জল হিজল অনল – ৬ষ্ঠ পর্ব

পঞ্চম পর্ব প্রকাশের পর হতে…

এখন রাত কয়টা ? আমি জানিনা, জানা সম্ভবও না। হোস্টেলে থাকতে হেড স্যারের রুমে জানালা দিয়ে আমরা বড় ঘড়িতে সময় দেখতাম। ঘড়িটাকেও তখন স্যারের মতই একটা কিছু মনে হত। বেশিক্ষণ তাকাতাম না, ভয় করত পাছে ঘড়িও না আবার প্রশ্ন করে বসে। তবে ঘুমের আন্দাজে মনে হচ্ছে মাঝ রাত। তলপেট ভার লাগছে , আমার আবার রাতে একবার মূত্র বিসর্জন করার জন্মগত অভ্যাস আছে। জম্মের পর থেকে এ অভ্যাস এখনো যায়নি, মা পিসির কোল ভিজাতে ভিজাতে অভ্যাস খানা আমার এমন পোক্ত হয়েছিল যে হোস্টেলে গিয়েও রুম মেটদের কোল ভিজিয়েছি। তফাৎ শুধু এটুকুই মা-পিসি ভিজানোর পর প্যান্ট পাল্টে অপর পাশে নিয়ে ঘুমিয়েছেন আর ওরা টেপ খোলার সাথে সাথে দুই পায়ে লাথি মেরে বিছানা থেকে ফেলে দিয়েছে। বাকি রাতটুকু আমার এভাবে মেঝের উপরে নির্ঘুম কাটাতে হয়েছে। তখন কেবল পিসির কথা মনে হত আর দুচোখ ফেটে কান্না আসত। ‘ও পিসি তুই একবার দেখ এসে, তোর আদরের ধন মানিক্কির কি অবস্থা!’ তবে আমার বদ অভ্যাসখানা যেমন ছিল আহ্লাদের তেমনি এর প্রতিকারের ব্যবস্থাটাও হয়েছিল যথাযথ বিপরীত মাত্রার। এমনি কয়েক রাত লাথি খাওয়ার পর আমার মূত্র বিসর্জনের স্বপ্ন চিত্র পাল্টে গেল। আগে আমি স্বপ্নে দেখতাম নদীর ধারে নুনু হাতে নিয়ে পেছিয়ে পেছিয়ে জল ঢালছি নদীর জলে, আর রায় বাড়ির রাজহাঁসগুলো সেই জল খাচ্ছে খত খত করে। আর এখন দেখি আমাকে মুতানোর জন্য কয়টা জল্লাদ ইয়া বিশাল খড়গ হাতে তাড়া করছে আর আমি প্রাণপনে দৌঁড়াচ্ছি আর চিৎকার করে বলছি না না মুতব না, মুতব না। এমনি অবস্থায় ঘুম ভেঙ্গে যেত আর দৌঁড়ে বাইরে চলে যেতাম। এখন বুঝি বন্ধুরা কি উপকারটাই না করেছে আমার । পিসি হারামজাদি ত আমাকে নদীর ধারের স্বপ্ন দেখিয়ে দেখিয়ে আর বিছানায় মুতিয়ে বউয়ের কাছে চালান করে দিত। বাসর ঘরে বউয়ের কোলে মুতে দিয়েছি ভাবা যায়! রুপুরানীর গায়েঁ আমি টেপ ছেড়ে দিয়েছি। উঃ হারামজাদী আমার কী সর্বনাশটাই না করছিল।

উঃ মাগো বলে পিসি আর্তনাদ করে উঠলো, অই আবু এমন খামছাইয়া ধরছচ কেনে ? আমার নাক মুখ জ্বলতাছে। খারাপ স্বপ্ন দেখছচ ?
আমি ভ্যাবাচেকা খেয়ে বললাম হঃ দেখছি। আমার তখন খারাপ লাগছিল রুপুরানীর জন্য পিসিটাকে এভাবে মারলাম ! পিসি তখন আধো ঘুমে । আমি দুই হাতে ওর গলা ধরে মুখটা কানের কাছে নিয়ে বললাম পিসি দুঃখু পাইছছ ?
না । তুই কিতা স্বপ্নে ভয় পাইছছ ?
না ।
তাইলে ঘুমা
বাপ, আয় আমার কাছে আয়, এই আমি তরে আঞ্জা দিয়া ধইরা রাখছি আর কোনু দেও দানো তরে দেখত না ।
কিন্তু পিসি আমি যে মুতবাম।
ওঃ তুইত ফিরা মধ্যি রাইতে মুতছ, মনগঞ্জ গিয়া বালাই হইছে তোর বিছনাত মুতার দোষটা গেছে। নে উঠ বাইরে যাই।

আমার বলতে ইচ্ছা করছিল পিসি তুমি উঠোনা, তুমি ঘুমাও আমি একাই পারব। কিন্তু জানি ও মানবে না। পিসি যেমন হাত ধরে নিয়ে গেল তেমনি হাত ধরে ফিরিয়ে এনে আগের শোবার ফটোকপি করে শোয়ে পড়ল।

আমি আমার গলা থেকে ওর হাতটা বুকের কাছে এনে বললাম – আইজ কী পূণির্মা ? ও বলল, না পরদিন।
তাইলে আসমান এত পরিষ্কার কেরে ?
আসমানো আইজ কুনু মেঘ নাই হেরলাগি।
পুন্যি দি কি ঘানি ঘুরানো শুরু কইরা দিছে ?
কি জানি দিছে মনয়, জানি না।

পিসি তুই চুপ কইরা শুইয়া থাক, আমি এখন বাইর হইয়াম। পুন্যিদির বাড়িত যায়াম, তুই কুনু ডরাইছ না। আমি বড় হইছি, আমার একটুও ভয় করে না। রাইতে তোর বাপের সাহস আমারে ভর করে। এখন বাইর হইলে দাদু একটুও রাগ করত না। বরং তুই না করলে তোরে বকব। তুই আমারে ছাড়।
পিসি আমাকে কোল বালিসের মত জড়িয়ে ছিল, এখন মনে হচ্ছে চেঁপে ধরেছে। মুখ দিয়ে কিছু বলছে না তবে আমার মন বলছে যদি কোন যাদুমন্ত্র জানত তাহলে এখন তা আমার উপর প্রয়োগ করতো নিঃশব্দে। আমি ওর কোল বালিশের প্যাঁচ থেকে বের হবার কৌশল জানি। আমার চোখের মধ্যে সে কৌশল প্রয়োগের আভাস দেখতে পেয়ে পিসি তার বাঁধন আলগা করে দিল। আমি পিছলিয়ে বের হয়ে পড়লাম। বিছানা থেকে নেমে বললাম পিসি দরজাটা লাগিয়ে দিস। বুঝতে পারছি এখন রাগে দুঃখে ও কাদঁবে। ওর বাপের কিছু লক্ষণ যে আমার মধ্যেও আছে এইটা সে জানে। আর এইখানেই ওর সবচেয়ে ভয়, বড় হয়ে আমিও না আবার ওর বাপের মত নিষ্ঠুর হয়ে যাই।

আমি গোয়াল ঘরের চালের খাপ থেকে বৈঠা নিয়ে খাল পাড়ে গিয়ে নৌকা ঠেলতে লাগলাম কিন্তু নৌকা নামে না। বাবা সাবধানী মানুষ যদি রাতে বৃষ্টি হয়ে পানি বারে তাহলে নৌকা ভেসে যাবে, তাই ছোট নৌকা টেনে প্রায় পুরোটাই ডাঙ্গায় উঠিয়ে ফেলেছে। আমি এখন কী করি ! এতটা টানা নৌকা একা ঠেলে ভাসাব কি করে ? নৌকা এপাশ ওপাশ ঘুরিয়ে মাটির সঙ্গে নৌকার তলা পিছলা করার চেষ্টা করছি হঠাৎ মনে হলো আমার পিছন থেকে কেউ সাহায্য করছে। আমি রাতের শক্তি মনে করে নৌকা ঠেলে দিলাম পানিতে নৌকা চর চর করে পানিতে নেমে গেল। ঘাড় ঘুরিয়ে দেখি পিসি!
আমি বিস্ময়ের ভান করে বললাম তুই ! আমি ভাবলাম হাওরের দেও, তোর বাপে পাঠাইছে।
দেখতাছি নামাইতে পারতাছছ না হের লাইগা ঠেলা দিলাম। নে নাও ভাসা, আমিও যায়াম পুন্যির বাড়িত তোর লগে।

তুই যাইবে মানে ! উম্বা জানতে পারলে তোরে কাইট্টা মাছেরে খাওয়াইব। নাম নাও থাইক্যা। নাইলে আমি
দাদুরে ডাক দিলাম।

ডাক দে, আমি নামতাম না। দেখি তোরা দাদা নাতি আমারে কি করছ ?
এই কাম সারছে, পিসিরত কখনও এমন সুর ছিল না। একেবারে উল্টো সুর। আমি ভ্যবাচ্যেকা খেয়ে গেলাম। বৈঠা হাতে নিয়ে গোবর গনেশের মত দাঁড়িয়ে আছি। পিসি নৌকার মাঝখানে গোড়ার উপর দুই হাত কোলে নিয়ে ঠায় আমার দিকে তাকিয়ে বসে আছে নির্বিকার। যেন আমার বেডাগিরির দৌঁড় আজ সে দেখে ফেলবে। আমি এখন কি করব? ওকে কিভাবে নামাব বুঝতে পারছি না। সারা জীবন ওকে আমি জ্বালিয়ে মারলাম আর আজ কিনা ও আমাকে জ্বালাচ্ছে। স্পষ্ট চাঁদের আলোয় আমাদের কে একটা স্থির চিত্র মনে হচ্ছে। হঠাৎ পিসির কন্ঠ থেকে দৈববাণীর মত বেরিয়ে এল।
আবুঃ পুন্যির জন্য তোর খুব মন কান্দে, না ?

অনেক হারানোর ব্যথায় বিভোর কোন রমণীর সামনে দন্ডিত কোন কিশোর ছেলের ভাস্কর্য হয়ে আমি দাঁড়িয়ে আছি। রমণীর প্রশ্নের উত্তর আমার জানা নাই। প্রশ্নটা যে আমাকে এতটা বিহ্বল করে দেবে আমার ধারণার মধ্যে ছিল না। পিসি এই প্রশ্নটা করে কাকে কার কাছ থেকে আলাদা করতে চাইছে। ও কি পুন্যিদি কে ঈর্ষা করছে ?
স্থিরচিত্র ভেঙ্গে নৌকা সচল হলো। আমি বাইতে লাগলাম হাওরের দিকে, বাড়ির কাছ দিয়ে কচুরিপানার জন্য নৌকা ঠেলতে কষ্ট হয় তাছাড়া কেউ দেখলে অনর্থ বাধবে। এ পাগলামীর দায় পিসির কাঁধেই পড়বে। আমি এবাড়ির একমাত্র উত্তরাধিকার, আর ও এবাড়ির উচ্ছিষ্ট। আমি জন্ম থেকেই শুধু পেয়ে এসেছি আর ও শুধু দিয়েই এসেছে। বাপের বাড়িতে হিন্দু বিধবা একপ্রকার পেট খরচায় বিশ্বস্ত সেবাদাসী। নৌকা এখন একটা বিশাল রুপার থালায় কালো তিলের বড়ার মত ভাসছে। পিসি এখনো স্থির, আমি বললাম ও পিসি ঘুমাস না কি ?
ও ছোট্ট করে বলল- না।
পিসি তুইত জিগাইলে পুন্যিদির জন্য আমার মন কান্দে কি না ? তোর জন্য কান্দে কিনা তাত জিগাইলে
না।
কি জানি এইডা ত মনে হইছে না।
মনে তোর হইছে, এখনো তোর মনে হইতাছে। এই দুঃখে তুই বিছানা ছাইরা উইট্টা আইছছ। পিসি আমি যে তোর কি এইডা আমি জানি, তুই আমার কি এইডা তুই জানছ না। তুই পুন্যিদি আমার দুই চোখের দুই মণি। কোন মানুষ কি কখনও চায় তার একটা চোখ কানা হইয়া যাক। তোরা দুই জনের যা হবার হইছে তবুও আমার সামনে ত আছস। এইডা আমার চোখের আলো। তোদের নতুন কইরা খারাপ কিছু হইলে আমার চোখ দুইডা যে নষ্ট হইয়া যাইব। তোর তবুও ত একটা আশ্রয় আছে পুন্যিদির যে এইডাও নাই। হের লাইগা পুন্যিদির জন্য চিন্তা বেশি করি। আর তোর মনে হয় তোর আবু বুঝি তোরে ছাইরা যাইতাছেগা । না রে ? হাঃ হাঃ হাঃ
নে হইছে অখন দুঃখ ভুইলা একটা গীত গা, কত দিন তোর গীত শুনিনা।
‘‘মরিব মরিব সখি নিচয় মরিব।
কানু হেন গুণনিধি কারে দিয়া যাব॥
তোমরা যতেক সখি থেকো মঝু সঙ্গে।
মরণকালে কৃষ্ণ নাম লিখো মঝু অঙ্গে
ললিতা প্রাণের সখি মন্ত্র দিও কানে ।
মরা দেহ পুড়ে যেন কৃষ্ণনাম শুনে।।
না পোড়াইও রাধা অঙ্গ না ভাসাইও জলে।
মরিলে তুলিয়া রেখো তমালের ও ডালে।।
সেই ত তমাল তরু কৃষ্ণ বর্ণ হয়।
অবিরত তনু মোর তাহে যেন রয়।’’
আরেকটা গা……..
‘‘কলসিতে জল নাই যমুনা বহু দুর ।
চলিতে না পারি আমি চরণে নেপুর।।
ঘরে আছে গুরু জন তারে না ডরাই ।
মনের ভরমে মুই কানুরে হারাই।।
আখিঁর পলকে সখি নিশি না পোহায়
কালারে কহিও সখি জীবনের উপায়।

প্রখর জ্যোৎস্নায় সৃষ্টির সবকিছু যেন একটা মায়াবী চাদরে আবছা ঢাকা পড়ে গেছে। নীরব নীথর চারপাশ, মাঝে মাঝে দু একটা মাছের লেজনাড়ার শব্দ অথবা আমার বৈঠার শব্দ। লিলুয়া বাতাসে ভাসা পানির ঢেউ নাওয়ের তলায় তবলার বোল তুলছে গানের সাথে। ঢেউয়ের পরতে পরতে জ্যোৎস্নার ভরা যৌবন উছলে পড়ছে ঢেউয়ের গায়ে। জল জোছনার এমন রূপময়তা ও ছন্দদ্যোতনায় যে পড়ে তার বাউল না হবার কোন কারণ নাই। এখানে সুর আপন মনে খেলা করে, আর এই খেলায় যে বান্দা পড়ে তার আর সব বাধন ছিন্ন হয়ে যায়। এই জল জোছনাই নিমাই কে সর্বংসহা চৈতন্য বানায় । এই জল জোছনায় রাজপুত্র সিদ্ধার্থ গৌতম বুদ্ধ হয়ে বৃক্ষতলে স্বর্গ পায়। মুন্সি উকিল বাউল হয়, রাধারমন রাধার বিচ্ছেদে পুণজনম লয়। হাওর জ্যোৎস্নায় মরমে কথা কয়। পিসি যেন গান গাইছে চাঁদে বসে। চাদঁ তার জোছনায় সে গান পৌঁছে দিচ্ছে সমগ্র গ্রহময়। মোহাবিষ্ট সকল শ্রোতা তাই নীরব, কেবল চাঁদের পানে চেয়ে পিসিকে দেখছে আর কাঁদছে, আমার চোখ ভিজে গেছে। আমি বুঝতে পারছি পিসি গানের সুরে আসলে কাঁদছে। শরৎ বাবুর শ্রীকান্ত না পড়লে হয়ত পিসির কষ্ট বুঝতাম না। পুন্যিদির জন্য ঘোড়া কিনতে বেহুস হতাম না। নৌকা ঘুরিয়ে দিলাম আমরা এখন হাওরের মাঝ বরাবর। এই শনিবারের রাতে শনির হাওরের মধ্যিখানে পিসিকে দিয়ে রাধার বিচ্ছেদ গাওয়ানো উম্বার নাতির পক্ষেই সম্ভব। সাধারণের নাতিরা যারা আটির কাছাকাছি মাছ শিকার করছে তারা কাল সকালে আটিতে প্রচার দিবে রাতে হাওরের মধ্যে এক পেত্নী সারারাত কেঁদেছে । কিন্তু সত্যি রাতের চাঁদের মায়ার যারা পড়েছে, তারা জানে রাত কত সুন্দর, কত মায়াবী, কত অপার সন্ধানের হাতছানি।

পিসি গান থামিয়ে ফুপিয়ে ফুপিয়ে কাঁদছে। আমি দ্রুত নৌকা বাইছি। নৌকার তলায় এখন জলের ছলাৎ ছলাৎ শব্দ হচ্ছে লিলুয়া বাতাসে। হঠাৎ আমাকে বলল –

আবু ধর তোর দাদু মইরা গেল তোর বাবাও মইরা গেল, আর তুই শিক্ষিত হইয়া টাউনে গেলেগা তখন আমার কি গতি হইব ?
তোরেও টাউনে লইয়া যায়াম, তখন আমি হইবাম তোর বাপ। তারপর আমার মেয়েরে একটা ভাল সৎ পাত্র
দেইখা ধুমধামে বিবাহ দিব।

পিসি এক লাফে এমনভাবে আমার কোলে এসে পড়ল যে কোনভাবে শেষরক্ষা হল। ছোট নৌকা আগা গেল উঠে আর পিছা পানিতে ডুবুডুবু। নৌকা টাল খেয়ে ঠিক হল কিন্তু পিসি যে আমার একেবারে ঠাল। আমি বুঝতে পারছি পিসি এ জগতে নাই সে সম্পূর্ণ রাই বিরহে ভাসছে। আমি পিসির মাথাটা কোলের মধ্যে ঠিক রেখে বললাম-
তুই জানস না পিসি, আমাদের হিন্দু ধর্মে বিধবা বিবাহ আছে, শাস্ত্রে নিষেধ নাই। একথা ঈশ্বর চন্দ্র বিদ্যাসাগর মহাশয় প্রমাণ কইরা বিধবা বিবাহ প্রথা চালু কইরা গেছে। যখন সবাই আমার মত শিক্ষিত হইব তখন দেখিস তোর এই কষ্ট থাকত না।

এইভাবে পিসিকে নিয়ে পুন্যিদির ঘাটে নৌকা ভিড়ালাম। পিসি এখন স্বাভাবিক, তার ঘোর কেটে গেছে। রাই বোষ্টমীর আখড়া থেকে নিশী কীর্তনের সুর ভেসে আসছে কিন্তু সেই সাথে দিদির ঘানির শব্দটা আসছে না। রাত ত এখন পোহাতে অনেক দেরী দিদির ঘানি বন্ধ কেন? এর আগে যত বার এসেছি এসময়ে তার ঘানি ঘোরানো বন্ধ পাই নাই।
ঘাট থেকে উঠেই দিদির শতছিদ্র খড়ের বেড়ার একটি ঘর, মধ্যিখানে বিশাল কুচকুচে কালো শিবলিঙ্গের মত আট পুরুষের প্রাচীন ঘানি। এই ঘরে নামমাত্র একটা পিদিম জ্বলে তার আবার ছায়াও পড়ে।
পুন্যিদি যখন ঘানি ঘোড়াতে শুরু করে তখন ছায়া দেখে মনে হয় মহাকালের খুটির সঙ্গে বাঁধা এক আদিম মানবী নিরন্তর কালপরিক্রমায় ছুটছে কেবল ছুটছে। এ ছুটার শেষ নেই, সীমা নেই ।
পুন্যিদির ঘরে দরজা বলতে কুকুর তাড়ানো একটা আবরণ আছে, সেটা ঠেলে মাথাটা ভিতরে ঢুকিয়ে দেখি, ঘানি থেমে আছে, আর দিদি বিছানার পরে হাটুগেরে বিধ্বস্ত উবু হয়ে নুয়ে আছে। আমাকে লক্ষ্য করেনি, আমি ভিতরে ঢুকে ঘানির টানা দন্ডটা ধরে বললাম, দিদি?

গভীর কোন চিন্তারাজ্য থেকে রাজকন্যা তার অকস্মাৎ সাম্রাজ্য হারানোর শোক থেকে মাথা তুলে ততোধিক অবসাদে ক্লান্ত কন্ঠে বলল — তুই ।
অখনও ত রাইত পোহাইছে না, তোমার ঘানি বন্ধ যে !
শইলডা ভালা না রে ভাই, আইজকা ঘানিতে খাড়া হইতাম পারতাছি না। ঘানি ঘোড়ানোতে জোর পাই না। এক খুচি শইরষা দিছি এক আদল ঘোরায়া একটা দানাও ভাঙ্গতাম পারছি না। উল্ডা মনে হইতাছে শইলের সব হাড় গুড় ভাইঙ্গা যাইতাছে। হের লাইগ্যা ঘানি ছাইড়া ঝিামইতাছি। কাইল কি বেচবাম?
আইজ বোধ হয় আমার কান্নার দিন। দিদির দিকে তাকিয়ে আমার চোখ দিয়ে পানি চলে আসতেছে। দিদি আমার সামনে মাথা নিচু করে বসে আছে। তার শরীরে এতটুকু সামর্থ থাকলে এভাবে থাকার কথা না।

আমি উম্বার নাতি একটু আগেও শনিবারের নিশী রাইতে হাওর দাবড়িয়েছি। এখন আবার এক অসহায় রমণীর কষ্টে কাদঁছি, তাহলে এখন আমি গোপাল কৃষ্ণর পুত্র হয়ে গেলাম।

আমি সব সময় নরম, তবে মাঝে মাঝে ভয়ানক গরম হতে পারি যা আমার নিজের কাছেই অবিশ্বাস্য লাগে। আমার দেহে দুই পুরুষের রক্ত খেলা করে একটি দুখির দুঃখে ব্যথিত করে অপরটি করে বিদ্রোহী। এইবার দ্বিতীয়টি কার্যকর হচ্ছে, আমার হাতের শিরা ফুলে যাচ্ছে, আমার ইচ্ছে করছে একশত মন সরিষা এই নিষ্ঠুর ঘাতক ঘানিতে পিষে নিমিষে তেল করে একটা বিশাল ভাড়ে ভরে দিদির সামনে ধরে বলি এই নাও তোমার তেল। ঘরে বসে রানীর, মত বেচবে, কোনদিন শেষ হবে না। আর গামছা পরে ঘানিতে দাঁড়াবে না। বাবুর হাটের শাড়ি পড়ে বিকাল বেলায় পিসির হাত ধরে বেড়াবে সারাপাড়া জুড়ে। দিদি আমার ভুবন ভোলানো হাসিতে পৃথিবীকে থামিয়ে দিয়ে আমাকে জড়িয়ে ধরে বলবে- আবুরে তুই যে আমারে মহারানী বানাইয়া দিলে।

স্বপ্নের কথা স্বপ্নে থাক, এখন দেখি বাস্তবে কি হয়? দুই হাতে দন্ডটি ধরে বুক দিয়ে ঠেলতে শুরু করে দিলাম। প্রথমে শব্দ হয়নি, দুই তিন ঘোরান দেবার পর সেই পুরনো ঘেচঁর ঘেচঁর ঘেচঁ শব্দটি হতে শুরু করে দিল। পিসি, দিদি এক সাথে হামলে পড়ল আমার পড়ে, যেন আমি কোন দেশের এক মহা নবাব পুত্তোর এক বিরাট অশৌচের কাজ করে ফেলেছি। দুই দিকের দুই নারী দৈত্য আমাকে এমন ভাবে পেচিয়ে ধরল যে আমার একেবারে না নড়ন চড়ন। আমি খুব নরম করে বললাম দিদি ছাড় আমারে, আমি পারবাম, আমি এখন বড় হইছি না ? আইচ্ছা না পারলে থইয়া দিয়াম যাও ।
দিদি উৎকন্ঠিত গলায় বলল- ভাই, আমি যে ছুডু জাত। এইডা আমরার জাত কাম। আভাগ্যা কপাল তুই লেখা পড়া শিখ্যা বড় বিদ্বান হইবি, তুই এই কাম কেনে করতে? তুই বড় হইয়া চাকরি কইরা একটা ঘোড়া কিইন্যা দিলেই ত আমার সব কষ্ট নাই।

আমার বুঝতে বাকি রইল না এদের গায়ে এক বিন্দু রক্ত থাকতে আমাকে ঘানি টানতে দিবে না। আমার হাত যত নরম হয় ওদের হাত তত শক্ত হয়। আমাকে টেনে নিয়ে বিছানায় বসিয়ে দিলো। দিদি তার স্বমূর্তিতে ফিরে গেল। পিসি যতটা সম্ভব নিজের জাঁত বাচিয়ে দিদিকে সাহায্য করতে লাগল। দিদি তার রোগ শোক চিন্তা সব ভুলে গেল।

(চলবে)

ব্রাত্য রয়

ব্রাত্য রয়

জন্ম ২৫ মে ১৯৭৩, মোহনগঞ্জ, নেত্রকোনা।পেশায় কলেজে অধ্যাপনা (প্রভাষক, রয়েল মিডিয়া কলেজ, ময়মনসিংহ।)

আগ্রহ কবিতা, গল্প, প্রবন্ধ ও উপন্যাসে। 

প্রকাশিত গ্রন্থ-
উপন্যাস- নাম পুরুষ ( ২০১৮)

প্রবন্ধ- গুরু পুঁছিও জানো (২০১৯), খেরোয়াল (২০১৯), আপন আরশিতে অচেনা আনন (২০১৮), তৈল সংহার (২০১৮), ইতি পাতি রাজ হাস (২০১৭), আপ্তবাক্য (২০১৭), বাঙাল ধর্মত্ত্ব (২০১৬)

ই-মেইল : bratyoroy@gmail.com 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

%d bloggers like this: