জল হিজল অনল – ৫ম পর্ব

চতুর্থ পর্ব প্রকাশের পর হতে.

পিপ্যা, কাইল্যা , ঘনা, বিশু রীতিমত আমাকে প্যাঁচিয়ে ধরলো। লেডু কি ? যেহেতু আমি মোহনগঞ্জ থাকি তাই লেডু দেখেছি এবং শুনেছি। তাই লেডুর বিবরণ আমাকে দিতে হবে। আমি সত্যি বললে লেডু (রেডিও) একবার দেখেছি কিন্তু কিভাবে চালাতে হয় তা জানি না। কিন্তু এদের কাছেত আর একথা বলা যাবে না । তাই যতই একটা কিছু বোঝাতে যাই ততই ওরা হা হয়ে থাকে । আসলে দেখাটুকুর বাইরে বলার তেমন সাধ্য কই যে বুঝিয়ে বলব? এই যেমন থোর বড়ি খাড়া , খাড়া বড়ি তোর। আমি যতই এদের কে সিনেমার গল্পের দিকে নিয়ে যেতে চাই ওরা ততই রেডিওর বিবরণ শুনে নিতে চায়। শেষে এই রফা হল বিয়ে বাড়িতে গিয়ে আমি লেডু চালিয়ে এদের শোনাব।

পুরো গয়নার নাও ভর্তি আমরা বরযাত্রী। বিভিন্ন দলে বিভক্ত হয়ে তাসে, বিড়িতে জম্পেস চলছে। পড়ন্ত বেলা, সন্ধ্যে নাগাদ আমরা বিশরপাশা পৌঁছে যাব। নৌকার একেবারে সামনে দাদু বরের মাতুলের সঙ্গে বসে আছেন বেশ গাম্ভীর্য নিয়ে। যেন রায় বাড়ির বিশেষ প্রতিনিধি হিসেবে তিনি এ বিয়ের নৌকায় উঠেছেন । তার সাথে আড্ডা দেয়ার মত সমকক্ষ কেউ নেই। তাই ভিনদেশী মাতুলকেই তিনি আপাত সঙ্গী করেছেন। বাবা আড্ডায় বসে গেছেন, এদিকে আমিও । তবে বাবার মধ্যে কোন ভিন্নতা নেই , যা আছে আমার এবং দাদুর মধ্যে। দাদুর গায়ের ধুতি পাঞ্জাবী পুরনো হলেও বুঝা যায় এগুলো কোন সাধারণ গঞ্জের দোকানের মাল নয়। এ কোলকাতার অভিজাত দোকানের । যদিও এগুলো রায় বাবুর সেকেন্ডহ্যান্ড তাতে কী দামে ত আর যেনতেন নয়। আমিও বন্ধুদের মাঝে একটা শিক্ষিতের অহংকারী ভাব নিয়ে যতটা পারা যায় ঠাঁঠ বজায় রাখার চেষ্টা করছি। ওরা দলা পাকিয়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে বসেছে। আমি কিন্তু আসন করে শালিন ভাবে বসেছি। যদিও কষ্ট হচ্ছে, পা টানটান করছে, তবুও আসন ভাঙছিনা। আমরা তিন পুরুষ এই বিয়ের বরযাত্রী, আমরা কেউ লেডু শুনিনি । আজ এ জিনিসটি অসম বয়সের তিনটি মানুষ এক সঙ্গে দেখব, শুনব। আমি আর দাদু হয়ত স্বীকার করব না যে আমরা দেখিনি, বাবা বলে ফেলবেন তিনি দেখেননি। কিন্তু আমি জানি আমরা কেউ শুনিনি।

সন্ধ্যা নেমে পড়েছে তবে আকাশে চাঁদ আছে এবং তা মেঘমুক্ত। পরিমল কাকার কপাল ভালো হয়ত তার বিয়েটা বৃষ্টি বিঘ্নিত হবে না। নৌকা কনে বাড়ির ঘাটে পৌঁছার আগে থেকেই একটা ডেব ডেবার ডেব বাদ্য শোনা যাচ্ছিল তা এখন বেশ জোরে শোরে বাজাচ্ছে। নৌকা ঘাটে ভেড়ার সাথে সাথে হুলস্থুল পড়ে গেল জামাই তোল, বরযাত্রী তোল, গেইট ধর। খানা পিনা ভদ্রতা এদিকে আমি দাদুর হাতে ধরা পড়ে গেলাম। একজন সঙ্গীতে তার পোষাচ্ছিল না তাই আমাকে নিয়ে দলটা আরেকটু ভারি করলেন। চামড়া কুচকে গেছে অথচ হাড়ের চাঁপে মনে হচ্ছে সাঁড়াসি দিয়ে ধরেছেন। বেশ বুঝতে পারছি ফসকে যাবার কোন সুযোগ নেই। বন্ধুরা আশপাশে পায়তাড়া করছে কিন্তু কাছে আসার সুযোগ নাই। আমি অবরুদ্ধ অথচ আমার খারাপ লাগছে না। উমেদ বংশীকে সবাই খাতির যত্ন করছে সেই সাথে তার নাতি কি করছে তাও জিজ্ঞেস করছে। দাদু বেশ গর্বের সাথে বলছে তার নাতি মোহনগঞ্জ পাইলট স্কুলে পড়ে। তাতেই আহাঃ বেশ বেশ, তার সাথে বড় জোর কোন ক্লাস? রোল নাম্বারের দিকে কেউ এগুতে সাহস করে না। আমার যেন আনন্দ আর ধরে না।

লগ্ন সমাগত ঠাকুর মশাই বর আহবানের জন্য চিৎকার করছেন। বড় উঠান জুড়ে সবাই বসেছেন। বর কলা গাছের তলায় তার নির্ধারীত চেয়ারে বসেছেন, নকল রাজার মত। আর আমরা যেন তার পাত্রমিত্র পারিষদ বর্গ।

বর পক্ষের দাবিকৃত সকল সামগ্রীই উপস্থাপন করা হচ্ছে কিন্তু সব গতানুগতিক । যে নতুন চমক দেখার জন্য আমরা ছেলে বুড়ো সব উদগ্রীব সে জিনিসতো বের হচ্ছে না। এক পযার্য়ে কনে পক্ষের একজন নতজানু হয়ে সভার উদ্দেশ্যে হাত জোড় করে বললেন, আমরা এই পর্যন্ত যোগাড় করতে পেরেছি আপনারা গ্রহণ করুন। যেন এক ঝাক নীরব কাকের মাঝে একটা কাক মরে গেল। এক সাথে চর্তুদিকে কা কা কা রব উঠে গেল। আর কে শোনে কার কথা। সবগুলো মানুষ যেন মনুষ্যত্ব ভুলে কাক হয়ে গেল আর কা কা ভুলে লেডু লেডু করতে লাগল। লংকা কান্ড বেঁধে গেল। এক প্রস্থ মিষ্টি খাওয়া হয়েছে, ভাত বুঝি আর খাওয়া হলো না। তবে পিটুনি খাওয়ার সম্ভাবনা ক্রমশ বাড়ছে। এদিকে বর উঠে পরার চেষ্টা করছে আর ঠাকুর কর্তা তাকে চেপে ধরে রেখেছেন। এমতাবস্থায় বর নুনু দেখিয়ে বলল যে তাকে একবার মুত্র বিসর্জনের সুযোগ না দিলে ম্লেচ্ছ কান্ড ঘটে যাবে। ঠাকুর বরকে ছেড়ে দিলেন। এখন বরের আসন শূন্য।

দাদুর একপাশে আমি অপর পাশে মাতুল। দাদুর চেহারা ক্রমশ শক্ত হয়ে উঠছে। সাথে ত মুগুর আনেননি এখন না আবার আমাকেই মুগুর বানিয়ে ফেলেন। দাদু বরের মাতুলকে বললেন কনের পিতাকে এখানে আসতে বলেন। মাতুল দীর্ঘক্ষণ পরে বিধ্বস্ত কনের পিতাকে কোত্থেকে ধরে এনে দাদুর সামনে দাঁড় করালেন এবং দুই জন এক সাথে হাফাতে লাগলেন। গোলমাল এত তীব্র হয়েছে যে এখন কারো কথা আর পরিষ্কার বোঝার উপায় নেই। এক জনের কথাকেই পাচঁজনের কথা মনে হচ্ছে। বিশেষ করে বর বান্ধবরা এত উচ্চ কন্ঠ যে তাদের বউ লাগবে না আগে লেডু দাও।

উমেদ বংশী বহুদিন পর আবার তার রাতের রূপ দেখালেন। একটা হুঙ্কার ! যেন একটা সাইরেন, যেন একটা এটম বোমা। এখনি সব তছনছ করে দিবে না থামলে। “শ কাউয়া এক বারুক ” গ্রাম্য এই প্রবাদটির মতই পরিবেশটি নিমেষে শান্ত হয়ে গেল। যেন একটু আগে একটা ভূমিকম্প হয়েছে। এখন সব বিধ্বস্ত তবে শান্ত। উমেদ বংশী তার গুরু গম্ভীর কন্ঠে ভাষণ শুরু করে দিলেন বসে থেকেই।

দাদুর একপাশে আমি অপর পাশে মাতুল। দাদুর চেহারা ক্রমশ শক্ত হয়ে উঠছে। সাথে ত মুগুর আনেননি এখন না আবার আমাকেই মুগুর বানিয়ে ফেলেন। দাদু বরের মাতুলকে বললেন কনের পিতাকে এখানে আসতে বলেন। মাতুল দীর্ঘক্ষণ পরে বিধ্বস্ত কনের পিতাকে কোত্থেকে ধরে এনে দাদুর সামনে দাঁড় করালেন এবং দুই জন এক সাথে হাফাতে লাগলেন। গোলমাল এত তীব্র হয়েছে যে এখন কারো কথা আর পরিষ্কার বোঝার উপায় নেই। এক জনের কথাকেই পাচঁজনের কথা মনে হচ্ছে। বিশেষ করে বর বান্ধবরা এত উচ্চ কন্ঠ যে তাদের বউ লাগবে না আগে লেডু দাও।

উমেদ বংশী বহুদিন পর আবার তার রাতের রূপ দেখালেন। একটা হুঙ্কার ! যেন একটা সাইরেন, যেন একটা এটম বোমা। এখনি সব তছনছ করে দিবে না থামলে। “শ কাউয়া এক বারুক ” গ্রাম্য এই প্রবাদটির মতই পরিবেশটি নিমেষে শান্ত হয়ে গেল। যেন একটু আগে একটা ভূমিকম্প হয়েছে। এখন সব বিধ্বস্ত তবে শান্ত। উমেদ বংশী তার গুরু গম্ভীর কন্ঠে ভাষণ শুরু করে দিলেন বসে থেকেই।

অনেক বাহাদুরির কথাই শুনিলাম এইখানে বসিয়া থাকিয়া। তবে এখানে আমরা বিবাহের নিমন্ত্রণে আসিয়াছি। মল্লযুদ্ধ করিতে নয়। বৈবাহিক সর্ম্পক করিতে আসিয়াছি, শত্রুতা করিতে নয়। আপনাদিগের ঘরের কন্যা আমাদিগের ঘরে যাইবে এরজন্য মানসম্মান বজায় রাখিয়া উপযুক্ত আয়োজন আপনারাও করিয়াছেন আমরাও করিয়াছি। অকস্মাৎ একী অসভ্যতা ! বাহু বলের প্রশ্ন এখানে অবান্তর। আমি উমেদ বংশী আজ বৃদ্ধ, তাহার পরেও যদি মনে করি আমরা বিয়ে না করাইয়া বর নিয়া চলিয়া যাইব ত যাইবই। শুধু বিশরপাশা কেন? ফুলভরী, যশোদল, বাদুরপুর, চান্দের গাঁও এরকম দশ গাঁেয়র শক্তি আমি মাপিয়া রাখিয়াছি। বাহাদুরপুরকে বাদুরপুর বানিয়েছে এই উমেদ বংশী। তাই আমি বলিব এই ধরনের উস্কানি মুলক কথায় বিবাহ হইবে না। আমার প্রস্তাব আপনারা ঘটনাটি সবিস্তারে খুলিয়া বলুন এক জনে আর আমাদের পক্ষে যেহেতু আমি কথা কহিতেছি তাই আর কারো কথা বলিবার দরকার নাই।

সুন্দর প্রস্তাব, সুন্দর প্রস্তাব বলে সকলেই একমত। কিন্তু কনের বাপ এতটাই আতঙ্কিত যে বেচারার মুখ দিয়ে কোন কথা আর সরছে না শেষে তার শ্যালক মেয়ে পক্ষের হয়ে কথা বলতে এলেন।

প্রথমেই সভার মধ্যে ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি, এখানে আজকের এই গন্ডগোলের মূল বিষয় যৌতুকের একটি সামগ্রীর অনুপস্থিতি। এই সামগ্রীটি আমার কিনবার কথা ছিল কারণ আমি মোহনগঞ্জ থাকি। এই বিয়ে যখন ঠিক হয় তখন দেশে আন্দোলন চলছে কিন্তু স্বাধীনতা সংগ্রাম শুরু হয়ে যায়নি। কিন্তু এখন স্বাধীনতা সংগ্রাম পুরোদমে চলছে সারাদেশে। শহরের দোকান পাট ঘরবাড়ি পুড়িয়ে শেষ করা হচ্ছে। মিলিটারি মানুষ দেখা মাত্র গুলি করে মারছে। আওয়ামি লীগ আর হিন্দুরা তাদের ঘরবাড়ি সহায় সম্পদ ফেলে শুধু জীবন হাতে নিয়ে সীমান্ত পার হচ্ছে। আপনাদের কাছে অবিশ্বাস্য মনে হতে পারে। আপনাদের দুর্গম যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং কৃষি নির্ভর জীবন আপনাদের সহায় হয়েছে। এই অঞ্চলে কোন শহর নাই, কোন রাস্তা নাই, সর্বোপরি কোন রাজাকার নাই। তাই মিলিটারিও নাই। তাই সমগ্র দেশের কী অবস্থা এখানকার এই বিশাল হাওরের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র গ্রামে বসে তা আন্দাজ করা সম্ভব নয়। আজ সারা দেশের মানুষের এক হাতে জীবন অন্য হাতে স্বাধীনতার অস্ত্র। এই যখন অবস্থা তখন একটা রেডিও আমি কি ভাবে কিনবো। এটাত বড় শহর ছাড়া পাওয়া যায় না। তবুও আমি রওয়ানা হয়েছিলাম কিন্তু বারহাট্টা পর্যন্ত গিয়ে ফিরে এসেছি আর এগুবার সাহস পাইনি। আমার ছোট দুটি সন্তানের কথা মনে পড়ে গেল। কত মানুষ গুলি খেয়ে মরছে, কত মানুষ না খেয়ে মরতেছে। মা গঙ্গা যেন নিজে পাহারা দিয়ে আপনাদের সুরক্ষা দিচ্ছে। শহরে অনেক ধনী পরিবার সিন্ধুক ভর্তি টাকা কিন্তু না খেয়ে দিন কাটাচ্ছে জীবনের ভয়ে বাইরে বের হতে পারছে না। ইজ্জত হারানোর ভয়ে চোরের মত লুকিয়ে আছে।

জলটোপরের মানুষ এই প্রথম যুদ্ধের ভয়ে আতঙ্কিত হলো। অনেকের তখনও বিশ্বাস হচ্ছে না। লেডু না দেওয়ার মতলবে যুদ্ধের ভয় দেখান হইতেছে। আমিতো ফাল্গুন মাস মনগঞ্জ ত আইলাম। বর পক্ষের কেউ কেউ মৃদুকন্ঠে এমন মন্তব্য করতে শুরু করলেন।

উমেদ বংশী বললেন- কথা সইত্য, আমার প্রৌত্রও বাড়ি চলিয়া আসিয়াছে মাসেকের উপরে। আমিও প্রথম বিশ্বাস করিতে পারি নাই, পরে খবর নিয়া জানিয়াছি দেশের অবস্থা ভয়াবহ। সারা দেশের মানুষের যখন জীবনপণ যুদ্ধ চলিতেছে তখন আমরা বিবাহ করেতেছি। আমরা কী করিয়া বুঝিব লেডু ক্রয় করা সম্ভব হইলো না কেন ? এই পরিমলকে ডাক শুভ বিবাহটা সম্পন্ন করা হউক। দেশ স্বাধীন হইলে তার লেডু কেনা যাইবে। গোলা ভরা ধান, গোয়াল ভরা গরু, হাওর ভরা মাছ সবই ত মজুদ আছে আমরা যুদ্ধ বুঝিব কি করিয়া ?

বর কে নৌকা থেকে তুলে আনা হলো বেচারার মুখ তখনো ভার। বোঝাই যাচ্ছে তার বিয়ের আনন্দটাই মাটি হয়ে গেছে। আমার তেমন খারাপ লাগছে না বরং বেঁচে গেছি এমন একটা ভাব এসে গেছে। এই ভরা মজলিসে যদি চালাতে না পারতাম তবে কী লজ্জাই না পেতাম। তবে লেডু শুনা হলো না। সবাই একটা চমক থেকে বঞ্চিত হলাম। ওরা যদি আমাদের কেবল একবার শুনার একটা সুযোগ দিত, আমার মনে হয় তাহলেও কাজ হত।

(চলবে)

ব্রাত্য রয়

ব্রাত্য রয়

জন্ম ২৫ মে ১৯৭৩, মোহনগঞ্জ, নেত্রকোনা।পেশায় কলেজে অধ্যাপনা (প্রভাষক, রয়েল মিডিয়া কলেজ, ময়মনসিংহ।)

আগ্রহ কবিতা, গল্প, প্রবন্ধ ও উপন্যাসে। 

প্রকাশিত গ্রন্থ-
উপন্যাস- নাম পুরুষ ( ২০১৮)

প্রবন্ধ- গুরু পুঁছিও জানো (২০১৯), খেরোয়াল (২০১৯), আপন আরশিতে অচেনা আনন (২০১৮), তৈল সংহার (২০১৮), ইতি পাতি রাজ হাস (২০১৭), আপ্তবাক্য (২০১৭), বাঙাল ধর্মত্ত্ব (২০১৬)

ই-মেইল : bratyoroy@gmail.com 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

%d bloggers like this: