুতো জোড়া’ কবিতায় জুতা চুরি ও রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস প্রসঙ্গ উত্থাপিত হয়েছে। কবির জুতা জোড়ায় হারামাইন শরিফের স্মৃতি জড়িয়ে আছে, তিনি মাদিনার মাসজিদে নববি থেকে মাসজিদে কুবায় গিয়েছেন এ জুতা পরে, জাবালে সুর ও মাদিনার অলি-গলিতে রাসুল স.-এর পদচিহ্ন খুঁজেছেন একান্ত মনে। কবি দেশে ফিরে দ্যাখেন- জুতা চোরের উপদ্রব বৃদ্ধি পেয়েছে, এমনকি মাসজিদেও জুতা নিরাপদ নয়। জুতা প্রসঙ্গ ভাবনায় নিয়ে নামাজ আদায়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন তিনি। এমনকি রাষ্ট্রেও জুতা তথা মান-সম্মান-সার্বভৌমত্ব নিয়ে ষড়যন্ত্র তাকে ব্যথিত করেছে। ‘আপন ভূমি’ কবিতায় কবি জান্নাতকে আপনভূমি বলে উল্লেখ করেছেন। আদমের ভুলের কারণে যে বাসস্থান থেকে আদমের সন্তানরা বাস্তুচ্যূত হয়েছে, কবি সেই জান্নাতে ফিরে যেতে চান।
আমার আবাস ফিরিয়ে দিয়ে, করো তোমার পার্শ্বচারী ;
পাবে তুমি শোকর গুজার- জিকির জিকির হামদে-বারী। / আপন ভূমি

‘ফানাগুচ্ছ’ চারটি খন্ড কবিতার সংকলন। ইলমে তাছাউফে মহান স্রষ্টা রব্বুল আলামিনের সাথে ব্যক্তি সত্তাকে বিলীন করে দেয়াকে ফানাফিল্লাহ্ বলে। কবি এসব কবিতায় মহানস্রষ্টার রঙে রঙিন হওয়ার আকাঙ্ষারব ব্যক্ত করেছেন। জীবনকে তিনি আজান ও নামাজের মধ্যবর্তী সময় বলে আখ্যায়িত করেছেন। মহান প্রভুর ঘরে প্রতিদিন পাঁচবার হেঁটে হেঁটেই তিনি সালাতে হাজির হতে চান, কখনও শুয়ে যেতে চান না; যদিও বেয়াদবের মত একদিন তিনি মানুষের কাঁধে চড়ে শুয়ে শুয়ে যাবেন, সেদিন স্রষ্টাকে পেয়েই অমন বেয়াদব হতে চান। স্রষ্টারসত্তায় লীন হয়ে স্বীয় জীবনের সার্থকতা অনুসন্ধান করেছেন তিনি।

তোমাকে ধারণ করেছি ঠোঁটে
তোমাকে ধারণ করেছি বুকে
তোমাকে ধারণ করেছি হৃদয়ে
তোমাকে ধারণ করেছি সত্তায় ; / ফানাগুচ্ছ

আধ্যাত্মিকতার পরম প্রকাশ ঘটেছে ‘তাজাল্লি’ কবিতায়। কবি স্বীয় নাফ্সের কাছ থেকে কামনার বহ্নিশিখা লুকাতে পারেন না, আবার কাশ্ফের কাছেও নিজেকে সম্পূর্ণ মেল ধরতে পারেন না ; ফলে নাফসের মায়ায় কাশ্ফের ছায়ায় তিনি পরিভ্রমণ করেন। মহান মালিকের তাজাল্লিতে তিনি যদি পুড়ে জ্বলে যান, তাতে তার কোন আফসোস নেই, বরং হজরত মুসা আ. এর সাহস নিয়ে তুর পাহাড়ে নিদ্রা যাওয়াকেই পরম সুখ বলে উল্লেক করেছেন।

‘ইতিকাফ’ কবিতায় মহান স্রষ্টারব্বুল আলমিনের জন্য কবির ধ্যান মগ্নতা ও চিন্তা-চেতনার বিকাশ ঘটেছে। ইতিকাফ পালনে প্রভুর ঘরে নির্জন যাপনে তার মনে ভয়ের উদ্রেক হয়, তিনি যেন দিশাহীন চিত্তে প্রভুকে খুঁজতে থাকেন; তার মনোভূমিতে প্রশ্ন জাগে স্রষ্টা কি আপন, না পর? চারদিকে শূন্যের মাঝে জিকিরের শব্দ প্রতিধ্বনিত হয়-‘ইল্লাল্লাহ্’, ‘লা-হাওলা ওয়ালা কুওয়াতা ইল্লাবিল্লাহ্’। ধ্যানে-জ্ঞানে-প্রবল চৈতন্য জ্ঞানের সংশ্লেষণে শূন্যের মাঝেই কবি পূণ্য খুঁজে দিল ঠিক করে নেয়ার কথা বলেছেন।
এ শূন্য মহলে জিন ইনসান সব এক
সবাই খোঁজে এক ইলাহ্’র নজদিক,
তবু লাগে ভয় করে কিনা জিন এদিক-সেদিক
চলে হৃদয়ে শুধু যিকির যিকির… । / ইতিকাফ

‘চিরায়ত ইতিহাস’ ও ‘টুকরো কবিতা’ দুটিতে পথিরীর চিরন্তন ইতিহাস এবং ইসলামের সুশীতল শান্তিছায়ার কথা উচ্চারিত হয়েছে। ‘চিরায়ত ইতিহাস’ কবিতায় কবি শব্দশিল্পীর শব্দ, পদ, পঙক্তি, উপমা ও উৎপ্রেক্ষা সৃজনে শিল্পকুশলতার প্রসঙ্গ উত্থাপন করেছেন। মুসা আ. এর উম্মত যেমন অজস্র প্রশ্নবাণে তাদের মনোভাব পরিস্ফুটিত করতো, কবিরাও তদ্রুপ তাদের নির্মিত শব্দসোপানে, ভাবের নিমগ্ন দাহনে ও উত্থাপিত জিজ্ঞাসায় নবীদের অনুভবে মানুষের কষ্টের কবি হয়ে ওঠেন। তাদের শব্দপুঞ্জে উদ্বেলিত হয় চিরায়ত মানুষের সংগ্রাম সাধনা। অতীতে যারা শ্রেণি সংগ্রামের কথা বলে মানুষকে দাসে পরিণত করেছিল, তারা ও তাদের নীতিমালা মুখ থুবড়ে পড়েছে, ইতিহাসের আস্তাকুঁড়ে নিক্ষিপ্ত হয়েছে তাদের তত্ত্বকথা।
তারাতো থেতলে গেছে ইতিহাস থেকে প্রভাতের আলো না দেখে ;
পঁচা ইতর হয়ে বেঁচে আছে নিজস্ব পান্ডুলিপিতে ;
মানুষের হৃদয়ে নয়, ভেসে গেছে গন্ধময় গঙ্গার জোয়ারে। / চিরায়ত ইতিহাস

‘টুকরো কবিতা’য় কবি ঝঞ্ঝা-বিক্ষুব্ধ ধরাধামে শান্তির শ্বেত-কপোত মহামানব হজরত মুহাম্মাদ স. এর বাণীর বাস্তব প্রয়োগে শান্তি প্রতিষ্ঠার কথা ব্যক্ত করেছেন। জলজ সত্য, ন্যায় সত্য ও জীবন সত্যের সংমিশ্রণে জাগরিত সমস্যাসমূহের সমাধান একমাত্র সেই মহামানবের হাতেই সম্পন্ন হয়েছে।
এমন এক মুগ্ধ আলো মানুষের চোখে-
যে আলোয় মানবতা পেয়েছে দিশা ;
আলোর পিদিম জ্বেলেছে যা মরু বুকে-
মদিনার ঘরে ঘরে রচেছে যা সুরের নেশা ;
ছড়িয়েছে শান্ত সমীর বিশ্ববিবেকে। / টুকরো কবিতা

কবি মাঈন উদ্দিন জাহেদ ছন্দ ব্যবহারে প্রধানত গদ্যছন্দের অনুসারী। গদ্য ছন্দ ব্যবহারেই তাঁর মুগ্ধতা। তবে দু একটি কবিতায় স্বরবৃত্ত ছন্দও ব্যবহার করেছেন। যেমন-
বন্ধুরা সব/ মুগ্ধ ছিলো,/ মুগ্ধ ছিলে,/ (৪+৪+৪ মাত্রা)
কাব্যকথার/ বাচিক সভায়/ অমন তোমার/ স্বরশী ((৪+৪+৪+৩ মাত্রা)
মুগ্ধ ছিলো/ রবির গানে/ তোমার প্রাণে/ (৪+৪+৪ মাত্রা)
উছল গীতি/ ক্বণন সুরে/ প্রাণ হরণে। / (৪+৪+৪ মাত্রা) / সান্ধ্যবেলা

গদ্যছন্দের উদাহরণ-
প্রতিটি সন্ধ্যা ও রাত মন্থিত হয় হৃদয় আবেশে রাসুলের নামে,
সাহাবিদের খুশবো নিয়ে নিয়ে, আবেগকে মুড়িয়ে প্রতিটি পল;
কাতারে কাতারে খুঁজেছি হজরত আবু বাকার, উমার, উসমান
হজরত আলী রা. সহ সমস্ত ওহি লেখকদের পদযুগল; / আমার মৃত্যু যেন হয়

অলঙ্কার প্রয়োগে কবির পরঙ্গমতা অনস্বীকার্য। অনুপ্রাস, চিত্রকল্প, উপমা, উৎপ্রেক্ষা ও রূপক তিনি ব্যবহার করেছেন। যেমন-
# অনুপ্রাস : স্নানে ঘ্রাণে প্রাণে মগ্ন, থাকে মুগ্ধতার সৌরভে
স্মৃতিতে ফিরে ফিরে তারুণ্যের যুগল উৎসবে। / চিহ্ন
# চিত্রকল্প : শরীর কাঁপছে তখন, থরথর করছে বুক,
নিশিরাত- হোটেল রুমে বসে গুনছি প্রহর;
মদিনার এক একটি ক্ষণ রেশনীতে ভরপুর
প্রতি স্পন্দনে জেগে ওঠে ভয়ের দোলক। / আসসালামু আলাইকুম ইয়া রাসুলাল্লাহ্

# উপমা : মুসার উম্মতের মতো তোমার অজস্র প্রশ্ন কীভাবে লতিয়ে ওঠে- / চিরায়ত ইতিহাস
#উৎপ্রেক্ষা : প্রশান্ত হৃদয়ে যেন ফিরে যেতে পারি-
বাংলার সবুজ শ্যামলিমায়। / আসসালামু আলাইকুম ইয়া রাসুলাল্লাহ্

# রূপক : চান্নিপ্রহর রাতে গুলনাহারের মুখ বিষাদের থালা হয়ে ওঠে ;
ভাগ্য বিড়ম্বনায় সংসার স্বামীর মৃত্যুক্ষণ বিমর্ষ করে তোলে
স্মৃতিতে ভাসতে থাকে ডুবন্ত তীর মাঝে
দিকহীন ঘুরতে থাকা ধুকধুকানি- ঢেউয়ের মতোন। / গুলনাহার দিস্তান

কবি মাঈন উদ্দিন জাহেদ অলৌকিক প্রণোদনা কাব্যে সামাজিক ও আধ্যাত্মিক বিষয় ভাবনায় স্বকীয় চিন্তা-চেতনার প্রতিফলন ঘটিয়েছেন। সমকালীন সমাজের নানা অসঙ্গতি ও মানবিক দুর্গতি তাঁকে ব্যথিত করেছে। তিনি ম্যুরালের মিথ্যা জগৎ থেকে দূরে সরে এসে মহান প্রভুর দরবারে অবনত মস্তকে ক্ষমা প্রার্থনা করেছেন এবং তাঁর প্রিয় বান্দা হজরত মুহাম্মাদ স. এর একান্ত সান্নিধ্য কামনা করেছেন। প্রসঙ্গত পবিত্র হাজ্জ পালনে তাঁর মনের আকুতিকে তিনি আলোচ্য কাব্যগ্রন্থে ভাষারূপ দান করেছেন। কবির এ সাধনা সুফি সাধনা তথা ইলমে তাসাউফের অন্বেষণে ব্যাপৃত ও মহান রব্বুল আলামিনের সন্তুষ্টি অর্জনে নিবেদিত।

ড. ইয়াহ্ইয়া মান্নান

ড. ইয়াহ্ইয়া মান্নান

জন্ম:- ২ ফেব্রুয়ারি ১৯৭২, জামদিয়া, বাঘারপাড়া, যশোর। 

পেশা- কলেজ শিক্ষক (সহকারী অধ্যাপক, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় মূল ক্যাম্পাস)

আগ্রহ- গবেষণা, গল্প ও প্রবন্ধ

সম্পাদনা - বনফুলের ছোটগল্প (২০১৭, ইত্যাদি গ্রন্থপ্রকাশ, ঢাকা।

প্রকাশিত গ্রন্থ-
আল মাহমুদ ও বিচিত্র অনুষঙ্গ (প্রবন্ধ গ্রন্থ-২০০৭, প্রীতি প্রকাশন, ঢাকা)
আল মাহমুদের উপন্যাস: বিষয় ও চিন্তা (গবেষণাগ্রন্থ - ২০০৭)
শামসুদদীন আবুল কালামের উপন্যাসে সমাজ বাস্তবতা (গবেষণাগ্রন্থ-২০০৮, ইত্যাদি গ্রন্থ প্রকাশ, বাংলা বাজার, ঢাকা।)
ইবরাহীম খাঁর সাহিত্য সাধনা ও চিন্তাধারা (গবেষণাগ্রন্থ, ২০১৭, ইত্যাদি গ্রন্থ প্রকাশ, বাংলা বাজার, ঢাকা)

ইমেইল- dr.eahea.m@gmail.com

One thought on “মাঈন উদ্দিন জাহেদের অলৌকিক প্রণোদনা: বিষয় ও শিল্পরূপ

  • সম্পাদক
    October 15, 2019 at 11:24 am
    Permalink

    অনেক চমৎকার এবং প্রাণোবন্ত আলোচনা। সহজাতের জন্য শুভকামনা।

    Reply

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

%d bloggers like this: