জল হিজল অনল – ৪র্থ পর্ব

তৃতীয় পর্ব প্রকাশের পর হতে..

আবু , আবু ও আবু উঠ , উইঠ্যা নাওডা দিয়া তোর পিসিমারে লইয়া ঠাকুর বাড়িত থাইকা একটু শান্তি লইয়া আয়গা। যা তাড়াতাড়ি দেরি করিস না।
ইস ইচ্ছা ছিল না মোটেও এত সকালে ঘুম থেকে উঠার । শরীরটা অবস লাগছে, কাল জেদের বশে তিন ঠেইঙ্গার পিছনে লাগছিলাম । রাতে বেশ ভালই টের পেয়েছি আসলে কে কাকে দৌঁড়িয়েছে। কিন্তু মা মুখে যেমন একবার শান্তি আনার দায়িত্ব আমাকে দিয়েছেন তখন নৌকায় না তুলে দিয়ে তার আর শান্তি নাই।
উঠ, কাইল্যা বাড়িত নাই তরেই যাওন লাগব বাপ।

উঃ উঠতাছি ত , তুমি একটা কিছু একবার আরম্ভ করলে আর থাম না। রাজ্যের বিরক্তি নিয়ে উঠলাম নৌকায় । পিসিটাকে একটা ভ্যাচকি দিয়ে বললাম উঠ নৌকায়। ও তার স্বভাব সিদ্ধ হাসিতে দাঁত বের করে লাফ দিয়ে নৌকায় উঠে নৌকার গোড়ায় বসে পড়ল। হাটুর উপর দুই হাত রেখে তার তালুতে কাসার ঘটি ধরে বসে রইল।
আমি বৈঠা চালিয়ে যেতে যেতে বললাম আইজ কি রে পিসি ?
পিসি বলল আইজ আমরার শুদ্ধ্, বারহাট্টার বাবুদার যে ছেড়ি হইছে আইজ এক মাস পূর্ণ হইছে, আতুর ঘর থাইক্যা বড় ঘরে উঠব। আইজ আমরা শান্তি লইয়া শুদ্ধ হইয়া যায়ামগা।
আচ্ছা পিসি শান্তি কি দিয়ে বানায় রে ?
তিল, তুলশি,গঙ্গাজল আর লগুনের মন্ত্র ।
তুই তাইলে বানাচ না কেরে ? তাইলে ত ঠাকুর বাড়িতে যাওয়া লাগে না।
দুর বেক্কল আমি কি বাম্মন ? আমার কি লগুন আছে? বাম্মন ছাড়া আর কেউ শান্তি বানাইত পারে না।
তুইত বাম্মনই। পুর্ণিমা করছ,একাদশী করছ, অম্বুবাছি করছ। আরও কতকি খাচ না। পেয়াজ, রসুন, মাংস, বিস্কুট, ডিম।
পিসি আমার ওয়াক ওয়াক করে বমি করার জন্য প্রস্তুত হয়ে গেল। তারপর নৌকা থেকে এক হাতে জল তুলে সম্পূর্ণ মুখটা কয়েকবার ধুইল। তারপর রাজ্যের বিতৃষ্ণা নিয়ে আমার দিকে তাকল। যেন তার জন্য এইসব নিষিদ্ব খাবার আমি একসাথে তার মুখে ঠেসে ধরেছি।
আবু আইজ বাড়িত যা , যদি বাবারে না কইছি , তরে এইতা পড়া হিখাইতাছে ?
কিন্তু আমি ত জানি তুই তোর বাবারে কইতে না। তোর বাবা আমারে মারলে তোর সহ্য হইব ? মনে আছে, তোর ফিরাযাত্রার সময় তোর বাপ তোর লাইগ্যা আমারে মারতে না পাইরা তোর এক মুঠ চুল টাইন্যা ছিইরা ফালাইছিল।
তাইলে বৌদিরে কইয়াম।

পিসি তুই লেখাপড়া জানস না, নাইলে তোরে বই পইড়া দেখাইতাম। শরৎ চন্দ্র কইছে এইতা বাইল। খালি মেয়ে মানুষেরে শাস্তি দেয়ার ফন্দি।
হইছে তর পন্ডিতি , তাড়াতাড়ি নাও বা, দেরি হইতাছে , বৌদি আমার লাইগ্যা বইয়া থাকব। আমি
শান্তি লইয়া যায়াম তে সবাই শুদ্ধ হইব, তে রান্দা হইব। দুপুরে খাইতে না ?
আমি বৈঠাটা নৌকায় তুলে রেখে বললাম না খাইতাম না , বাড়িত যাইতাম না, তোরে সারাদিন নৌকাত বওয়াইয়া রাখবাম।
লক্ষ্মী বাপ আমার , যা তর কথাই ঠিক বৈটা ধর।
আমি বললাম; ঔ হুন, ঠাকুর বাড়ির শান্তির কারখানায় অশান্তির আগুন লাগছে ।

“ আমারে বুঝাছ- এমনে আর হেমনে,
পাইতলা ভাইঙ্গা মাছ গেছেগা ঝুল রইল কেমনে ?”
আভাগ্যার বেডি, চুলডি কিতা আমার বায় বাতাসে পাঁকছেনি, হিঃ!
“হুনছিলাম না হাতে গুতে হুনাইলো আমার বইন পুতে। ”

এই পর্যায়ে আমাদের নাও ঠাকুর বাড়ির ঘাটে লাগল। ঠাকুরাইন ঘাটে বসেই বাসন মাঝতেছেন আর রেকর্ড বাজাচ্ছেন। পিসিকে দেখে ভলিউম আরও বাড়িয়ে দিলেন। পিসিকে সাক্ষী রেখে আপন মনে বলতে শুরু করলেন ; দেখ লো মালতি, কাইল সারা দিন একাদশী করছি, আইজ পারনার রান্ধনের লাইগ্যা উগার গেছি। গিয়া দেখি আউল্যার চাউল ঠুলিত নাই। বউরে জিগাইছি কি গো বউ আউল্যার চাউল গেল কই ? আমারে কয় মা, ঠুলির ভিতরে চিকা ঢুইক্যা চাউল নষ্ট কইরা ফালাইছে। গন্ধ করতাছে দেখ্যা ফালাইয়া দিছি।
“আভাগ্যার কপাল নিভাগ্যার বাডা।’’
অত সুন্দর চিকনের চাউলডি তাই ফালাইয়া দিছে। হেইদিন যে তর বড় বইনজামাই আইছে আর মিষ্টান্ন কইরা খাওয়াইলে , আমি কি আর বুঝছি না এই মিষ্টান্ন কোন চাউলের । একবার এই বুড়া মানুষটার কথা চিন্তা করলে না!

চিকন চাউলের দুঃখে ঠাকুরাইনের যতটা না চোখের পানি পড়ছে তার চেয়ে বেশি পড়ছে নাকের পানি। হরিযোগে মহাযোগ হইছে, উপযুক্ত বক্তার উপযুক্ত শ্রোতা হইছে। আজ দুপুর গড়াবে। এই বুড়া বামনি আজ সমস্ত চিন্তা পিসিকে দিয়েই করাবে। আমি কেটে পড়ি, পাড়ে উঠেই পূর্ণিমা দিদির বাড়ির দিকে হাঁটা শুরু করলাম। না খেচঁর খেচঁর শব্দ শোনা যাচ্ছে না। তাহলে কি দিদি এই ব্যবসা ছেড়ে দিয়েছে? ঘরে উঁকি মেরে দেখি দিদি উবু হয়ে বোতলে তেল ঢালছে। দরজা ধরে ডাক দিলাম পুন্যি দি? ঘাড় বাঁকিয়ে আমাকে দেখে এভাবেই বললেন আয়, ঘরে আয়। ঘরে ঢুকে দিদির মাটির বিছানায় বসে সেই বরাবরের মত বোকার মত প্রশ্নটা করলাম না। আজ নতুন প্রশ্ন করলাম-
পুন্যিদি তোমার ব্যবসা কেমন ?
দিদি বলল, বালাই।
তোমার ঘোড়া কেনার টাকা জমেছে ?
না রে: আমি বোধ হয় এক জন্মে আর একটা আস্তা ঘোড়া কিনতে পারতাম না। ভগবান আমারে এ জগতে ঘোড়া করে পাঠানের চিন্তাই প্রথম করছিলেন পরে কোনডা ভাইব্যা আবার বিধবা মানুষ ঘোড়া কইরা পাঠাইল বোঝলাম না।
তোমার তেল ভাঙ্গা শেষ ?
হ শেষ, দেখছ না বেইল উইঠ্যা পড়ছে।
না, দিদির সঙ্গে সেই আগের মত কথা জমছে না । কেমন পর পর লাগছে, দিদি, দিদির তেলের ঘানি, ভাঙ্গাঘর সব ঠিক আছে তারপর ও কেমন খাপছাড়া লাগছে। সেই পুরনো কথা গুলো মনে হচ্ছে কিন্তু কেমন যেন আজ এগুলো অর্থহীন লাগছে।

দিদি মধ্য রাতে তার ঘানি চালু করত এবং সূর্য উঠার পরে বন্ধ করত। এই সময়টুকুর মধ্যে সরষে থেকে যেটুকু তেল তিনি বের করতে পারতেন তা দিয়ে তার পরের দিনের জন্য প্রস্তুত থাকতে হতো। ঘানি ঘোড়ানোর সময় শরীর ঘামে আর ঘামে কাপড় ভিজে দ্রুত ছিড়ে যায়। তাই দিদি ঘানিতে উঠত গামছা পড়ে, তারপর চোখ বাঁধা ঘোড়ার মত ঘানি ঘোরাতে ঘোরাতে তার সূর্যোদয় হত। আমি বর্ষাকালে ভোরে আম কুাড়াতে বা মাঘের শীতে বড়ই কুড়াতে তার একই চিত্র দেখতাম বছরের পর বছর। আমার কাছে পুন্যি দিদি মানেই এক হত দরিদ্র অসহায় ঘানি দৌঁড়ানো মহিলা। অনেক সময় বড়ই কুড়িয়ে দিদির ঘরে শুয়ে থাকতাম। তার দিকে তাকিয়ে থেকে ভাবতাম যদি দিদিকে একটা ঘোড়া কিনে দিতে পারতাম , দিদিকে একটা দামী শাড়ি কিনে দিতে পারতাম। দিদিকে কেন আমাদের বাড়িতে নেয়া যায় না ? পিসি আর দিদি এক সঙ্গে থাকত । দিদির কেউ নাই বলেই কি তাকে এভাবে শাস্তি পেতে হবে। দিদির গরম কাঁথায় শুয়ে থেকে এমনি সব নানান প্রশ্ন করতাম দিদি হেসে উত্তর দিতেন আর বলতেন তুই বড় হ। তুই বড় হলে শহরে বড় চাকরি করবি, তোকে একটা সুন্দর বউ বিয়ে করাব। তারপর তোর বউ রাঁধবে আর আমি শুয়ে বসে খাব। আমি তখন এগুলো বিশ্বাস করতাম এই বড় হওয়ার কথা ভেবেই দিদির কষ্ট ভুলতাম।

আজ মনে হচ্ছে এসব ফাঁকি। ছেলে ভোলানো কথা আর চলে না। আজ যে বিছানায় বসেছি সেখানে শুয়ে পড়তে পারছি না আগের মত। কেমন যেন নিজেকে অপরাধী লাগছে।
পিসী এসে আমাকে বাচিঁয়ে দিল, বলল উঠ এইখান বইয়া রইছছ দেরী হইতাছে আইজ বৌদি ঘরে উঠতে দিত না। আমি পিসির দিকে না তাকিয়ে সোজা বললাম পুন্যিদি তুমি ত আমরার পাড়াত যাইবা তেল লইয়া, তইলে আমরার সাথে লও। পিসি আকাশ থেকে পড়ল। বলল- আমার হাতে শান্তি দেখতাছচ না ! এই নাও পুন্যি উঠব কেমনে ? পুন্যি দি সাথে সাথে বলে দিল না, না তোরা পাড়ায় আইজ কেউ তেল নিত না , আমি যাইতাম না, আবু তুই যা গা। আরেক বার আইছ।
আমি গোঁৎ গোঁৎ করে নাওয়ে উঠলাম । পিসি নৌকায় উঠে বসল। আমি খুব দ্রুত নৌকা বাইতেছি তার পর হঠাৎ বৈঠা ফেলে এক লাফে পিসির কোল থেকে ঘটিটা নিয়ে গাঙ্গের পানিতে একবার চুবিয়ে তুললাম। পিসি হায় হায় করতে লাগল। ছইছ না তুই সান করছছ না। হা ভগবান ওখন কি হইব! শান্তিডা নষ্ট করছছ, ঠাকরাইন আরেকবার দিত না।

আমি বললাম একদম চুপ। তোর ঠাকরাইন তোরে যে শান্তি দিছে, সান কইরা দিছে ? তোর ঠাকরাইন এইডা গঙ্গা দিছে না গাঙ্গের পানি দিছে তুই দেখছছ ? পন্ডিতনির ঘরের পন্ডিতনি, পুন্যিদি নাও উঠলে তোর গঙ্গা নষ্ট হইয়া যাইব । পুন্যি দি কাম কইরা খায় ? ঘানি টানে ? হের লাইগ্যা।

পিসি ভয়ে ভয়ে বলল, এরা নু কৈর্বত্য।
আমি আরও রেগে বললাম , তোর বুইড়া বাপের মাথা ! মরা আর বিধবার জাত কী ! এক বিধবা আরেক বিধবার কষ্ট বুঝছ না। বেচারার কেউ নাই তাই কাম কইরা খায়, হেরলাইগ্যা হে ছুডু জাত ! তোর বাপ ভাই যদি মইরা যায় তাইলে তুই কি হইবি হেইডা ভাবছচ ?

পিসি গাঙ্গের গঙ্গায় নষ্ট শান্তি কোলে নিয়ে বসে অঝোর নয়নে কাদঁছে, কারণ বাড়ি গিয়ে বলতে পারবে না যে আমি এই কান্ড করেছি। আবার যদি না বলে তাহলে এই নষ্ট শান্তি দিয়ে সে কিভাবে সবাইকে শুদ্ধ করবে। বিষয়টা পরে জানাজানি হলে তার আর উপায় থাকবে না। উভয় সঙ্কটে পরে তার অবস্থাটা হয়েছে দেখার মত । একটা আশু সমাধানের চেষ্টায় সে উদগ্রীব হয়ে আমার দিকে তাকিয়ে আছে।
আমি অত্যন্ত বিজ্ঞের মত বললাম শোন পিসি গীতায় আছে গঙ্গা হচেছ সর্বাবস্থায় পবিত্র , গঙ্গা জল কখনো নষ্ট হয়না বরং গঙ্গা সকল অপবিত্রকে পবিত্র করে, আর মরার যেমন জাত নাই, বিধবারও জাত নাই। তোরা হচ্চিস স্বর্গের পুষ্প, স্বর্গে চলে যাবি। পৃথিবীতে তোদের রাখা হয়েছে সামান্য কিছু পাপের প্রায়শ্চিত্য করার জন্য।

আমার বয়ানে যথেষ্ট কাজ হয়েছে । বইয়ের ভাষায় বলাতে সে মনে করল সত্যি এগুলো শ্রীমদ ভগবদ গীতার ভাষ্য। তাঁর শিক্ষিত ভাতিজা এসব পড়ে সত্যিই ন্যায়রত্ন হয়েছে। পিসির মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল। সে বলল তাইলে এইডি আগে কইলে না কেরে পুন্যিরে লইয়া আইতাম। আমি বললাম থাক পুন্যির দুঃখে তোর আর কাঁদতে হবে না। ওখন চোখের পানি মুছ হাইস্যা হাইস্যা বাড়িত উঠবি। পিসি আমার মেঘভাঙ্গা সূর্যের হাসির মত ঝলমলিয়ে উঠল। আমি স্বগত ভাবেই বললাম দেখিস একদিন আমি একটা ঘোড়া ঠিক পুন্যিদিকে কিনে দিব। যুদ্ধটা শেষ হলেই স্কুল খুলবে। তারপর দুইটা টিউশনি নিব, তার পর এই টাকা জমিয়ে দিদিকে একটা ঘোড়া কিনে দিব। সেই ঘোড়ার পিঠে চড়ে সোজা দিদির বাড়িতে উঠব।
পিসি বলল; আবু তাইলে আমারে কিছু দিতে না ?
দিব পিসি তোকেও দিবো, তোর জন্য একটা সত্যি পিসে মহাশয় নিয়ে আসব।
ধুর মুখপোড়া !

(চলবে)

ব্রাত্য রয়

ব্রাত্য রয়

জন্ম ২৫ মে ১৯৭৩, মোহনগঞ্জ, নেত্রকোনা।পেশায় কলেজে অধ্যাপনা (প্রভাষক, রয়েল মিডিয়া কলেজ, ময়মনসিংহ।)

আগ্রহ কবিতা, গল্প, প্রবন্ধ ও উপন্যাসে। 

প্রকাশিত গ্রন্থ-
উপন্যাস- নাম পুরুষ ( ২০১৮)

প্রবন্ধ- গুরু পুঁছিও জানো (২০১৯), খেরোয়াল (২০১৯), আপন আরশিতে অচেনা আনন (২০১৮), তৈল সংহার (২০১৮), ইতি পাতি রাজ হাস (২০১৭), আপ্তবাক্য (২০১৭), বাঙাল ধর্মত্ত্ব (২০১৬)

ই-মেইল : bratyoroy@gmail.com 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

%d bloggers like this: