জল হিজল অনল – ৮ম পর্ব

৭ম পর্ব প্রকাশের পর হতে…

এই রকম এই ভাবে সুখ দুঃখ নিয়ে আমরা যেন ভালই আছি। আমাদের কারো কোন অভিযোগ নেই। মাকে আমি হাসতে দেখেছি , কাঁদতে দেখেছি ভয় পেতে দেখেছি, কিন্তু কোন দিন অতৃপ্ত আকাঙ্ক্ষায় হতাশ হতে দেখিনি। প্রকৃতির প্রত্যক্ষ লীলা খেলার উপর আমাদের বসবাস। হাওরের মাছ, হাওরের ধান আমাদের প্রাণ। তাই আমাদের পূজা পার্বন ও হাওর কেন্দ্রিক। এ গাঁয়ের একটি নববধুর জীবনে যেমন প্রতিটি আগমনী বার্তায় পূজা উৎসব হয় তেমনি হাওরের ধান রোপন থেকে শুরু করে ধান কাটা পর্যন্ত ধাপে ধাপে পূজা পার্বন। ঘরে যেভাবে গর্ভবতী বধুর যত্ন হয় তেমনি হাওরে শস্যবতীর যত্ন। মাঠের ফসল ফলানোর প্রক্রিয়াকে সহজ স্বাভাবিক রাখতে কৃষক যেমন রাতদিন হাওরে পড়ে থাকে, ঘরে তেমনি কৃষানীর পূজা পার্বণের অন্ত নেই, সে লক্ষ্মীর ভোগ দেয় ক্ষীরবাস করে , ক্ষেতে ধানের থোর গজানোর শুরু থেকে না কাটা পর্যন্ত সে গায়ে সাবান মাখে না, চুলে তেল দেয় না, ভিজা কাপড় রোদে শুকায় না । এই সময় কোন বউ বাপের বাড়ি যায় না । আকাশে মেঘ দেখলে সে শুধু বৃষ্টি কামনা করে সাথে যেন আর কিছূ না পড়ে এই জন্য মানত করে । আমাদের সুমেশ্বরী দেবী, পরমেশ্বরী দেবীর মন্দির হাওরে গিয়ে কীর্তন করা হবে । ধান দূর্বা হাতে ব্রত কথা বলবে। যেন এক অসহায় মা তার সন্তান কে অরক্ষিত ভাবে হাওরে ফেলে রেখেছে। নিষ্ঠুর প্রকৃতি যেন ছিড়েখুড়ে না খায় এই অবুঝ সন্তানকে, তাই মা সন্তান হারানোর আতঙ্কে কত শত দেব দেবীর সাহায্য কামনা করে এই কয়মাস তার ইয়ত্বা নেই। চৈত্রমাসের শেষে মেঘের গর্জনে আমাদের হৃদকম্প হয় এই বুঝি সবশেষ হয়ে গেল। নদীতে হঠাৎ ঘোলাজল বেড়ে গেলে আমাদের শরীরের ঘাম বেড়ে যায়। এই বুঝি নদীর জল উপচে ঘোলাজল আমাদের সোনার ফসল ডুবিয়ে দিল । আমাদের এত কষ্টের এত আদরের এত প্রার্থনার সোনামুখ চোখের সামনে ঘোলা জলে নিমিষে তলিয়ে গেল। অথবা আকাশে মেঘের চিৎকারে হঠাৎ ঘরের চালে শিলার শব্দ, উঠান চকচক করে উঠে বরফ খন্ডে। আমাদের বুকের রক্ত হিম হয়ে যায়। আমরা নিথর বসে দেবীকে ডাকি, তাঁড়িয়ে দে মা তোর দৈব শক্তি দিয়ে এইসব লুঠেরাদের। কেন ওরা এভাবে আমাদের সোনার সন্তানের বুকে নিষ্ঠুর ছুরি চালায় ?

এইভাবে প্রকৃতির দয়া দাক্ষিণ্যের উপর আমাদের বেচেঁ থাকা। আমরা প্রতিবছর ফসল করি, দেবদেবীর পুজা করি, তবে প্রতি বছর আমাদের ফসল আমাদের ঘরে উঠে না। কোন বছর শিলা জলে নেয়, কোন বছর খড়ায়, আর যে বছর তিনিরা আসেন না, সে বছর আমরা। এখানে ফসল তোলায় ভাগাভাগি হলেও দেবীর পূজায় কোন খড়া শিলা নেই। তিনি নিয়মিত ভক্তের ভোগ পান। সে দিকে আমাদের আস্থা অবিচল। আমাদের ফসল কাটার সময়, দূরদেশ থেকে ফসল কাটার লোক আসে, এদেরকে বলে ভাগআলু। এমনিতে এরা ভাগে ধান কাটে গৃহস্তের ক্ষেতে, তবে যে বছর বানের পানি আসে হঠাৎ করে, তখন ভাগাভাগির হিসাব উল্টো। পানিতে তলিয়ে যাবার আগে যে যা পার কেটে নাও। গৃহস্ত দেখে তখন তার ধান কেটে নিয়ে যাচ্ছে অন্য জনে, সে প্রতিবাদ করে না। এর নাম হচ্ছে নয়ন ভাগ। কোন কোন বছর আমাদের কে নয়ন ভাগে সন্তুষ্ট থাকতে হয়। প্রকৃতি কতরকম পরীক্ষা যে করে আমাদের উপরে তার কোন বিরাম নেই। জম্মের পর থেকে মৃত্যু পর্যন্ত আমাদের নিয়মিত বেঁচে থাকার সংগ্রাম করতে হয় অসুখ-বিসূখ, শিলা-বৃষ্টি, ঘোলাজল অথবা খড়ার সাথে।

সকাল থেকে এমন ঘনকালো মেঘ করে বৃষ্টি নামল যে থামার নাম নেই। মনে হচেছ সন্ধ্যা হয়ে গেছে , কিন্তু সন্ধ্যাতো এত দীর্ঘ হয় না। আজকের সন্ধ্যা মেঘের সাথে হাত মিলিয়ে বিকেলকে চুরি করে ফেলেছে। তাই সন্ধ্যা আজ অনেক লম্বা। সেই সাথে আমার অপেক্ষা যোগ হয়েছে। মামা বলেছে সন্ধ্যার পরে দেখা করতে কিন্তু সন্ধ্যা যে আজ পার হচ্ছে না। মামা তাঁর ঘরে নেই কখন ফিরবে তাও অনুমান করতে পারছি না। বাতাসের জোর বাড়ছে, হাওরের ঢেউ বেশ শব্দ করে আছড়ে পড়ছে আটির কাছার উপর। মামা আটির বাইরে গেলে বিশেষ করে পশ্চিম দিকের কোন আটিতে গেলে ত বৃষ্টি না কমা পর্যন্ত ফিরতে পারবে না। এই ঢেউয়ের মধ্যে উল্টো বাতস ঠেলে নৌকা আসতে পারবে না। তাহলে বৃষ্টি না কমা পর্যন্ত মামাকে সেখানেই অবস্থান করতে হবে। তা মামা আসতে থাকুক যখন খুশি কিন্তু সন্ধ্যা হচ্ছে না কেন ? সন্ধ্যা পার হলে আমি চারটা খেয়ে একটা বালিস নিয়ে মামার এখানে থাকব বলে ঘর থেকে বিদায় হতে পারি। তার পর হাওরের দিকে তাকিয়ে থেকে মামার অপেক্ষায় রাত পোহাতে পারি।
আবু উঠ, জুঙ্গুরডা মাথায় লইয়া আমার লগে ল, সিন্দুইরা গাছের পাকনা আম বেকটি ফইরা গেছে । ওখনই না আনলে হেসে পিছপাড়ার পোলাপানে নিবগা টুকাইয়া।

পিসির যেমনি বলা তেমনি আমাকে বসা থেকে ঠেলে উঠানে ফেলে দেয়া, আমি ওকে চিনি বলেই ওর সংলাপের শুরু মাত্র এক পা বাড়িয়ে রেখে ছিলাম তাই শেষ রক্ষা, নইলে ওর আচমকা ঠেলার চোটে গড়িয়ে বারান্দা থেকে উঠানে তুমুল বরিষায় ভাসতাম। আর ওই দুষ্টু তখন তার গগন ফাটা হাসিতে বৃষ্টির শব্দকেও কিছুক্ষণের জন্য থামিয়ে দিত। আমি বৃষ্টির মধ্যে লাফাতে লাফাতে গোয়াল ঘরের চাল থেকে জুঙ্গুরটা টেনে মাথায় নিয়ে তার আম কুড়োবার সঙ্গি হলাম। সত্যি, সব আম পড়ে গেছে। গাছের নিচে লিচুর মত লাল টক টকে সব বড় বড় আম বৃষ্টিতে ভেসে যাচ্ছে অথচ একটুও লাল রঙ জলের সাথে ভেসে যাচ্ছে না। বৃষ্টিতে ধুয়ে আরও লাল হয়ে উঠেছে। পিসি নববধূ সাজে শ্বশুর বাড়ি যাবার সময় ওর কপাল- সিঁথির সিদুঁর সবাইকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে কাঁদতে সারা মুখে মাখিয়ে ফেলেছিল। আম গুলোকে আমার সেই রকম বাপের বাড়ি ছেড়ে যাওয়া আনন্দ বিষাদের কনে মুখের মত লাগছে। পিসির চোখের জলে কিছুটা সিঁদুর হয়ত ভেসে গিয়েছিল কিন্তু সিন্দুইরা আমের একটু সিঁদুর ও ভেসে যায়নি। পিসির কপালের ভেসে যাওয়া সিঁদুর নিয়েই বোধ হয় এই গাছের আমগুলো এমন সিঁদুর রাঙা হয়েছে। পিসি কি সেটা বুঝতে পারে? ওর কপালের সিঁদুর চুরি করেই আম গুলো এমন সিঁদুর রাঙা হয়েছে। তাহলে কি আম কুড়াতে আসত ? না আম গুলোকে ঈর্ষা করত ? পিসি আম কুড়িয়ে তার আচঁল ভরে ফেলেছে তবু আম শেষ হচ্ছে না ।

আমি দাড়িঁয়ে দেখছি অনেক সিঁদুরের মধ্যিখানে বির্বণ এক শুভ্রমলিন সাদা নারী সিঁদুর কুড়িয়ে সাদা কাপড়ের আচঁলে ভরছে অথচ নিষ্ঠুর সাদা শাড়িটা একটুও সিঁদুরে রঙ ধারণ করছেন না। সাদা শাড়িটা অমাবশ্যার অন্ধকারের মত সিঁদুরকে গিলে খাচ্ছে।

পিসির চোখের জল তার সিঁদুরের রঙকে কিছুটা হলেও ভাসাতে পেরেছিল কিন্তু এই তুমুল বৃষ্টি পারছে না আমের গা থেকে কিছুটা সিঁদুর এনে এই সাদা শাড়িটাকে একটু সিঁদুর রাঙা করে দিতে।

আবু তুই ব, আমি কাপড় ডা বদলাইয়া আই, তরে কয়ডা আম কাইটা দেই। পিসি নিমিষে শুকনো কাপড় পড়ে, দাও নিয়ে আম কাটতে বসে পড়ল বাড়ান্দায়। আমি তখনও চেষ্টা করছি সিঁন্দুইরা আম থেকে একটু সিঁদুর বের করার জন্য। যদি কেটেও একটু সিঁদুর বের করা যায় ! সেই সিঁদুরে রঙিন হয়ে উঠবে পিসির গাঁয়ের বেমানান সাদা শাড়িটা। আমার মনে হবে পিসি এইমাত্র তার স্বামীর বাড়ি থেকে এসেছে, হাতে সোনার চুরি, গলায় তাঁর মায়ের রেখে যাওয়া সেই মোটা সীতাহার, কানে বটপাতার মত পুরনো কান পাশা, আর কপালে সিঁথিতে ডুবন্ত সূর্যের মত লাল টক টকে উজ্জ্বল সিঁদুর।

রাত অনেক হয়েছে , আমার মুত্র ত্যাগের সময় হয়ে পড়েছে অথচ মামাও আসছে না ঝড় বৃষ্টিও কমছে না। আর অপেক্ষা সহ্য হচ্ছে না, তার উপর এত ঢেউ বৃথাই হাওরের পরে আছড়ে পড়ছে এর ত একজন ব্যবহার কারী থাকা দরকার। বিছানা থেকে নেমে জানালাটা বন্ধ করলাম , দরজাটা চাপিয়ে বাড়ান্দায় দাঁড়ালাম। পুবালী বাতাস বইছে, তাই এই পশ্চিম মুখী ঘরের বারান্দায় ঝর বৃষ্টি একদম লাগছে না। সারা পাড়ার নৌকা এই পশ্চিমঘাটে বেধে রাখা হয়েছে, ঢেউয়ের হাত থেকে বাঁচাবার জন্য। বৈঠা একটা নিয়ে মাঝারি সাইজের একটা নৌকায় ভেসে পড়লাম হাওরে। ওরে বাপরে ! যেইনা বাতাসের টান, তেমনি বৃষ্টির দাপট। গায়ে মনে হচ্ছে ষড় বর্ষন হচ্ছে , এক একটা বৃষ্টির ফোটা অর্জুনের তীরের মত এসে গায়ে বিধঁছে। আমার হাওর বিলাস মিটে গেছে দুই মিনিটেই , কিন্তু সমস্যা হচ্ছে নৌকা ঘুরিয়ে পুব মুখি করার সুযোগ ই পাচ্ছিনা । এ পাল ছাড়া নৌকা ,ডাবল পালের গতিতে পশ্চিম মুখি ছুটছে। আর এক একটা ঢেউ পিছন থেকে এসে আমাকে এক ঠেলায় বিশ হাত করে এগিয়ে দিচ্ছে, আমি হাল ঠিক রাখতে পারছি না। নৌকাটা কাত করে ফেলার জন্য আমি ছাড়া সবাই চেষ্টা করছে। নৌকা এভাবে সোজা ধরে রাখলে ত সকাল নাগাত মোহনগঞ্জ চলে যাব যদি বৃষ্টির ঘায়ে মারা না পড়ি। কী করি ! কী করি , বায়ে নদীর মাঝ বরাবর আধডোবা শীতলা গাছ টা আছে ,কিছু দূর আবছা দেখা যাচ্ছে। নৌকাটা কোনমতে গাছটার ভিতর ঢুকিয়ে আপাত আত্মরক্ষার একটা চেষ্টা করা যেতেপারে, এ ছাড়া আর কিছু ভাবা যাচ্ছে না। তবে পেরে উঠব কি না সেটাই দেখার বিষয়। পুর্বদিকে ঘার ঘুরানো যায় না, এই বৃষ্টি চোখে পড়লে চোখ গলে যাবে। আমি ডান দিকে বৈঠা ঠেলে বামে নৌকার মুখ চাপিয়ে রাখলাম। নিজেকে কচ্ছপের মত বাঁকা করে শুধু শীতলা গাছ আর দুচোখ এক করে রাখলাম। নৌকাটা ভস করে গাছের ভিতর ঢুকে পড়ল। বিশাল হিজল গাছটা বর্ষায় যত জলই হোক, সে তার মাথাটা জলের উপর ভাসিয়ে ভেসে থাকে। মনে হবে বিশাল এক ঝাকরা চুলের দৈত্য হাওরের জলে লুকিয়ে থেকে সবাইকে দেখছে। আজ আমি এই দৈত্যের চুলের মধ্যে লুকালাম। বৃষ্টির কঠিন মার থেকে বাঁচা গেল , এখন আর আগের মত গায়ে বিধঁছে না। আমি একটা ডালে বসলাম , নৌকা টাকে মনে হচ্ছে ভাসিয়ে রাখা যাবে না। আধ নৌকা পানি আগেই জমেছে এখনত আরও জমবে , আসার সময় নৌকায় ফেউট ছিল কিনা খেয়াল করি নি। এখন সেটা খোঁজাও নিরর্থক, নৌকা এখান থেকে হারাবে না। বরং আমিই হারিয়ে যাই কিনা সেটাই ভাবার বিষয়। গাছটা মূলত হিজল গাছ , কিন্তু লোকে জানে এটা শীতলা দেবীর গাছ , সারা হাওরের দেও দানব সবাই এখানে আশ্রয় নেন। আমি তাঁদের কারও বিশ্রামে বিঘ্ন ঘটালাম কি না সেটা এখনও বুঝতে পারছি না। তবে বিঘ্ন ত ঘটেছেই , আস্ত একটা নৌকা বায়ু গতিতে ঢুকিয়ে দিয়েছি কোনরকম অনুমতি ছাড়াই , সামান্য মানুষের এত বড় বেয়াদবি তিনিরা বরদাস্ত করবেন কিনা সেটা অনুমানের কোন বিষয় নয়।
বাঃ বাতাসে কী চমৎকার দুলছি, পা একবার জলে ডুবছে আবার ভাসছে, বাতাস বৃষ্টি প্রায় গায়ে লাগছেই না। আমি এক ডালে বসে আরেক ডালে দ্ইু হাত ধরে বেশ আরাম বোধ করছি। না, আমার কোন ভয় লাগছে না বরং বেশ ভাল আছি একটা সুখ অনুভূত হচ্ছে। তাহলে কি তিনিরা বিরক্ত বোধ করেন নাই ? না করলেই ভাল , আমিত আর প্রতিদিন আসব না। আজকে যে শিক্ষা হয়েছে এমন গুর্য়াতুমি আর করব না। তবে মনসা মায়ের চেলারা যদি কুট্টুস করে একটা বসিয়ে দেয় তাহলে ত সব শেষ। আমার নৌকা ডোবার আগে আমিই ডুবে যাবো।
হে বরুন দেব, তোমার বৃষ্টি আজকের মত ক্ষান্ত করো।
হে বায়ু দেব, তেমার বায়ু বেগ হ্রাস করো।

হে মা মনসা, তোমার চেলাদের বাসর ঘরের বেহুলার মত গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন করে রাখো।
হে মা সুমেশ্বরী, যে কোন গাঁয়ের একটা নৌকা এই শীতলা গাছের নিকট পাঠিয়ে দাও। আমি গৃহে প্রত্যার্বতন করি।

উমেদ বংশী দাসের নাতি ভবানন্দ বংশী দাসের ডাকে হউক আর দেবতাদের মর্জিতেই হউক ঝর বৃষ্টি থেমেছে অনেকক্ষণ। একটা নৌকার এগিয়ে আসার শব্দও পাচ্ছি, কিন্তু নৌকা আসছে না। নৌকা বাওয়ার শব্দটা হাওরে হচ্ছে না আমার মনের মধ্যে হচ্ছে সেটাও এখন বুঝতে ঝামেলা হচ্ছে। এদিকে সময় ত কম গড়াল না আর ঘন্টা দুয়েক অপেক্ষা করলে রাত পোহায়ে যাবে। তবে এখন খুব কষ্ট হচ্ছে, কোন দেব দানবের দেখা ত পেলামই না , নৌকাটাও ডুবে গেল , এদিকে সাপের ভয়ে নড়াচড়া করতেও ভয় লাগছে। একটা ভূত টুত পেলেও না হয় গল্প করে সময় টা কাটানো যেতো। তার পর দুই বন্ধু মিলে নৌকাটা সেঁচে আটিতে চলে আসতাম। রাতের একজন বন্ধু পাওয়ার ক্ষমতাটাও অর্জিত হতো। কিছুই্ হল না। তবে এতক্ষণ যে নৌকা মনের মধ্যে ভাসছিল এখন সেটা দেখতে পাচ্ছি। আসুক আরো এগিয়ে আসুক, একেবারে কাছে না এলে ডাক দেব না, পাছে না আবার মিলিয়ে যায়।

নৌকাটা এখন আমার থেকে বিশ গজের বেশি দূরে হবে না। এর থেকে বেশি এই গাছের কাছ দিয়ে কোন নৌকা দিনের বেলাই আসবে না, আর এখন ত শেষ রাত। এটা জেলে নৌকা নয় কেড়াই নাও, এই নাওয়ে ত নাইওরীরা যাতায়াত করে। এই শেষ রাতে আবার নাইওরীর নাও কোথায় যায় ? যে নৌকাই হউক আমি বিপদে পড়েছি আমাকে উদ্ধার করবে । আর আমিত সারা পথ যাব না,সামনের গাঁয়ে নেমে যাব। নৌকাটাত এই দশ গাঁয়েরই কারো হবে। আমি ডাক দিলাম
“এই নাওয়ে কেডা , আমারে লইয়া যাও আমার নাওডা ডুইব্বা গেছে । আমি এইখানও হারা রাইত ধইরা আডক। ”
নৌকা থেকে কোন প্রতিউত্তর এলোনা , বরং মনে হলো নৌকাটি বড় বেশি নিঃশব্দ হয়ে পড়েছে হঠাৎ। নৌকা মুখ ঘুরাবার চেষ্টা করছে, খুব সাবধানে। আমি আরও উপরে উঠে গলা বাড়ালাম যেন আমাকে দেখতে পায়।

এই নাও বাট্যায়ও না, আমি উমেদ বংশীর নাতি ভবানন্দ। এই আমারে দেখ, আমি ভূত না।”
“হরে কৃষ্ণ, হরে কৃষ্ণ, কৃষ্ণ কৃষ্ণ, হরে হরে, হরে রাম, হরে রাম, রাম রাম, হরে হরে!

আমার আর বুঝতে বাকী রইলনা যে, এ নৌকা আমাকে নিবে না । নাম সংকীর্তনের ভলিউম বাড়িয়ে তারা একটানা জপ করতে লাগল, নৌকা স্থীর । কন্ঠ শুনে মনে হচ্ছে দুইয়ের অধিক লোক নৌকায়। তাঁরা উচ্চ কন্ঠে নাম সংকীর্তন ছাড়া কিছুই করছে না। তাঁরা কাঁপা কাঁপা উচ্চ কন্ঠে নাম জপে যাচ্ছে, আমি আস্তে করে গাছ থেকে নেমে নিঃশব্দে ডুব সাতারে এগুতে লাগলাম নৌকার দিকে । নৌকার কাছে এসে নৌকার গলূই ধরে পানিতে ঝুলে রইলাম। সংকীর্তন চলছে। মাঝি বেটা খুব সাবধানে জপের সঙ্গেও তাল মিলাচেছ আবার নিঃশব্দে বৈঠা ঠেলে নৌকার মুখ ঘুরাচ্ছে। দাঁড়ি দুই জন দাঁড় শক্ত করে উপর দিকে তুলে রেখেছে। এখন বুঝতে পারছি ভিতর থেকেও একটা কন্ঠ আসছে তবে সেটা তেমন স্পস্ট নয়। নৌকা দশ মিনিটের মত এক গতিতে পিছালো এদিকে আমার হাত প্রায় ছিড়ে যাচ্ছে। পাছে জলের শব্দ হয় এই ভয়ে পা নাড়াচ্ছি না।

“বড়দা দাঁড়ডা মারইন মনে হয় আমরারে ছাড়চইন। দীপক বাবু হাইরকলডা লইয়া বাড়ইন। আপনারে গাঁওর পুবমুখে নামাইয়া দেই, পশ্চিমবাডি যাইয়া আর কাম নাই। তানেরা রুষ্ট হইলে বড় বিপদ। ভগবান নিজগুনে কৃপা কইরা আমরারে বাচাইচন। হরে কৃষ্ণ , হরে কৃষ্ণ, অ অ অ অ

আর এদিকে বানর ঝুলা আমি ভেবে পাচ্ছি না কি করব ? এভাবে ঝুলে থাকতে আর পারছি না। দীপক মামা নৌকায় তারপরও এই অবস্থা ! আমি কোন কিছু না বলে ঝপ করে পানি থেকে নৌকার উপরে উঠে পড়লাম। আমি যেমনি ঝপ করে নৌকার আগায় উঠলাম তেমনি ঝপাঝপ তিন তিনটি মানুষ নৌকার পিছন থেকে উড়ে পানিতে পড়ে গেল। আর মামা হাড়িকেনটা কোলে নিয়ে বিড়ালের বাচ্চার মত মিউ মিউ করে কি জানি বলার চেষ্টা করছে সে ভাষায় বুঝানো হয়ত সম্ভব না। আমি চইয়ার উপর দিয়ে মামার কাছে এসে হারিকেনটা এক হাতে নিয়ে আরেক হাতে মামার হাত ধরে বললাম-

“মামা তুমি না ভুতটুত বিশ্বাস কর না! আমরারে হারা জীবন কইয়া আইছ , আইজ এইডা কী দেখাইলা। এই তোমার অবিশ্বাসের নমুনা। এই দেখ আমি ভবানন্দ, তুমি এই মানুষগুলোরে ডাক, নাইলে এইডি ডরে পানি খাইয়া মরব। হেসে পুলিশ খালি আমারে না তুমারে ও বানব। ”
হেঃ এঃ এ্যঃ !
কী এ্যঃ এ্যঃ করতাছ ? উড।
আমি মামাকে জড়িয়ে ধরে দাঁড় করিয়ে দিলাম , হাল ছাড়া নৌকা এক জায়গায় পাক খেয়ে ঘুরতেছে। বৈঠা-
দাঁড়, মাঝি- দাঁড়ি, সমানতালে পানিতে ভাসতেছে।
তা, তুই এত রাত্রে এই শীতলা গাছে উঠলে কিভাবে ? এইটা কিভাবে সম্ভব !
আমার গাছে উডাডা অসম্ভব আর ভূত হওয়ডা খুব সম্ভব না ?
না তাও অসম্ভব, তবে তাহলে তুই আমাদের আনন্দ, তাহলে ত আর ভয়ের কিছু নাই।
হ ভয়ের কিচ্ছু নাই , আমি তোমার আনন্দ, আমি কেমনে গাছে উঠছি হেইডা তোমারে কইতাছি। তুমি আগে এরারে ডাক, এরারে পানিত থাইক্যা তোল।
এই জগদীশ বাবু আসেন নৌকায় উঠেন , ভয়ের কিছু নাই এ আমাদের আনন্দ। আরে চিনছেন না,
জলটোপরের উমেদ বংশী দাসের নাতি । এদের বংশে ডর ভয় একটু কম, এত সবাই জানে। আসেন আসেন।
দীপক বাবু, তানেরে নৌকার ফেউটটা হাতে লইয়া খারইতে কইন , আমি ওখনও ভরসা ফাইতাছি না।
এইযে, আমার এক হাতে লোহার ফেউট, আরেক হাতে হাইরকলের আগুন, ওখন বিশ্বাস হইছে আমি ভূত না?
এরপরে আর অবিশ্বাস করি কেমনে! কিন্তুক ভয় যে যায় না ।
ভূতের ভয়ে নাউও না উঠলে, পানির মধ্যে হাতরাইয়া কতক্ষণ বাঁচবাইন? উডুইন রাইতও পোহায়াইয়া গেছে।

আমি আর দীপক মামা দুজনে মিলে পানিতে ভাসমান তিনজনকে টেনে নৌকায় তোললাম। তাদের শরীরের কাঁপুনি এবং নিষ্পলক চোখ এখনও বলছে ভূত যায় নাই তাদের সামনেই আছে ।

নৌকা ঘাটে ভিরার পর রাতের অন্ধকার আর ততটা নেই, অনেকটাই ফর্সা আকাশ। জুর বাতাস বইতেছে, বাতাস বেশ ঠান্ডা মাঘ মাসের বড়ই কুড়োবার সময়ের মত লাগছে। আমি নৌকা থেকে ঘাটে নেমে মামাকে বললাম মামা তুমি তাঁদের নিয়ে ঘরে যাও, আমি নৌকা বেঁধে তারপর আসতেছি।। তারা চলে গেলেন ,কিন্তু বড়ই নির্জীব। যেন মনে হচ্ছে তারা ভূতের বাড়ি যাচ্ছে। এদিকে আমার গর্বে বুক ফুলে ফুলে উঠছে, আজকে সারাদিন এই গল্পই চলবে পাঁচ গ্রামের লোকের মুখে মুখে, আর তা নিশ্চই রুপুরানীর কানেও যাবে, আমি যে কত বড় বীর বাহাদুর হতে চলেছি হা হা হা ।

(চলবে)

ব্রাত্য রয়

ব্রাত্য রয়

জন্ম ২৫ মে ১৯৭৩, মোহনগঞ্জ, নেত্রকোনা।পেশায় কলেজে অধ্যাপনা (প্রভাষক, রয়েল মিডিয়া কলেজ, ময়মনসিংহ।)

আগ্রহ কবিতা, গল্প, প্রবন্ধ ও উপন্যাসে। 

প্রকাশিত গ্রন্থ-
উপন্যাস- নাম পুরুষ ( ২০১৮)

প্রবন্ধ- গুরু পুঁছিও জানো (২০১৯), খেরোয়াল (২০১৯), আপন আরশিতে অচেনা আনন (২০১৮), তৈল সংহার (২০১৮), ইতি পাতি রাজ হাস (২০১৭), আপ্তবাক্য (২০১৭), বাঙাল ধর্মত্ত্ব (২০১৬)

ই-মেইল : bratyoroy@gmail.com 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

%d bloggers like this: