পঞ্চস্বর ৩ – অনন্য সাঈদ, আমিনুল ইসলাম সেলিম, শাহীন তাজ, সানোয়ার রাসেল, সুরঞ্জিত বাড়ই

অনন্য সাঈদ

টিউন অব কনসপিরেসি

রোদে ঝলসে যায় মুখ, ক্লান্ত পায়ের চিহ্নে ঝরে পড়ে শুকনো পাতার শিরা। বুনো নীলগাই আসে তেড়ে, কটকটে তাকিয়ে থাকে বিশাল শকুন

যেন আমি রোদের শত্রু, বিষণ্ণতার দোসর। অস্থিতিশীল পরিস্থিতির জন্য দায়ী-
পাখিদের টুটি চেপে কেড়ে নিয়েছি গান,
খোলস ভেঙে তাড়িয়ে দিয়েছি শামুকের ঘুম।

কতোকাল ধরে ফুটেনি রক্ত পলাশ, নয়নতারার চোখ
এইসব দুর্দিনে লিখিনি অনিয়মের চিঠি উৎকন্ঠার গান

সমুদ্রে ভিজিয়ে পা স্নান কোরে ফিরেছি বাড়ি
গৃহলক্ষ্মীর দিকে তাকিয়ে ভেবেছি কেবল রাত হউক রাত হউক

আঁধার নামলেই একটা ফিসফিস শব্দ ভাসতে থাকে ইথারে, এক্রোবেটস কোরে পালিয়ে যায় সংযম
আমি সংসারী মানুষ কাগজ টেনে লিখে ফেলি ‘টিউন অব কন্সপিরেসি’

এন এনজেলিক ডেভলপমেন্ট

হে মালাকুল মউত আপনি ফিরে যান

আরব উপদ্বীপের কোন শহরে খুঁজে নিন কাঙ্ক্ষিত কাউকে- আমি খুব ব্যস্ত আজকাল

বড়জোর বর্ষাযাপন নিয়ে শোনানো যেতে পারে দু’চার ছত্র কাব্য
নাশিদ গজল লিখি না কস্মিনকালেও।
আপনি হয়তো রবি শংকরের সেতারের কথা জানেন, একবার জর্জ হ্যারিসন এসেছিলেন এই ভাটির দেশে

যাইতুন কোথায় পাবো বাংলা মুলুকে
এই বর্ষায় কদমের ছায়া হতে পারে বেশ উপাদেয়-

হে মৃত্যুর দূত- অনাকাঙ্ক্ষিত অতিথি আমার
তার চেয়ে গুম হওয়া কোন লাশের আত্মা নিয়ে ফিরে যান
বিচারাধীন কোন আসামীর রুহ পকেটে পুরে গায়েব হয়ে যান মান্যবর।
এ মৃত্যু উপত্যকায় আরো কিছুদিন বাঁচার তৃষ্ণা হৃদয়ে
অন্তত আসছে শীতে উপস্থিত থাকতে চাই
প্রিয়জনহারা কোন জননীর সংবাদ সম্মেলনে

হে মালাকুল মউত, মৃত্যুর দূত
আপনি সাগ্রহে বিশ্রাম করুন উন্নয়নের বালাখানায়

আমিনুল ইসলাম সেলিম

ক্যামেরা

অপেক্ষার গোপন ক্যামেরা ছুঁয়ে দূর থেকে ভেসে আসে গার্হস্থ্য মেঘ
মেঘের ভেতরজুড়ে খেলা করে ঘোলাচাঁদ, মেঘে ওড়ে পরিযায়ী পাখি
নীলডানা প্রজাপতি রঙের দোয়াত ভেঙে বসে থাকে জীবনের নোখে
মুখোমুখি অন্ধকারে আকাশে ভাঙন লাগে, নিভে যায় জোছনাপ্রভাত
অগ্নিস্নাত মনের আবেগী দেহে ফুটে ওঠে যাবতীয় ব্যক্তিগত পুষ্পদহন
জীবন দাঁড়িয়ে থাকে, মেঘে মেঘে ভরে যায় স্মৃতিভ্রষ্ট ক্যামেরার চোখ।

সময়ের চিত্রনাট্য

সুকোমল চাঁদরাত ডুবে গেলে প্রলোভনে, প্রস্তাবিত ঝড়ে
সংগোপন সাপ হাঁটে মগজের খোলা করোটিতে
সাপের পাঁচটি পা’য় শোভা পায় বেতাল ঘুঙুর
জোছনার মৃত্যুমুখী দেহ চিরে হেসে ওঠে বেজন্মার ছুরি
অন্ধকারে দেখা যায় সব?
অন্ধকার বড়ো প্রতারক!
আমাদের ঐশ্বরিক চোখ নেই
অতিরিক্ত চোখ নিয়ে আমাদের হাহাকার নেই

আমাদের ঘুম পায়
ঘুমাতে ঘুমাতে ভাবি-
জানালার পাশে আজ শিউলি ফুটবে কি না
হাসনাহেনারা কোনো নতুন সুগন্ধ দেবে কি না
আমরা ঘুমিয়ে পড়ি স্বপ্নের নারিতাবাগানে
আমরা ধাতস্ত হই প্রাত্যাহিক নিয়মের ঘোরে

অথচ সকাল হলে রক্তে প্লাবিত চোখ, কী বিষণ্ন অসহায়!
ফুলের বাগান কারা ফুঁ দিয়ে উড়িয়ে নিয়ে গেছে
একরাশ অশ্লীলতা ছুঁড়ে দিয়ে বায়ু যেনো উদ্ধত সহিস

আমাদের অন্ধ করে দিয়ে
লন্ডভন্ড বিবস্ত্র স্বদেশ একা পড়ে থাকে প্রধান সড়কে…

শাহীন তাজ

ছায়ার এক ফুল

সুবেহ সাদিক হতে বাদ মাগরিব
চান ও তারা ঘুমাতে যায় ককসিটে
পানা এক ফুলে জন্ম নেয় রশ্মি
ঝিলিমিলি রোদে পৃথিবী হয় খোদাতে মশগুল

দীর্ঘদেহে পূব হতে পশ্চিমে- কাবামুখ
নতজানু সমস্ত মৌসুমি চারা;
ছায়ার এক ফুল, লম্বা হতে হতে খাটো হয়
শূন্যে গান করে রোদের খামার,
তারপরে জন্ম হতে মৃত্যুর দিকে যাত্রা
এই পথে-
কি ধীরস্থির সে আয়োজন; ছায়ারফুল।

ভ্যালেন্টিনা

ওকগাছে পড়ছে ছায়া- স্পষ্টতর অনুরাগ
বহুদূর বিস্তৃত বোম্বাটে যুবকের দীর্ঘদেহ
খাপছাড়া তলোয়ারের তীক্ষ্ণ মুখ যেন রাডারে
যেন আপত্তিকর দুটি পাখি সঙ্গমের পূর্বমুহূর্তে
সেখানে, পাখার ভাঁজে হদিস করছে উষ্ণতা।

ভ্যালেন্টিনা, নায়াগ্রার দেশের মানুষ
চলো গান গাইতে গাইতে মাড়াইয়ের দিনে
আমরাও সাজাই সংসার, উৎপাদনমুখী।

সানোয়ার রাসেল

সন্ধ্যা নামার আগে

এই যে শিশুর পদরেখা সাক্ষ্য দিচ্ছে স্তব্ধতার, আর
পাখির পালক হয়ে মাঠজুড়ে পড়ে আছে মেহগনিবীজ
মেঘশিরিষের পাতা মৌনশোক পোহাচ্ছে বিগত হাওয়া
বিষকাটালির ঝোঁপে আড়মোড়া ভাঙছে জোনাকি
গৃহগামী হাঁসেদের ঝাপটানো ডানার দিকে চেয়ে আমি ডাকি
মাবুদ
এমন
সন্ধ্যার সূচনায়
আরেকটিবার
আমাকে জন্ম দিও
মৌনতার প্রয়োজনে
এ জন্মের সমস্ত শব্দপুঁজি ব্যয় করে চলে যাবো
কথা দিলাম।

সন্ধ্যা

শিরিষের ডালে বসে শেষ শিষ নিচ্ছে বাজিয়ে
একটি দোয়েল
কালো চোখে আলোর তৃষ্ণা নিয়ে
শুষে নিচ্ছে রঙ
সবটুকু
দশহাতে সন্ধ্যা তার আঁধারের চাদরে জড়ায়ে
গেয়ে যাচ্ছে ঘুমপাড়ানি গান
ভুলে যাওয়া সন্ধ্যাবাতি
গৃহকোণে তেলজ্বলা দীপ
দিনান্তের ক্লান্তির কাছে সমর্পিত কুলবধু এক
পাটিপাতা দহলিজে গুণগুণ পুঁথির আওয়াজ
ন্যাড়ামাঠে হাওয়াদের হুহু কারুকাজ
ক্রমোজোমে এইসব স্মৃতি জমা রেখে
শেষ শিষ নিচ্ছে বাজিয়ে
শিরিষের ডালে বসে একটি দোয়েল

রঙ শুষে নিতে নিতে
কালো চোখে
অহেতু বিষাদে

সুরঞ্জিত বাড়ই

সংসার

বানের জলে ভেসে গেলে সংসার
দু’ টো খুটি নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে ঘর খানি
কাত হয়ে থাকে যেন শক্তিহীন প্যারালাইজড পা

ভাঙ্গা ইট-কাঠ-পাথর, সকালের নাস্তা, দুপুরে প্রোটিন, ছেলেটার প্রাইভেট টিউটর, বিয়ে বাড়ি অথবা শ্রাবণ রাত বড় পানসে যেন

তবু ভেসে যাওয়া সংসার কাঁদে নিদারুণ, কৃত্রিম হাসি ঠোঁট ঝুলিয়ে রাখে দিনের পুরোভাগ
রাস্তায় হেঁটে যায় প্রায় অচেনা মানুষ
এর মাঝে কেউ কেউ হতে পারে প্রেমিক

কাত হয়ে পরে থাকা সাধের ঘর খানি
রাত ঘনালে বাড়ে প্রাচীন কোলাহল
শব্দেরা ভাষা হয় বুকের ভেতর
হুহু রব, দোলে ওঠে অন্ধকার
ঘুমের মন্ত্র পড়ে জেগে থাকে রাত

এক পা দু’পা করে কাছে আসে কেউ
দ্বিধা জড়ানো মন জড়ায়ে নেয় তারে
ভেসে যাওয়া সংসার ভেসে যায় আরও আরও দূরে

দেয়াল

কিশোর বেলায় রক্ত-মাংসে গড়া এক দেয়াল ছিলো আমাদের

হাতে হাত রাইখা ভালোবাসার রঙ মাখছি
ঠা ঠা রোদে শান্ত হইছি যৌথ ছায়ায়
বাহারি ফুলে ফলে ভইরা তুলছি আঙিনা
কালো মেঘ প্রাণ পণে গিলে ফেলেছি বহুবার ভয়ার্ত সন্ধ্যা আলিঙ্গনে আলিঙ্গনে হয়েছে সাহসী

এভাবেই পুরোনো পৃথিবীতে আমরা চুম্বনে চুম্বনে এঁকেছি নব যৌবন

এমনি পাতা ঝরা দিনে
জেগে ওঠে দেয়ালের ক্ষত
যেখানে সিঁথির সিঁদুর
চাপ চাপ রক্ত আঁকে ব্যর্থ সঙ্গম
বৃক্ষেরা ভুলে যায় শুকনো পাতার ভাষা

আমাদের যৌথ দেয়াল, রক্তে লেখা নাম
নোনা ধরে যায় সময় রেখায়

সম্পাদক

সম্পাদক

শাহীন তাজ 
কবি, লেখক ও প্রাবন্ধিক
প্রকাশিত বই-
কবিতাগ্রন্থ- সেলাইকল (২০১৮)
গল্পগ্রন্থ- আমার প্রথমা (২০১৩)
ইমেইল- mrshaheentaj@gmail.com
মোবাইল- 01878353588

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

%d bloggers like this: