বনদেবতা – ভ্লাদিমির নবোকভ

ভ্লাদিমির নবোকভের [মূল রুশ উচ্চারণ- ভ্লাদিমির নাবোকাফ (vlʌ’dimɪr nʌ’bɔkəf)] জন্ম ১৮৯৯ সালে, ২২শে এপ্রিল, রাশিয়ার সেইন্ট পিটার্সবুর্গে। বাবা ছিলেন রাজনীতিবিদ, আইনজীবী ও সাংবাদিক, মায়ের দিক থেকেও নবোকভের পরিবার বেশ সম্ভ্রান্ত এবং ধনী ছিলেন। ছোটবেলা থেকেই পারিবারিকসূত্রে তিনটি ভাষায়ই দক্ষ হয়ে উঠেন। পড়েছেন প্রচুর— রুশ, ইংরেজি এবং ফরাসি ভাষায়। শুরুটা কবিতা দিয়েই। মাত্র পনের এবং আঠার বছর বয়সেই প্রকাশিত হয় তার দুটি কবিতাগ্রন্থ। পরবর্তীতে কথাসাহিত্যের দিকেই মনোযোগী হন।
রুশ বিপ্লবের পরপরই নবোকভের পরিবারকে নির্বাসনে যেতে হয়, সেন্ট পিটার্সবুর্গ শহর থেকে দূরে, প্রথমে ক্রিমিয়ায় এবং এরপর ইংল্যান্ডে কিছুকাল। সেখানে লন্ডনের ট্রিনিটি কলেজে জীববিদ্যা নিয়ে পড়াশোনা করেছেন। এরপর স্লোভানিক আর রোমান ভাষা নিয়ে। এরমধ্যেই তার পরিবার স্থায়ীভাবে বসবাস করার জন্য বার্লিনে চলে যায়, পড়ালেখা শেষ করে নবোকভও চলে যান বার্লিনে। বার্লিনেই আততায়ির হাতে নিহত হয় তার বাবা, পরবর্তীতে নবোকভের সাহিত্যকর্মে যেই মৃত্যু ব্যাপক প্রভাব ফেলেছিল। সে সময়ে লেখালেখি করতেন ভ্লাদিমির সিরিন ছদ্মনামে। ১৯২৫ সালে বিয়ে করেন রাশিয়ান এক ইহুদি মহিলাকে এবং ১৯৩৭ সালের দিকে জার্মানি ছেড়ে যান ফ্রান্সের উদ্দেশ্যে। প্যারিসে গিয়ে বসবাস শুরু করেন, কিন্তু ১৯৪০ সালের দিকে জার্মান বাহিনী প্যারিস আক্রমণ করলে নবোকভের পরিবার প্যারিস ছেড়ে আমেরিকার উদ্দেশ্যে রওনা হয়। ম্যানহাটনে বসবাস শুরু করেন তারা। নভোকভ সে সময়ে আমেরিকান মিউজিয়াম অব ন্যাচারাল হিস্টরিতে পতঙ্গবিদ হিসেবে কাজ শুরু করেন। ১৯৪১ সালে নবোকভ ওয়েলসলি কলেজে তুলনামূলক সাহিত্যের প্রভাষক হিসেবে যোগ দেন। পরবর্তীতে নিজ উদ্যোগে রাশিয়ান ডিপার্টম্যান্ট চালু করেন সেই কলেজে। ১৯৪৫ সালে আমেরিকার নাগরিকত্ব লাভ করেন এবং রাশিয়ান ডিপার্টম্যান্টে রাশিয়ান ভাষা ও সাহিত্য পড়াতে শুরু করেন। ১৯৪৮ সালে ওয়ালসলি কলেজ ছেড়ে কর্নেল ইউনিভার্সিটিতে রাশিয়ান এবং ইউরোপিয়ান সাহিত্য পড়ানো শুরু করেন, সেখানে ১৯৫৯ সাল পর্যন্ত ছিলেন। নবোকভের এই ইউরোপ, আমেরিকা ভ্রমণের অভিজ্ঞতার ছাপ দেখতে পাই তার Lolita উপন্যাসে, ১৯৫৩ সালের দিকে তিনি ওরেগনে বসবাস শুরু করেন, সেখানেই লিখে শেষ করেন Lolita। সেখানে সারাদিন প্রজাপতি ধরে বেড়াতেন আর লেখালেখি করতেন, সে বছরই আবার নিউইয়র্কে চলে যান। Lolitaউপন্যাস ব্যাপক জনপ্রিয়তা ও সাফল্য লাভ করলে তিনি পুনরায় ইউরোপে চলে যান, মৃত্যুর আগ পর্যন্ত সুইজারল্যান্ডের একটি হোটেলেই থেকেছেন নবোকভ, সাথে ছিল তার স্ত্রী। বাকি জীবন তিনি লেখালেখি আর প্রজাপতি ধরে কাটিয়েছেন। ১৯৭৬ সালের দিকে জ্বরে আক্রান্ত হয়ে ভর্তি হন হাসপাতালে, কিন্তু জ্বরের কারণ খুঁজে বের করা যায়নি। প্রায় একবছর পর, ১৯৭৭ সালে পুনরায় হাসপাতালে ভর্তি করানো হলে সেবছরেই ২রা জুলাই হাসপাতালেই মৃত্যু হয় তার।

লেখালেখির পাশাপাশি অনুবাদও করেছেন প্রচুর। ইয়েটস, শেইক্সপিয়ার, রমাঁ রল্যাঁ, গ্যোটে, টেনিসন আরও অনেকের লেখাই রুশ ভাষায় অনুবাদ করেছিলেন। লেখালেখির শুরুতে রুশ ভাষায় লেখলেও পরবর্তীতে ইংরেজিতেই লেখতে থাকেন। তাঁর বিখ্যাত উপন্যাস Lolita, Pnin, pale fireইংরেজিতেই লেখা। নিকোলাই গোগোলের একটা জীবনীগ্রন্থও লিখেছিলেন। প্রায় প্রতিটি লেখাই সাহিত্যিক গুণমানের দিক থেকে সমৃদ্ধ হলেও নবোকভ বিশেষভাবে পরিচিত Lolitaউপন্যাসের জন্যই, এবং বিতর্কিতও।
Lolitaছাড়াও তাঁর অন্যান্য উপন্যাসের মধ্যে আছে, Laughter in the Dark(রুশ ভাষায় লেখা), The Real Life of Sebastian Knight, Pnin, Pale Fire, Ada or Ardor: A Family Chronicle, Look at the Harlequins!, The Original of Laura…
এবং গল্পগ্রন্থ : Nine Stories, Nabokov’s Quartet, A Russian Beauty and Other Stories, Tyrants Destroyed and Other Stories।
Strong Opinionsনামে একটা সাক্ষাৎকার সংকলনও আছে, যেখানে বিভিন্ন সময়ে দেয়া সাক্ষাৎকারগুলো সংকলিত হয়েছে।

অনূদিত গল্পটা মূল রাশিয়ান ভাষায় লেখা, ১৯২১ সালে, নবোকভের প্রথম প্রকাশিত গল্প। তার অন্যান্য লেখার মতই এখানেও ভাষার কাব্যিকতা লক্ষ্য করা যায়। এবং গল্পটাতে বিশেষ করে পরিবেশ সচেতনতার ব্যাপারটি ফুটে উঠেছে। গল্পটাতে রাশিয়ান রূপকথার একটা চরিত্র ‘বনদেবতার’ কথা বলা হয়। ইন্ডাস্ট্রিয়ালাইজেশানের যুগে বন কেঁটে যখন সব সাফ করে ফেলা হচ্ছে, তখন গৃহহীন এক বনদেবতা পালিয়ে বেড়াচ্ছে বন থেকে বনে। কিন্তু তার নিস্তার নেই। শেষ পর্যন্ত মানুষের বেশে সে মিশে যায় মানব সমাজে। এখানে বিশেষভাবে নবোকভের নিজের দেশ থেকে নির্বাসিত হওয়ার ব্যাপারটির সাথে আশ্চর্য মিল পাওয়া যায় এই বনদেবতার। নবোকভ হয়ত গল্পের চরিত্রটির আঙ্গিকে নিজেকেই এঁকেছেন। গল্পটাতে জাদুবাস্তবতার একটা ছাপ আছে, যদিও তখনও জাদুবাস্তব ধারাটি দুনিয়াব্যাপী এত প্রভাব বিস্তার শুরু করেনি। অনুবাদ করতে গিয়ে যে একটা সমস্যায় পড়তে হয়েছে সেটা হচ্ছে wood-sprite শব্দটা, রাশিয়ান রূপকথায় Ле́ший (Leshii)একটি বিশেষ চরিত্র, লিঙ্গভেদে পুরুষ এবং মানবাকৃতির, এবং ইচ্ছাকৃতভাবে আকার, আকৃতি এবং চেহারা পাল্টাতে সক্ষম, ইংরেজি অনুবাদে একে wood-sprite করা হয়েছে। কিন্তু অনুরূপ কোনও চরিত্র আমাদের ভাষা বা সংস্কৃতিতে আছে বলে জানা নেই। ফলে, শেষপর্যন্ত বনদেবতায় এসেই ঠেকতে হল। কিন্তু আশা করি তাতে খুব একটা ক্ষতি হয়নি । ইতোমধ্যে আর কেউ এটার অনুবাদ করেছেন বলে জানা নেই। যদিও নবোকভ অপরিচিত নয় আমাদের মাঝে, তারপরও তুলনামূলকভাবে অন্যান্য রাশিয়ান লেখকদের চেয়ে নবোকভের বঙ্গানুবাদ বেশ দুর্লভ বলেই মনে হয়, অন্তত আমার চোখে পড়েনি তেমন। আশা করি ভবিষ্যতে আমাদের অনুবাদকেরা নবোকভের উপর কিছুটা সদয় হবেন।
-অনুবাদক, তানভীর আকন্দ

বনদেবতা – ভ্লাদিমির নবোকভ

বেশ মনোযোগ দিয়ে দোয়াতদানির কম্পমান, গোলাকার ছায়াটির নকশা এঁকে নেয়ার চেষ্টা করছিলাম। পাশের ঘরে ঘড়িতে একঘন্টা পার হয়ে গেল, আর তখন স্বপ্নের ঘোরে মনে হল যেন কেউ একজন দরজায় টোকা দিচ্ছে, প্রথমে আস্তে এবং তারপরে আরও জোরে। পরপর বারো বার টোকা দেয়ার পর প্রত্যাশিতভাবেই থেমে গেল।
‘হ্যাঁ আছি, ভেতরে এসো…’
হালকা ক্যাঁচক্যাঁচ শব্দে বেজে উঠল দরজার হাতল, জ্বলন্ত মোমের শিখাটি কেঁপে উঠল, আর চতুষ্কোণ একটা ছায়ার ভেতর থেকে একলাফে পাশে বের হয়ে এল সে, তার শরীর ঝুঁকে আছে সামনে। ধূসর রঙের তুষারে আচ্ছাদিত তারাভরা রাতের পরাগরেণুতে মাখা।
মুখটা আমার চেনা—ওহ, কতকাল ধরে যে চেনা!
তার ডান চোখ তখনও ছায়ার আড়ালে, বাম চোখ সশঙ্কোচে উন্মোচিত হল আমার সামনে। দৃষ্টি প্রসারিত এবং ধোঁয়াটে-সবুজ রঙের চোখ। মরিচার কণার মত ঝলকে উঠলো চোখের তারা…কপালের উপরে শ্যামলা-ধূসর গুচ্ছটি, রুপালি রঙের প্রায় অলক্ষণীয় ম্লান ভুরুজোড়া, জুলফিবিহীন মুখের কাছে কৌতুকে কুঞ্চিত কিছু বলিরেখা— এইসব জানি কেমন করে আমার স্মৃতিকে উসকে দিচ্ছিল আর অস্পষ্টভাবে যন্ত্রণা দিয়ে যাচ্ছিল।
উঠে দাঁড়ালাম আমি আর সে এগিয়ে এল সামনে।
মলিন কোটটায় মনে হয় ভুল দিকে বোতাম লাগানো—মেয়েদের কোটের মত উল্টো দিকে। হাতে একটা টুপি—নাহ, গাঢ় রঙের, পলকা বাঁধনের একটা পোঁটলা যার মাঝে টুপির কোনও চিহ্ন পর্যন্ত নেই…
হ্যা, অবশ্যই চিনি তাকে—হয়ত একমনকি পছন্দও করি, কেবল মনে করতে পারছি না ঠিক কবে এবং কোথায় আমাদের দেখা হয়েছিল। এবং বেশ অনেকবারই হয়ত দেখা হয়ে থাকবে আমাদের, নাহলে সেই ক্র্যানবেরির মত ঠোঁট, সূচালো দুটি কান, সেই চমৎকার কণ্ঠমণি এত স্পষ্টভাবে স্মরণে আসত না…
ফিসফিস করে সম্ভাষণ জানালাম তাকে আর তার হালকা শীতল হাতটি ধরে ঝাঁকুনি দিয়ে ভাঙা একটা আরাম কেদারার পেছনে হাতটা রাখলাম। বসল সে, ঠিক একটা কাটা গাছের গুড়ির উপর বসে থাকা কাকের মতই এবং ব্যস্তকণ্ঠে কথা শুরু করল।
‘রাস্তায় ভয় লাগছিল। তাই চলে এলাম তোমার সাথে দেখা করতে। চিনতে পেরেছো? একসময় দিনের পর দিন তুমি আর আমি, দুইজনে একসাথে ছুটাছুটি, হৈ চৈ করে বেড়াতাম। আমাদের সেই পুরনো গ্রামে। আবার বলো না যে ভুলে গিয়েছ!’
আক্ষরিক অর্থেই তার কণ্ঠস্বর অন্ধ করে দিল আমাকে। চোখ ঝলসে গেল, হতবুদ্ধি হয়ে গেলাম—মনে পড়ে গেল সেই উল্লাস, সেই প্রতিধ্বনি, অপূরণীয়, সীমাহীন উল্লাস…
নাহ্। অসম্ভব— আমি একা…এ কেবলই ক্ষণিকের বিভ্রম। তারপরও সত্যি সত্যিই আমার পাশে কেউ বসে ছিল, কেমন অসঙ্গত, শীর্ণদেহ তার, উঁচু মাথাওয়ালা জার্মান বুট পায়ে। আর তার গলার আওয়াজ ঝনঝনিয়ে উঠল, খসখসে—সোনালি, শ্যামল-সবুজ, বেশ পরিচিত—যদিও শব্দগুলো বেশ সরল, বেশ প্রাণবন্ত…
‘এইত—মনে আছে তোমার। হ্যাঁ, আমিই সেই প্রাক্তন বনদেবতা, দুষ্ট প্রেত। আমার এ অবস্থা আজ, অন্য সবার মত আমাকেও তাড়িয়ে দেয়া হয়েছে।’

দীর্ঘ একটা নিঃশ্বাস ছাড়ল সে, আর আমার চোখের সামনে আরও একবার ভেসে উঠল কাঁপতে থাকা অলৌকিক আলোর বলয়। পাতাঘেরা সুবিশাল তরঙ্গসমূহ, শাশ্বত, সুরেলা গুঞ্জনের উপর সমুদ্রফেনার আছড়ে পড়ার মত বার্চের বাকলের উজ্জ্বল ঝলকানি….আমার দিকে ঝুঁকে এসে নম্রভাবে তাকালো সে চোখের দিকে। ‘মনে আছে আমাদের সেই বন, সাদা বার্চ গাছ, কাল দেবদারুগুলি? সবকিছুই কেটে ফেলেছে তারা। এই দুঃখ সহ্য করা যায় না—চোখের সামনে প্রিয় বার্চগুলি মড়মড় করে ভেঙে পড়ল। আর আমি কিইবা করতে পারতাম? আমাকে তাড়িয়ে নিল তারা জলভূমির দিকে, আমি কাঁদলাম, চিৎকার করলাম, গজরাতে থাকলাম বকের মত, শেষপর্যন্ত পালিয়ে গেলাম পাশের এক পাইনের জঙ্গলে।
‘সেখানে শোক পালন করলাম আমি, কাঁদতে থাকলাম অবিরল। এতে আমি অভ্যস্ত হয়ে উঠতে পারিনি, আর দেখ, পাইনের বনও আর কিছু অবশিষ্ট রইল না, কেবল ধূসর-নীল অঙ্গার। আমার আরও কিছুদূর যেতে হল। একটা বন খুঁজে পেলাম—চমৎকার একটা বন, ঘন, অন্ধকার আর শীতল। যদিও কোনওভাবেই তা আগের মত ছিল না। আগের দিনগুলিতে সকাল-সন্ধ্যা আমি ঘুরে বেড়িয়েছি, উন্মাদের মত সিটি বাজিয়েছি, হাততালি দিয়েছি, পথিকদের ভয় দেখিয়ে বেড়িয়েছি। মনে করে দেখ—তুমি একবার পথ হারিয়েছিলে আমার সেই বনের অন্ধকার এক কোণে, তুমি এবং আরও কিছু ছোট্ট সাদাপোশাক পড়া মানুষ। আর আমি তোমাদের পথটাকে আরও পেঁচিয়ে তুলছিলাম।
গাছের গোড়া মুড়িয়ে দিয়ে, পাতার মধ্য দিয়ে উঁকি মেরে দেখেছি। সমস্ত রাত এইভাবে খেলেছি। কিন্তু আমি কেবল মজা করছিলাম, পুরোটাই ঠাট্টা ছিল, আমাকে গালি দিতে পার, যেমনটা হয়ত তারা দিয়েছে। কিন্তু এখন আমি শান্ত হয়ে এসেছি, কারণ আমার নতুন আবাসস্থলে আগের মত আর আনন্দ নেই। দিনরাত অদ্ভুত সব জিনিস চারপাশে মড়মড় শব্দ করে বেড়ায়। প্রথমে ভেবেছিলাম হয়ত কোনও বামনভূত সেখানে চলাফেরা করে; আমি ডাকলাম, তারপর কান পেতে রইলাম। কিছু একটা মচমচ শব্দ করছে, গোঙাচ্ছে…কিন্তু না, সেগুলো ঠিক আমাদের মত ছিল না। একবার সন্ধ্যার দিকে, আমি ফাঁকা একটা জায়গায় গেলাম, একি দেখলাম আমি? মানুষজন শুয়ে আছে চারপাশে, কেউ পিঠে ভর দিয়ে, কেউ পেটের উপরে। তো আমি ভাবলাম তাদেরকে জাগিয়ে তুলব, তাড়িয়ে দেব অন্যকোথাও! কাজে নেমে পড়লাম, ডালপালা নাড়তে থাকলাম, কাঁটা ছুড়ে মারলাম, খসখস আওয়াজ তুলতে থাকলাম, বন্য আওয়াজে ডাকতে থাকলাম…ঘন্টাখানেক এই কাজে ব্যয় করলাম কিন্তু কোনও লাভ হল না। তারপর আরেকটু ভালভাবে তাকিয়ে দেখলাম যখন, আতঙ্কে জমে গেলাম। একদিকে একজনের মাথা ঝুলে আছে পাতলা একটা রক্তমাখা দড়ি থেকে, অন্যদিকে আরেকজনের কোমড়ের কাছটায় পাকস্থলি ভরে আছে ক্রিমিকীটে… সহ্য করতে পারলাম না। একটা চিৎকার দিয়ে বাতাসে ঝাঁপিয়ে পড়লাম, পালিয়ে এলাম…’

‘নানা বনজঙ্গলে ঘুরে বেড়ালাম অনেকদিন, কিন্তু কোথাও শান্তি খুঁজে পেলাম না। হয় স্তব্ধতা, নৈঃশব্দ্য, নশ্বরতার একঘেয়েমি অথবা এমনই আতঙ্ক যে সেটার কথা চিন্তা না করাই ভাল। অবশেষে মনঃস্থির করলাম আমি, ঝোলাওয়ালা এক ভবঘুরেতে পরিণত হলাম, ঠিক যেন একটা ভাঁড়, আর চিরতরে বিদায় নিলাম: বিদায় রাশিয়া! তখন আমারই স্বজাতীয় এক প্রেত, এক জলপরী সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিল। বেচারা নিজেও পালিয়ে যাচ্ছিল। সে বিস্ময় কাটাতে পারছিল না, বারবার বলে যাচ্ছিল—একি সময়ে এসে পড়লাম, সত্যিকারের দুর্ভোগ! এমনকি যদিও, পুরনো দিনগুলিতে, সে অনেক মজা করেছে, মানুষকে মায়াজালে বশ করে গেছে (বেশ অতিথিপরায়ন ছিল সে!), আর প্রতিদানে কীভাবেই না সে টেনে নিয়েছে তাদেরকে স্বর্ণনদীর গভীরে, আশ্রয় দিয়েছে, কী এক সুরের দ্বারা বশীভূত করে রেখেছে! আর আজকে, সে বলছিল, কেবলমাত্র মৃতরাই জলে ভেসে আসে, সারিবেঁধে, দলে দলে, আর নদীর জল যেন জমাটবাঁধা রক্ত, উষ্ণ ও আঠালো, নিঃশ্বাস নেয়ার মতও আর কিছু বাকি নেই… আর এ কারণেই সে সঙ্গে নিল আমাকে।’
‘সে চলে গেল কোনও এক দূরের সাগরে, আর আমাকে তুলে দিয়ে গেল কুয়াশাচ্ছন্ন এক উপকূলে—যাও ভাই, খুঁজে নাও তোমার প্রিয় কোনও পাতাঘেরা বন। কিন্তু কিছুই খুঁজে পেলাম না আমি, এসে পৌঁছালাম এই বিদেশবিভুঁই-এ, আতঙ্কজনক এই পাথুরে শহরে। এভাবেই সম্পূর্ণ মানুষে পরিণত হলাম আমি, মাড়দেয়া কলার আর জুতো পরে, এমনকি মানুষের মত কথা বলাও শিখে গেলাম…’
থেমে গেল সে। ভেজা পাতার মত ঝিকঝিক করে উঠল চোখদুটো, বুকের উপর ভাঁজ করে রাখা হাত, আর নাচতে থাকা মৃতপ্রায় মোমের আলো, অদ্ভুতভাবে ডান থেকে বামদিকে আঁচড়ে তুলেছে কয়েকটা ধূসর ডোরাকাটা ছায়া।

‘আমি জানি তুমিও দুঃখ পাচ্ছ’ আবারও ঝলকে উঠল তার কণ্ঠস্বর, ‘কিন্তু আমার দুঃখের তুলনায়, আমার প্রচণ্ড প্রবল দুঃখের তুলনায়, তোমার দুঃখ কেবল ঘুমন্ত মানুষের নিঃশ্বাসের মত। ভেবে দেখ: একটা দলও আমাদের অবশিষ্ট নেই আর রাশিয়ায়। কয়েকজন ঘূর্ণাবর্তে উবে গেছে কুয়াশার মত, বাকিরা ছড়িয়ে পড়েছে পুরো বিশ্বজুড়ে। স্থানীয় নদীগুলি পরিণত হয়েছে নৈরাশ্যে, আর কোনও প্রাণচঞ্চল হাত নেই যে জলের উপর চাঁদের আলোকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে দেবে। নিস্তব্ধতাই অবশিষ্ট আছে কেবল অনাথ অপরাজিতা হিসেবে। ভাগ্যক্রমে, ধূসর-নীল গুসলি, যা কিনা এককালে আমার প্রতিপক্ষ ভূমি-দেবতা গান গাইতে ব্যবহার করত, আস্ত অবস্থায় রয়ে গেছে। সেই লোমশ, বন্ধুবৎসল, গৃহস্থ প্রেত, অশ্রুসজল চোখে ছেড়ে গেছে তোমাদের মলিন, বিব্রতকর বাড়িগুলোকে, শুকিয়ে গেছে বনরাজি, হতাশাজনকভাবে উজ্জ্বল, জাদুময়তায় অন্ধকারাচ্ছন্ন বনরাজি…
‘আমরাই ছিলাম—রাশিয়া—তোমার উদ্দীপনা, তোমার অগাধ সৌন্দর্য, যুগ যুগ ধরে তোমার আকর্ষণ! এখন আমরা আর কেউ নেই—নেই—উন্মাদ এক ভূমিদস্যুর কারণে নির্বাসিত।
‘বন্ধু, আমি মারা যাব খুব তাড়াতাড়িই, কিছু একটা বল, বল তুমি ভালবাস আমাকে, আমি উদ্বাস্তু এক প্রেত, কাছে এসে বস, হাতটা বাড়িয়ে দাও…’
মোমবাতিটা দপ করে নিভে গেল। ঠাণ্ডা আঙুলগুলো আমার হাতের তালু স্পর্শ করল। পরিচিত একটা হতাশার অনুভূতি উচ্চস্বরে হেসে উঠে স্থির হয়ে পড়ে রইল।
যখন আলোটা জ্বালিয়ে নিলাম, দেখি, আরামকেদারার উপরে কেউ নেই…কেউ না!… কেবল বার্চের আর ভেজা শৈবালের হালকা একটা বিস্ময়কর সুগন্ধ ছাড়া…