জল হিজল অনল – ৭ম পর্ব

ষষ্ঠ পর্ব প্রকাশের পর হতে…

সিদ্ধান্ত নিয়েই ফেলেছি , রুপুকে প্রেম পত্র দেব, তবে তা অবশ্যই ইংরেজিতে অর্থাৎ লাভ লেটার। রুপু পাঠশালা পাশ করেছে, অথচ তার হাতের লেখা তার হাতের আঙ্গুলের মত চম্পাকলির মত সুন্দর হয়েছে, পাড়ার নতুন বউদের বাপের বাড়ির চিঠি লিখে লিখে। সে প্রতিদিন বিকেলে মেয়ে মহলে শ্রী মদ ভাগবত পাঠ করে নির্ভুল উচ্চারণে। পাড়ার বউ বুড়িদের কাছে সে মহা বিদুষী। কয়েক মূর্খ ভাউর খ্যাদাইন্যা প্রৌঢ়া আমার সঙ্গে বিদ্যার দৌড়ে রুপুকেই এগিয়ে দেয়। তাছাড়া রুপে সে অনিন্দ্য , আচার আচরণেও বেশ ভারিক্কি। শ্রীমদ ভাগবত পাঠ করে সে যেন মনে মনে পান্ডব পত্নী দ্রৌপদী হয়ে বসে আছে।
আমি মোহনগঞ্জ পাইলট স্কুলের ছাত্র। হতে পারি শেষ বেঞ্চের তাইবা কম কিসে ! এ গাঁয়ের কটা ছেলে আছে যে রামধন মাস্টরের পাঠশালা থেকে বের হয়ে গোধন শালার বাইরে যেতে পারে ? এ পারলে একমাত্র উমেদ বংশির নাতিই পেরেছে। যদিও স্যারেদের মারের চোটে বছরে আট দশবার আত্মবিয়োগের চিন্তা করতাম, কিন্তু রেল গাড়ির ইঞ্জিনটা যখন বিকট শব্দে স্টেশনের দিকে আসত তখন এই দৈত্য কে দেখে হাত-পা হিম হয়ে যেত, নিচে ঝাপ দিলে যে খিচুড়ি বানিয়ে ফেলবে। বাড়িতে লাশ নিয়ে গেলে রুপু আমাকে চিনতেই পারবে না। এই সব মহৎ চিন্তায় শেষতক মরণটা আর হয়ে উঠল না। যাক এ সবতো আর গাঁয়ের কেউ জানে না। বরং সবাই জানে আমি উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ। অথচ রুপুর ভাবখানা যাচ্ছে তাই। এইযে আমি এতদিন পরে এলাম তার কোন কৌতূহল নেই । ভাগ্যিস যুদ্ধ চলছে নইলে কি এতদিন থাকা যেত।

অতএব আমার অসম্ভব দামী বিদ্যার মান রাখতে আমাকে চিঠি ইংরেজিতে লিখতে হবে। অভিধান থেকে কঠিন ইংরেজি শব্দ বের করে চিঠি সাজাব, জানি বাক্য গঠন সঠিক হবে না। তাতে কি এখানেত আর রফিক স্যার নাই, যে সব ভুল ধরে ফেলবে। এ চিঠির ভাষা বুঝতে হলে তোমাকে চিঠি নিয়ে আমার কাছেই আসতে হবে। আর আমি তখন যে এতবড় পন্ডিত হয়ে তোমাকে ইংরেজি চিঠির অর্থ বোঝাব! তাতে তুমি সারা জীবন আমার জ্ঞানের গভীরতা মাপার স্কেলই খুজেঁ পাবে না।

বাড়িতে আমার বিদ্যার্চচা মূলত স্কুল পাঠাগার থেকে আনা গুটিকতক গল্প বইয়েই চলে। সামনে একটা বই মেলে রাখলেই আমার বিদ্যানুশীলনের প্রমাণ যথেষ্ট। আমার মূর্খ বংশে পূথিঁর প্রভাব ভয়ানক। আমি পূথিঁ পড়লে দাদুও তার গড়গড়ার নল ধীরে টানেন। ভাবখানা এমন যে তিনি খুব বিদ্যুৎসাহী মানুষ, কিন্তু মা সরস্বতী তাকে ঠিক চিনে ছিলেন , তাই যে হাতে মুগুর মেরেছেন সে হাতে আর কলম ধরতে দেননি। আমার লেখা পড়ার দিকে তার এই মহা খেয়াল মূলত এই জন্যই। রায় বাবুর শিক্ষিত নাতিদের কাধেঁ করে পাড়া বেড়ানোর দায়িত্ব পেয়েছিলেন তিনি, কিন্তু তাদের কে আদর করে মাথায় হাত রেখে আশীর্বাদ করার অধিকার তার ছিল না। তাই আমি যতবার স্কুলে যাই অথবা ছুটিতে বাড়িতে আসি, গৃহ প্রবেশের পূর্বে তাকে আমার প্রণাম করতে হয়। সে রায় বাবুর ডামি হয়ে আমার মাথায় তার মুগুরের মত হাত রেখে আশীর্বাদ করবে- “দীর্ঘজীবি হও , জ্ঞান বিদ্যার মহীরূহ হও।”

মাঝে মাঝে আমার কৌতূহল হত, জিজ্ঞেস করতে ইচ্ছে করতঃ দাদু মহীরুহ অর্থ কী। কিন্তু চোখের দিকে তাকালে গলায় রস থাকত না । যাই অসুরের থাবা থেকে যত দূরে থাকা যায় ততই মঙ্গল।

একি দুর্দৈব ! মঙ্গলা আর পিসি একসঙ্গে নৃত্য-গীত-বাদ্য শুরু করে দিয়েছে। এদের নারী কন্ঠ এবং সারমেয় কন্ঠ এক হয়ে আমার ধ্যান ভেঙ্গে দিল। পিসিটা কখনো কখনো যেন শিশু হয়ে যায়। আরে! এ যে দেখছি দীপক মামা। কতদিন পর , আমাকে হয়ত চিনতেই পারবে না। পিসি তার বেয়াইকে পেয়ে এতদিন পর খুশি আর ধরে রাখতে পারছে না। উম্বা মুর্দা যে তার নেত্য গীত শুনতে পাচ্ছে সে হুশ নাই। দীপক মামা আমাদের আপন মামা নয়, কিন্তু আমরা প্রত্যেকেই এই অসীম দয়ালু মানুষটির কাছে বন্ধুর মত । তার সামনে যে কোন কথা আমাদের পেট থেকে সরাসরি মুখে চলে আসে মাঝখানে কোন মাথা ঘামাতে হয় না। একবার হয়েছে কি আমাদের দলা গাইটা বাছুর প্রসব করল হাওরে। তখন ফাল্গুন মাস আমরা গরু চড়াচ্ছিলাম। দলা গাই হা্ম্বা হাম্বা করে মাটিতে গড়াতে লাগল, তার প্রস্রাবের রাস্তা দিয়ে সাদাসাদা দুটি পায়ের কিছু অংশ আর মুখটি বেড়িয়ে আসল। তার পর অনেক কষ্টে রাখালরা সব টেনে বাছুরের বাকী অংশ বের করল, তারপর তাদের আনন্দ। কিন্তু আমার কেমন যেন একটা অস্বস্তি লাগছিল। আমি ভয়ে দূরে দাঁড়িয়েছিলাম। আমার প্রতিবেশী কাকা যে এতক্ষণ হেড দাইয়ের কাজ করছিল, সে আমার দিকে লক্ষ্য করে বলল-
আবু ডরাইছছ? বেক্কল এইডা ডরের কিতা হইল ! তর জম্মের কাল তরেও তো ওলাকান টাইন্যা তোর মার পেডের তন বাইর করছি।

বলে হাঃ হাঃ হাঃ করে হাসিতে হাওর আসমান এক করে ফেলল। আমার এমনিতেই কান্না পাচ্ছিল ও কথা শোনার সাথে সাথে মাকে আমার দলা গাইয়ের মত মনে হলো আর নিজেকে ঐ বাছুরটার মত। আমার সাঁরা শরীর কাঁপিয়ে কান্না চলে এল আমি সহ্য করতে পারছিলাম না। আমি বাড়ির দিকে দৌড় শুরু করলাম, ওগো মাগো বলে ভেঁ ভেঁ করে। আটির মাথায় হিজল গাছের নিচে যেখানে পুরনো নৌকা সাড়াচ্ছিল, সেখান থেকে মামা আমায় দেখতে পেল। তিনি হয়ত ভেবেছেন কেউ আমাকে মেরেছে, তাই সেখান থেকে এসে একেবারে আমার দৌড়ের মাঝ পথে দাঁড়িয়ে বললেন- কি হয়েছে এভাবে দৌড়াচ্ছিস কেন ? আমি মামাগো বলে তার কোলে ঝাপিয়ে পড়লাম। শরীর কাপিঁয়ে কাঁদতে লাগলাম আর ফুপিয়ে ফুপিয়ে মা মা করতে লাগলাম। মামা ব্যাপারটা বুঝতে পারছিলেন না, কারণ আমি আসছি হাওর থেকে আর মা আছে বাড়িতে তারপরও মা মা করে কাঁদছি কেন ? তারপরও এই ভয় ভারাক্রান্ত মনে যতটুকু পেরেছি মামাকে বলেছি । কিন্তু মামা আশ্চর্য , আমার শিশু মনের বর্তমান অবস্থাটা পরিষ্কার বুঝতে পেরেছিলেন, তিনি আমাকে শক্ত করে ধরে বললেন-

তুই একটা, বোকা ! যইত্যা সাধুর কথা বিশ্বাস করছছ ? এই সেদিন না তোদের সকলকে হনুমান ধরা পড়েছে বলে চার আটিতে দৌঁড় পারাল সারাদিন । সেদিন কোথাও হনুমান দেখতে পেয়েছিলি ? ওত একটা মিথ্যুক, মহা মিথ্যা কথা বলে সোনা। আরে বোকা মানুষ আর পশু কি এক হলো ! দলা গাই হলো পশু, পশুর ঘর বাড়ি আছে? পশু কি কথা বলতে পারে? পারে না । অপর দিকে চিন্তা কর তুই হলি মানুষ, তোর মা আছে, বাবা আছে, পিসি আছে আরও কতকি ? আমরা তোকে কত আদর করি। পশুদের কী তাই আছে!
পশুদের জন্ম তাই মানুষের মত হয় না । শুনবি তোর জন্মের কথা।

“সেদিন ছিল শুক্রবার, জ্যৈষ্ঠ মাসের এগারো তারিখ, দেবতারা অবশ্য আগে থেকেই স্বপ্নে তোর মাকে জানিয়ে দিয়েছিল তারা তোকে শুক্রবার দিন তোর মার কোলে দিয়ে যাবে। ঠিক যেমন দশমাস দশদিন আগে দেবতারা তোকে তোর মায়ের পেটে রেখে গিয়েছিল। এই কয়দিন তোর মা তোকে একটু একটু করে বড় করেছে। কিন্তু তোরা কেউ কাউকে দেখতে পেতিস না। এটা কেন জানিস, এটা না হলে মায়ের প্রতি সন্তানের টান জন্মে না। এইযে তুই মায়ের জন্য দৌঁড়াচ্ছিস এটা দশ মাসে মায়ের পেটে তৈরী হয় আর মা থাকে অপেক্ষায় কবে সন্তানের মুখ দেখবে। তারপর দশমাস দশ দিন পূর্ণ হলে দেবতারা আসে। তোর মাকে একটা ঘরে নিয়ে সোনার খাটে ঘুম পাড়ায় আর দেবতারা চারপাশে বসে কেউ পাখা হাতে বাতাস করে, কেউ কপালে হাত রেখে আদর করে আর কয়জন তোর মায়ের পেটে হাত রেখে মায়া জাল সৃষ্টি করে আর সেই মায়ায় হাসতে হাসতে তুই উঠে আসিস। আমরা বাইরে থেকে তোর হাসি শুনেই না বুঝতে পারলাম তুই এসে গেছিস।”

দুটোই গল্প, আজ আমি জানি পৃথিবীতে কিভাবে এসেছি। কিন্তু সেদিনের জন্য মামার গল্পটাই ছিল সত্যি। সত্যের মুখোমুখি হতেও মানুষের নির্দিষ্ট মানসিক বয়স তৈরী হতে হয়। সেদিন মামার গল্প আমাকে যে প্রশান্তি দিয়েছিল আর যইত্যা সাধুর গল্প যে অশান্তি দিয়েছিল, আমার অনুভূতিতে এর চেয়ে সহজ সত্য মিথ্যা আর নেই। সেদিন দৌঁড়ের মাঝখানে মামা আমাকে বাচিঁয়ে দিয়েছিলেন। যদিও আমি মাকে খুঁজছিলাম কিন্তু মা আমাকে সে দিন আমার প্রয়োজনীয় সত্যটা হয়ত উপলব্দি করাতে পারত না। মামার সঙ্গে আমাদের প্রত্যেকের ছিল এই ধরনের সহজ অথচ অনিবার্য সম্পর্ক। রুপুর চিঠি এই পর্যন্ত থাক। এখন মামাকে চাই।

মামাকে নিয়ে এতক্ষণে অনেকে জড় হয়ে গেছে। ছোটরা একে একে প্রণাম করছে , আমি প্রণাম করে মাথা তুলে মামাকে ঝাপটে ধরলাম । কত দিনের পর বেদখল হয়ে যাওয়া মানুষটাকে এত কাছে পেয়ে সরে যেতে পারলাম না। মামা আমাকে সংশয়ের দৃষ্টিতে বার বার তাকাচেছ। মা আর পিসি দূর থেকে মিটি মিটি হাসছে।

এই তুই ভবানন্দ… ভ আনন্দ না ? ওরে দুষ্টুরে , তুই যে কত্ত বড় হয়ে গেছিস। তোকে ত আর আমি কোলে নিতে পারব না। তুই বড় হলি কেন ? লম্বায় দেখি আমাকেও ছাড়িয়ে যাবি। এর পর এক নিঃশ্বাসে মামা আমার বায়োডাটা আপডেট করে নিলেন। এদিকে সবাই তাগাদা দিচ্ছে কত দূর থেকে এসেছে এখন ছাড়, হাত পা ধুয়ে একটু বিশ্রাম নিক তার পর তোদের মামা ভাগ্নের কথা হবে।

দীপক মামা আসলে আমাদের গল্পের মামা, ছোটবেলা আমরা তাকে ডাকতাম কিচ্ছা মামা বলে। ছোটদের কিচ্চা, বড়দের কিচ্ছা, রাজার কিচ্চা, প্রজার কিচ্ছা, মামা ছিল কিচ্ছার জীবন্ত পাঠাগার। অর্থনৈতিক কর্ম বলতে বা সমাজে পরিচয় দিতে বলা যায় মামা আমাদের গৃহশিক্ষক সারা পাড়ার। কিন্তু মামার কাজের শেষ ছিল না। মামা ছিলো সারা পাড়ার মামা। আমরা ছোট বেলায় জানতাম তিনি আমাদের প্রত্যেকের আপন মামা। সব বাড়ির আনন্দ-বেদনার, বিয়ে- শ্রাদ্ধ সব অনুষ্ঠানে মামা উদয়াস্ত নির্ধারিত পরিচালক। কিন্তু পড়ে জেনেছিলাম এগুলো তার রাজনৈতিক কর্মসূচির মধ্যেই ছিলো। আবার এই রাজনীতিই তাকে এখান থেকে চলে যেতে বাধ্য করে। তিনি অকস্মাৎ হারিয়ে যান আমাদের মাঝখান থেকে আমাদের খেলা ঘর ভেঙ্গে দিয়ে। যইত্যা সাধুর হনুমান খোঁজার মত মামাকে আমরা খুঁজেছি বহুদিন। হাটে বাজারে, সরস্বতী পুজার মাগনে, মামাকে আমরা সাধ্য মত খুঁজেছি। এমনকি মোহনগঞ্জে গিয়ে যতটা আগ্রহ ছিল রেল গাড়ি দেখার তার চেয়ে বেশি ছিল মামা কে পাওয়ার । এই বুঝি মামা ট্রেন থেকে নামলেন। তাই ট্রেনের বাঁশী আমাকে চুম্বকের মত টানত। স্টেশনে পৌঁছার আগে রেল সেতুতে উঠেই ট্রেনটা একটা হুইশেল দিত, সেটা শুনতে আমার কোনদিন ভুল হত না। ক্লাসে আটকা না পড়লে স্টেশনে যাওয়া ছিল আমার অনিবার্য। প্রতিবার ব্যর্থ হয়েছি তার পরেও আশায় উন্মুখ থেকেছি এর পর নিশ্চই পাবো।

বর্ষাকালে আমাদের আটিতে চারদিক জলমগ্ন, মনসামন্ডপ একমাত্র পাবলিক হল। মামার আসর ছিলো এটা । এখান থেকে খোলা হাওরের অনেক দূর দেখা যায় একেবারে উত্তরের শেষ সীমা পর্যন্ত। যেখানে হাওরের সমস্ত পানিকে আগলে রেখে অজগরের মত পাহাড়টা আকাশ পানির মাঝখানে শুয়ে আছে বিশাল দেয়াল হয়ে। আবার হাওরের উদোম বাতাস এখানে পাকা বাড়ান্দায় নাকে সরিষার তেলের ঘুম আনে। সামনে মনসা পূজা তাই প্রতিমা নির্মাণের কাজ চলছে। জ্ঞান আচার্য অত্র এলাকার একমাত্র প্রতিমা নির্মাতা। সে বরাবর এক ঘরানার মনসা বানিয়ে চলেছেন কিন্তু দর্শক ভক্তরা কোন বছর তার নির্মিত প্রতিমার ভূয়সি প্রশংসা করেন আবার কোন বছর বলেন না, এই বার জ্ঞান পালের মূর্তি সঠিক ধ্যান পাইছে না। এই গায়ের দর্শক ভক্তরা এই দুই মন্তব্যের বাইরে আর কিছু জানে না। মোহনগঞ্জে গিয়ে সেবার স্কুলের পূজায় ম্যাডামের ময়মনসিংহ থেকে আনা প্রতিমা যদি আমি না দেখতাম তবে আমিও এই ধ্যানের বাইরে যেতাম না।

সে বার স্কুলে সরস্বতী পূজার মিটিংয়ে বরাবরের মতই হিন্দু ছাত্র-ছাত্রীদের ডাকা হলো। কিন্তু আমরা জানি এতে আমাদের কিছূ করার নাই, সব পন্ডিত স্যার করবেন । পূজার দিন স্যার নিজেই দৌঁড়াবেন বিভিন্ন পাড়ার পূজার মন্ডপে। তাই খুব সকালে স্যার আমাদের নিয়ে মহাদ্রুত লয়ে অং বং চং করে বিদ্যাং দেহি নমস্তুতেঃ বলে দুইটা ভুইত্যা আলুর টুকরা হাতে ধরিয়ে দিয়ে, আপেল কমলার মত দামী ফল গুলো রুমে তালা দিয়ে দৌঁড়াবেন বামনাই করতে । পাড়ার সংঘের পূজায় বরং বেশী আনন্দ। সেখানে একদলের সঙ্গে আরেক দলের কমপিটিশন হয় । আগের রাত থেকে পূজা মন্ডপ তৈরির কাজ শুরু হয়, জেনারেটর আসে, মাইক আসে সারা রাত চলে মাইকে সিনেমার মন মাতানো গান। আর এক দেড় মাস ধরে চলে মায়ের নামে চাঁদাবাজি । প্রত্যেক দলেরই বয়স ভেদে বেশ ভালো মোটা তহবিল তৈরী হয়। আর তহবিল তছরুপের শিক্ষাটা মা সরস্বতীর কৃপায় ছাত্রাবস্থায় তখন থেকেই হাতেখড়ি হয়। মোহনগঞ্জে এসে প্রথম বছরটা আমি সুযোগ পাইনি দ্বিতীয় বছরে মাইলোড়া গ্রামের এক সহপাঠীর সাথে ছয়আনা দশআনা মারিং কাটিং কঠিন শর্তে মাইলোড়া জয়ন্তী সংঘে নাম লিখাই। তাই স্কুলের পূজায় পন্ডিত স্যারের ভুইত্যা আলুর বিদ্যাংদেহির প্রতি অন্তত আমাদের কোন আকর্ষণ নেই । কিন্তু সমস্যাটা বাধিঁয়েছে ম্যাডাম। এবার মিটিংয়ে থাকবেন, ম্যাডাম ডাকলে না যাই কেমনে, বুঝতে পারছি না।

ম্যাডাম আমাদের স্কুলে এসেছেন ছয় মাস, এসেই ছাত্র-ছাত্রীদের মনের মহারাণী হয়ে গেছেন। হবেন নাইবা কেন ? ম্যাডাম রুপে গুনে একেবারে সিনেমার নায়িকা। ম্যাডাম যাই করে তাই ভাল লাগে আমাদের। কিন্তু ম্যাডাম আমার সঙ্গে কিছুই করে না। শেষ বেঞ্চের ছাত্রকে সোহাগ করে কেউ আদর করে না জানি কিন্তু নিয়ম মত পিটানোত যায়। ম্যাডাম আমার জন্য এতই কৃপণ যে একদিন কান ধরে টেনে ধরলেন না। দুই গালে একটা চড় দিলেন না। বাম হাতে ঘাড় চেপে ধরে মাথা নুইয়ে ডান হাতে পিটের মধ্যে কষে দুইটা থাবা দিলেন না। দূর থেকে অস্পৃশ্যের মত বলতেন দাঁড়িয়ে থাক। ক্লাশ থেকে বেড়িয়ে যাবার সময় মৌখিক আদেশটা উঠিয়ে নেবার জন্য আরেকটা বাক্যও খরচ করতেন না। ক্লাসের দশ বেঞ্চ ডিঙ্গানোর সামর্থ আমার এ জম্মে হবে না, তাই আজকে মিটিংয়ে ম্যাডামের নৈকট্য লাভের একটা মহান সুযোগ, আজ শুধু হিন্দু ছাত্রছাত্রীরাই থাকবে। তাছাড়া সব ক্লাস শেষে অনেকেই থাকবে না। ঘুরে ফিরে আমারা অভাগা হোস্টেলের কজনেই থাকব। তবে আজ ম্যাডামের পায়ের কাছে বসতে পারলে নিজেকে ধন্য মনে করব। যাহ্ বাবা এখানেও তিন নম্বরে। সাতটা সারি অতিক্রম করতে পেরেছি মা সরস্বতীর কৃপায় সেটাও কম কি । যথরিতি মিটিং শুরু হলো হেড স্যার, পন্ডিত স্যার আর ম্যাডাম। পন্ডিত স্যার ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য দিয়ে বিষয়টাকে সাম্প্রদায়িক করে ম্যাডামকে উৎখাত করতে চাইলেন। আর ম্যাডাম তার সহজ হাসিতে যুক্তি উপস্থাপন করে বিষয়টা সার্বজনীন করে তুললেন। আমরা ম্যাডামের পক্ষে । স্বধর্মে পন্ডিত স্যারের জন্য মরণ পণ করতে পারি। কিন্তু এখন ম্যাডাম কে কষ্ট দিতে পারব না। তাছাড়া ম্যাডামকে আমরা মুসলমান মনে করি না। তিনি পন্ডিত স্যারের অনুপস্থিতে আমাদের ধর্ম ক্লাস নিয়েছেন, এমনকি সংস্কৃত ক্লাস ও নিয়েছেন। পন্ডিত স্যারের সংস্কৃত ক্লাস মানে মরঃ- মরো- মরা! নরো- নরৌ- নরা। ম্যাডামের ক্লাস মানে সংস্কৃত গল্পের কি চমৎকার বাংলা বয়ান- কাক বর্তক কথা, বানর পক্ষির কথা, আমরা সংস্কৃত ক্লাসে ম্যাডামকে পাওয়ার জন্য পন্ডিত স্যারের শুলের ব্যথা প্রার্থনা করতাম।

মিটিংয়ে মোটামুটি সহজ সমাধান হলো পন্ডিত স্যার তার ধর্মীয় ভাব-গাম-বীর্য দিয়ে মায়ের পূজা করবেন সকালে আর ম্যাডাম এর আগে পরে যা সব নিজ পছন্দ মত করবেন। পন্ডিত স্যারের এদিকে একটু ক্ষতি হলেও পাড়ার আরও দুটা পূজা বাড়িয়ে করে নিলে পুষিয়ে নিতে পারবেন। পূজার সার্বিক দায়িত্ব ম্যাডাম নিলেন, আগামীকাল তিনি আমাদের নিয়ে কমিটি গঠন করবেন। মিটিং শেষ, সবাই চলে যাচ্ছে পন্ডিত স্যার ও চলে যাচ্ছেন। তখন যদি বিশেষ কোন উপায়ে পন্ডিত স্যারের মনের ঘরে একটা মাউথ পিস বসানো যেত তাহলে কী শুনা যেত সেখান থেকে?

“কুলটা যবন, পূজা করার এত শখ ত হিন্দু হইলিনা কেরে? জন্মডা যখন মুসলমানের ঘরে হইছে তখন যা না মৌলানার সাথে গিয়া মিলাদ মাহফিল কর কেডা তরে আটকায়। এইডা হইলো হিন্দুর উপর অইত্যাচার। শেখের রাজত্ব যখন তখন ত শেখ বেডির পূজা মানন লাগবই। মাগো তুইযে আর কতকি দেখাইবে। হড়ি বলঃ হড়ি বলঃ !”

তবে আমার মনে অন্য স্বপ্ন । হোষ্টেলে যখন আছি তখন দায়িত্ব একটা পাবই। তাছাড়া চৌকস মেধাবীরা ম্যাডাকে বেশি সময় দিতে পারবে না। কারণ তাদের পাড়ার পূজা আছে, আর সেখানে আছে মোটা তহবিলের হাতছানি। একবার ম্যাডামের কাছে শেষ বেঞ্চের অপছায়া সরিয়ে যদি একটা সেবাদাসের ছবিও লাগিয়ে দিতে পারি তবেই আমি সফল। যেমন ম্যাডাম স্টেশন থেকে স্কুলে ফিরে আমকে ডেকে বলবে- যাতো আনন্দ, স্টেশন মাস্টারের রুম থেকে আমার ব্যাগটা নিয়ে আয় অথবা আমার ব্যাগটা নিয়ে স্টেশনে চল। আনন্দ কোথায় থাকিস ? যা আমার কাপড় গুলো ইস্ত্রি করে নিয়ে আয়। আনন্দ একটা রিক্সা ডেকে নিয়ে আয় তোকে নিয়ে বাজারে যাব কিছু কেনাকাটা আছে। বন্ধুরা দেখবে আমি ম্যাডামের সাথে এক রিক্সায় যাচ্ছি ? আহা ! কী সুখরে মুই কি হনুরে।
তবে আপাতত বিকেলে হাকিম স্যারের অমর বরপ্রাপ্ত জুতা গুলো মুচির ঘর থেকে আনতে হবে। হাকিম স্যার তার ধুপা মুচির মন্ত্রণালয়টা আমার দায়িত্বে দিয়ে দিয়েছেন। কেবল নাপিতেরটা বাকী রেখেছেন, কোনদিন যে সেটাও দিয়ে দিবেন কিনা সেই আতঙ্কে আছি। তিনিই একমাত্র আমাকে যথার্থ চিনতে পেরেছিলেন ।

সকালের নাস্তার পর ডাক পড়ল, ম্যাডাম বকুল গাছের নিচে বসে আছেন, পূজার কমিটি গঠন করবেন। রূপ, রুচি ও সৌন্দর্যের এক নিপুন প্রতিমা হয়ে ম্যাডাম বসে আছেন মাঘ মাসের সকালবেলার মিষ্টি রোদে। ছাত্ররা পায়ের কাছে শিশির শুকানো সদ্যস্নাত ঘাসের পরে বসেছে ছাতার মত।। কথার শুরুতেই আমার নাম ধরে বললেন – আনন্দ বলতো; এর আগে তোরা পূজা কিভাবে করতিস ?
মানুষ কি কি কারণে বাপের নাম ভুলে যায় তা আমি বলতে পারব না, তবে আমি তখন নিজের নাম ভুলে গিয়েছিলাম সেটা সকালের সূর্যের মতই সত্য ছিল। আমাকে ডাকবে হেকিম স্যার, জুতা পালিস করে আনবার জন্য, আমাকে ডাকবে পন্ডিত স্যার মধ্যাহ্নে‎র খরতাপে দগ্ধ হয়ে তার বাপের শ্রাদ্ধের চিঠি ডাকঘরে পোস্ট করবার জন্য, আর এই জন্য ভবা নামটিই যথার্থ। কিন্তু এ দেবী যে একেবারেই উল্টো ! ভবাকে একেবারে বাদ দিয়ে আনন্দ !

ম্যাডাম আমার প্যাঁচা মুখ লক্ষ্য করে বললেন কিরে এরকম হা হয়ে আছিস কেন? গত বার কিভাবে পুজোটা করেছিস সেটা ও তুই বলতে পারবি না ?
আলবত পারব, আজ পারবার জন্যই এসেছি , আমি হাত তোলে একেবারে দাঁড়িয়ে গেলাম,
ম্যাডাম বললেন, দাঁড়িয়ে বলতে হবে না, এটা তোর ক্লাসের পড়া না। বসে আস্তে আস্তে বল।

আমি বলতে শুরু করলাম-
“ম্যাডাম পথমে পন্ডিত স্যার সকালে আইয়া তার পুটলা খুলবেন, আমাদের দিয়ে যেসব আখ ভুইত্যা আলু আগের দিন কিনিয়ে এনেছিলেন তা পূজার ঘরে নিয়ে আসতে বলবেন। আমরা সব নিয়ে আসলে স্যার মেয়েদেরকে বলবেন ফল ও পূজার উপকরণ সাজাতে আর ছেলেদেরকে বলবেন পুষ্পাঞ্জলি দিবার জন্য প্রস্তুত হতে । তারপর পন্ডিত স্যারের মন্ত্রপাঠ, পুষ্পাঞ্জলি প্রদান ও প্রসাদ বিতরণ, ভুইত্যা আলু আর আখ আমাদের ভাগে কমলা ও অন্যান্য দামী ফল স্যারের ভাগে। বাস, স্কুলের সরস্বতী শেষ।”

ম্যাডাম এমন ভাবে হাসি শুরু করলেন যেন এমন হাস্যকর গল্প জীবনে শুনেননি। তাঁর চেয়ার ছেড়ে পড়ে যাবার উপক্রম।

আনন্দ, তুই এত সুন্দর বলতে জানিস? কই ক্লাসেত তোকে মনে হয় বোবা। তোর এখনকার কথা যদি সত্যি হয় তাহলে খুবই দুঃখজনক তবে তোর উপস্থাপন খুব সুন্দর, আমার ভাল লেগেছে। তবে এইবার পূজা গত বারের মত হবে না যদি তোরা আমাকে সাহায্য করিস। তোদের ভাগে সবরকম ফলই প্রসাদ হিসেবে থাকবে। এই বার শুন তোদের মধ্যে থেকে তিনজন দলপতি থাকবে, কোন তিন জন হবি তার নাম লেখ।
এক- নিপেন্দ্র সাহা।
দুই- জয়ন্ত তালুকদার।
তিন- ভবানন্দ বংশি দাস।

এখন তোরা তিন জন তোদের প্রত্যেকের দলে আরো ছয়জন করে নিয়েনে। মোট আঠারো জন থাকবে পূজার সার্বিক দায়িত্বে। আমি তোদের দল ভিত্তিক দায়িত্ব দেব। যে দল কে যে কাজের দায়িত্ব দেব সেই দল সেটাই করবে। আমি দেখব তোদের তিন দলের মধ্যে কোন দল সবচেয়ে কাজের । তবে আজকে মিটিং এখানে শেষ, আমি আজ বিকেলের ট্রেনে ময়মনসিংহ চলে যাব আর যাবার সময় তোদের কাজ বুঝিয়ে দিয়ে যাব । আমি আসব পূজোর আগের দিন, আসার সময় প্রতিমা ময়মনসিংহ থেকে নিয়ে আসব। আলোক সজ্জা, মন্ডপ সাজ তোরা করে রাখবি। আপ্যায়নের ব্যবস্থা থাকবে। কিরে ময়মনসিংহ থেকে প্রতিমা আনলে ভাল হবে না?

আমরা অভিভূত, এক চিৎকারে এক সঙ্গে মাঘ মাসের শীতের সকালকে বৈশাখ মাসের ভরদুপুর বানিয়ে ফেললাম। ম্যাডাম আমাদের থামিয়ে বললেন- আসলে তোদের এখানের প্রতিমা আমি দেখেছি, এগুলো কে ঠিক দেবী মনে হয়না, মনে হয় সাজুগুজু কাজের মহিলা। আমি যে প্রতিমা আনব দেখিস কী সুন্দর হয়।

সত্যিকারের দেবী প্রতিমা কেমন হয় তা প্রথম ম্যাডাম আমাদের দেখালেন। আমাদের চোখ খুলল। মাটির মূর্তির পরে রং তুলির আচড় থাকলেই তাকে দেবতা জ্ঞানে ভক্তি করতে হবে আমরা এই জানতাম। কিন্তু এই প্রথম বুঝতে পারলাম নিয়মমত ভক্তির বাইরেও প্রতিমা নিজেও ভক্ত তৈরী করতে পারে, যদি তার নির্মাতার চোখ থাকে। পন্ডিত স্যারের প্রতিমা পন্ডিত স্যারের ঘরের মত, ম্যাডামের প্রতিমা ম্যাডামের মত আর এই খানে জলটোপরে জ্ঞান পালের প্রতিমা জ্ঞান পালের মত । শহুরে দেবী শহুরে নারীর মত আর গাঁও গেরারমের দেবী গাঁইয়া বধুর মত। ধ্যানটেনের খবর আমি বলতে পারব না। প্রতিমা তৈরী হলে রং টং শেষ হলে ভাল করে তাকালে মনে হবে জ্ঞান আসলে চারপাঁচটা সাপ পেচিঁয়ে তার মধ্যম পুতের বউটাই বানিয়েছে। যাক প্রতিমার কথা বলতে গিয়ে ম্যাডামের শোকে পেয়ে বসেছিল। এবার মামার ক্যাম্পে ঢোকা যাক।

মামাকে নিয়ে মজমা জমে উঠেছে, বিষয়ত একই এবার পূজায় কোন পালা হবে। এত দিন মামা ছিলেন না, তাই ভাড়া করে পালা দল আনতে হয়েছে। এবার অনেক দিন পর মামা এসেছেন সুতরাং পালা দলের কোন দরকার নেই। মঞ্চে উঠার জন্য আমাদের হাত পা নিসপিস করছে । এবার আর কারো তর সইছে না। আমাদের যে সব অভিনেতারা এতদিন পালাদলের অভিনয় দেখেছেন দর্শক হয়ে এখন তারা সমালোচনা মুখর হয়ে উঠেছেন। এগুলো এতদিন কোন পালাই হয় নি। মামা থাকলে এর চেয়ে কত্ত ভাল পালা আমরাই করতে পারতাম। কিন্তু এইসব মহারথীরাই মামার অবর্তমানে তিন দিন মহড়া চালাতে গিয়েই যে নাবিক ছাড়া জাহাজ হয়ে গিয়েছিলেন তা বললেন না। অনেক হাউকাউ হলো, শেষে মামা বললেন কোন পালা করবেন তিনি জানাবেন। সবাই মধ্যাহ্ন ভোজের তাগিদ অনুভূত হওয়ায় চলে গেল। যাবার সময় জ্ঞান পালের ডাবাটা সাক্ষী স্বরূপ তাদের সাথী করে নিলেন। জ্ঞান পাল খেয়ে এসে যখন দেখবেন যে তার হুকাটা যথা স্থানে নেই তখন শুরু করবেন তার গুর্মা সঙ্গীত। এটাই ভর দুপুরে জলটোপরের আপাত বিনোদন।

বাড়ি ফেরার পথে মামা বললেন সন্ধ্যার পর আমার এখানে আসিস , তোর সাথে কথা আছে, আমি বললাম এখন আসি , আমার ত কোন কাজ নেই। মামা বললেন তোর নাই কিন্তু আমার আছে, তুই সন্ধ্যার পর আসিস , আমি এখন অন্য এক জায়গায় যাব সেখানে আপাত তোকে নেয়া যাবে না।

গোপাল কৃষ্ণ বংশি দাস , কালা কৃষ্ণ কৈবর্ত মাঁচা ঘরের বাঁড়ান্দায় খেতে বসেছেন। তাঁরা দুজন সম্পর্কে মনিব ভৃত্য কিন্তু যারা জানেন না তাদের কাছে এ দুজন আচড়নে অনায়াসে সমগোত্র হবেন। আমি আর দাদু বড় ঘরের মাঝখানে খেতে বসেছি। আমাদের সেবা নির্বিঘ্ন করার জন্য তিন জন। মা, পিসি খাবার পরিবেশন করছেন আর মঙ্গলা দরজা আগলে বসে আছে। যেন বিড়াল ঢুকতে না পারে। আমার জানা মতে বিড়াল কোন দিন আমাদের বিঘ্ন ঘটাতে আসেনি, সে কালা কৃষ্ণ ও তার মনিবের পাত ছেড়ে অন্য দিকে দৃষ্টিপাতও করে না। এ বাড়ির বিড়ালরাও জানে তাদের সীমানা কতটুকু। তবুও মঙ্গলা শুয়ে থাকবে দরজায়, মা পিসিমা দন্ডায়মান থাকবে আমাদের পাতের ধারে, যেন আমাদের খাবার চলাকালিন মুখে কিছু বলতে না হয়। ভগবান কথা বলা এবং খাবার গ্রহনের এক রাস্তা দিয়েছেন বলেই মা পিসির এই শাস্তি ভোগ করতে হয়। শ্রীমান উমেদ বংশির খাওয়ার সময় কিছু চাইতে গেলে পাছে কয়টা ভাত কম গিলা হয় তবে ত মহা সব্বনাস হয়ে যাবে। অথচ বিড়ালে মানুষে চেয়ে খেয়ে গল্প করে কালাকৃষ্ণ ও তার মনিবের স্বাস্থ্য চেহারা কম শক্ত পোক্ত নয় । আমার খুব লোভ হয় যদি এদের সাথে বসে খেতে পারতাম। এই ভয়ংকর আপ্যায়নের চেয়ে ওখানের সাধারণ স্বাভাবিক ব্যবস্থাটাই কি অনেক বেশি সুন্দর ও আরামদায়ক নয় ? এটা আমার সাধারণ চাওয়া, পরক্ষণেই আমার মধ্যে একটা আমিত্ব কৃত্রিম ব্যবস্থাটাকেও সর্মথন করে। আমার মধ্যে একটা ভারিক্কি আসে, আমার স্বজন আমার স্রষ্টাকেও ছাড়িয়ে আমার আমিত্ব গর্ব করে বলে আমি এদের থেকে আলাদা, আমি উমেদ বংশির থেকেও আলাদা। আমি এদের ভবিষ্যৎ অভিভাবক আমিই এদের শাসক। যে শিক্ষার জোরে আমার মধ্যে এই অহংকার তৈরী হয় সেই শিক্ষার কাছে আমি যে কত অপাংক্তেয় তা কিন্তু তখন মনে পড়ে না। অবস্থান বিবেচনায় আমি রাজা হই, প্রজা হই, দাস হই।

বাবা খাবার শেষ করে পরনের লুঙ্গিতে মাথা গুজে হাতমুখ মোছে ডাবা চাটা শুরু করে দিয়েছেন, কাইল্যা শিয়ালের ছাগল বধের দৃষ্টি নিয়ে ডাবার দিকে তাকিয়ে আছে। বাবা রেল ইঞ্জিনের স্টীমের মত ডাবার পনিতে বাস্প তৈরী করছেন মুখ দিয়ে। আর ধুমা ছাড়ছেন নাক দিয়ে। রেল গাড়ির একটা ক্ষুদ্র সংস্করণ আমাদের মাচা ঘরের বারান্দাকে স্টেশন বানিয়ে ছাড়ার অপেক্ষায় আছে। ডাবা হাত বদল হয়েছে , বাবা স্টেশন থেকে কাইল্যা স্টেশনে গেছে। এদিকে আমাদের খাওয়াও শেষ। উমেদ বংশি পাতে হাত ধৌত করেন না। তিনি ভোজন উচ্ছিষ্ট হাতে নিয়ে উঠে যাবেন বাইরে এবং উচ্ছিষ্টাংশ মংলাকে দিবেন। মা ঘটি হাতে তার অন্ন ব্যঞ্জন চর্চিত হাতে জল ঢালবেন । আমার হাত মুখ মা ধুয়ে দিতে চাইবেন কিন্তু ইদানিং আমার সংকোচ বোধ হয়। তাই আমি নিজেই ধুবার চেষ্টা করি তবুও মা আমার ধুয়া মুখের উপর ভিজা হাতে এক পোচ মারবেন। উম্বার স্টীম ততক্ষনে পিসি রেডি করে ফেলেছে। এখন বালিশে হেলান দিয়ে ঘরঘরার নল মুখে দিয়ে সে হয়ত অনুভব করতে চাইবে তার প্রাক্তন মুনিব রায় বাবুর মত হচ্ছে কিনা।

(চলবে)

ব্রাত্য রয়

ব্রাত্য রয়

জন্ম ২৫ মে ১৯৭৩, মোহনগঞ্জ, নেত্রকোনা।পেশায় কলেজে অধ্যাপনা (প্রভাষক, রয়েল মিডিয়া কলেজ, ময়মনসিংহ।)

আগ্রহ কবিতা, গল্প, প্রবন্ধ ও উপন্যাসে। 

প্রকাশিত গ্রন্থ-
উপন্যাস- নাম পুরুষ ( ২০১৮)

প্রবন্ধ- গুরু পুঁছিও জানো (২০১৯), খেরোয়াল (২০১৯), আপন আরশিতে অচেনা আনন (২০১৮), তৈল সংহার (২০১৮), ইতি পাতি রাজ হাস (২০১৭), আপ্তবাক্য (২০১৭), বাঙাল ধর্মত্ত্ব (২০১৬)

ই-মেইল : bratyoroy@gmail.com 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

জল হিজল অনল – ৭ম পর্ব

লেখকঃ ব্রাত্য রয়