জল হিজল অনল – ২য় পর্ব

[১ম পর্বের পরের অংশ]

বৃষ্টিকে এখন একটু ক্লান্ত মনে হচ্ছে। মনে হয় আমার অভিসারে তার সদিচ্ছা আছে। থাকবেইত এ যে স্বাত্বিক প্রেম। জীবাত্মা পরমাত্মার মত। সকল প্রাকৃতিক দুর্যোগ এখানে উপেক্ষিত। মেঘরাজ নিশ্চই গোবিন্দ দাসের পদাবলী পড়েছে। আসল কাজটাও দেখে ফেলার আগেই সেরে ফেলি অর্থাৎ জুঙ্গুরটা এই ঝোপের আড়ালে লুকিয়ে রাখি, তারপর ফিরবার পথে নিয়ে যাব। এই ফোটা ফোটা হ্যোমিওপ্যাথি বৃষ্টিতে তেমন ভিজব না। পথের পাশে ঝোপের ভিতর ঢুকে জুঙ্গুরটা বেত গাছের পাতার ফাঁকে ঠেলে দিয়ে বেরুবার পথে পায়ে প্যান্টে বাজল বেঁতের কাঁটা। নুয়ে কাঁটা খুলে যেই সোজা হয়ে সামনে যাব চোখ পড়ল ওদের বারান্দায়। দেখি বারান্দায় পাল্লা ধরে আমার কান্ডটা বোঝার চেষ্টা করছে। আমার উষ্ণতা যথারীতি কমতে শুরু করল। আমি হ্যাঁ করে একবার তাকিয়ে মনে করলাম : এ নিয়ে দ্বাদশ তম। ও ভেবে নিয়েছে, আমি আবারও ওদের ঝোপের মধ্যে হাগু করতে এসেছি। আমার ছাত্রত্ব, ভদ্রত্ব সব উলঙ্গ হয়ে গেছে। আমার গায়ে যেন কোন কাপড় নেই, আমি ন্যাংটা হয়ে গেছি। আর ওর চোখ দুটো যেন আমাকে পাঁচ ব্যাটারি টর্চের আলো ফেলে তাড়া করছে। রায় বাড়ির পরিত্যক্ত দোলটার সাথে ধাক্কা খাওয়ার পর বুঝতে পারলাম টর্চটা নিভে গেছে। আমি অন্ধকারে , আমার ইজ্জত যেন ফিরে এসেছে। সম্বিত ফিরে পাবার পর বুঝতে পারলাম- একেবারে আস্ত একটা খাল পার হয়ে, কোমর পানি ভেঙ্গে বনবাসে চলে এসেছি। রামধন মাস্টারের পাঠশালা পাস করার পর আর কোন দিন এদিকে আসিনি। সে কম করে হলেও তিন বছর। ময়নার সামনে মান গেলে বোধ হয় এমন দশাই হয়। যাক পিছনের দিকেই যদি ঠেলে দিলে তাহলে এখানে খড়ের ঘরটায় বসে পিছনের কথাই ভাবি। কুকুরের পেটে ঘি ভাত সয়না , আমার জন্য তৈরী আছে খড়ের গাঁদা, পিসিমার আদুরে ঘুম সইবে কেন? হাত পা ছেড়ে রায় বাড়ির মন্ডপের খড়ের গাঁদায় শুয়ে পড়লাম। ভিজা প্যান্ট থেকে পানি ঝরতেছে, আমার খারাপ লাগছে না। মাথার নিচে দুই হাত দিয়ে পুরনো কড়ি কাটের দিকে তাকিয়ে পুরোনো কথা মনে হতে লাগল।

এটা এখন আর রায় বাড়ির মন্ডপ নয়। এ বাড়ির গল্প আমাদের ঠাকুরদার (নারায়ণ কর্তা) কাছে বছরে কম করে হলেও ছত্রিশ বার শুনেছি। তাই এ বাড়ির অনেক কিছুই না দেখেও কেবল শুনে শুনেই চাক্ষুষ হয়ে গেছে। ঠাকুরদা ব্রাহ্মণ মানুষ স্বভাবতই ভোজন রসিক। যজমানের বাড়ির শ্রাদ্ধ খেলে সেদিন আর কর্পুর ছাড়া তার গত্যান্তর থাকে না। শীতকালে বাড়ির দাওয়ায় পড়ন্ত রোদে ন্যাড়ার উপর বসতেন আর বর্ষা কালে মনসা মন্ডপের বারান্দায়। কয়েক ডোজ কর্পুর নেওয়ার পর আমরা বুঝতে পারতাম এখন আমাদের ডাক পড়বে। তিনি হাঁক ছাড়তেন । আমরা এক হাতে নাক ধরে তার দিকে এগুতাম। সময় হলেই তিনি বলতেন নে ধর, বাড়ে বাড়ে তুলা দে। আমরা কলাগাছের মত তার একটা পা সবাই মিলে ধরে ক্রমান্বয়ে উপরে তুলতাম- যতক্ষণ না বুম করে শব্দটা হচ্ছে। যেই তিনি বুম করে একটা বায়ু পাস করলেন ওমনি আমরা তার পা ধরাম করে ছেড়ে দিয়ে নাকে ধরে ছুটতাম। তার সাথে আমাদের এই ছিল খেলা। মাংসল দেহ হওয়ায় পা না তুলে সহজ বায়ু পাস করতে পারতেন না, অথবা আমাদের নিয়ে মজা করার জন্যই এমন করতেন। আমরা যথার্থই মজা পেতাম, বায়ু পর্ব শেষ হলেই শুরু হত রায় বাড়ির জৌলুসের গল্প। তাদের বাড়ির দুর্গা পূজা, বিয়ে- অন্নপ্রাশন, ইত্যকার আয়োজন- ভোজন এবং হাওরের বন্দুকের গুলির শব্দ। অবশ্য যেখানে আমার উম্বা দাদু ( উমেদ বংশি) ব্যর্থ হত কেবল সেখানেই রায় বাবুর দুনলা কাতুর্জটা হাওরে একটা চিৎকার দিত। তারপর এই চিৎকারে স্তব্ধ মানুষটা মাছের খাবার হয়ে যেত। বিজলী চমকের কয়েক সেকেন্ড পরে যেমন গর্জনের শব্দটা কানে আাসে এখানেও তেমনি কার্তুজের গুলির শব্দের কয়েকদিন পরে হাওর পাড়ের কোন এক পাড়ায় শুনা যেত কান্নার শব্দ। লোকে, আস্তে আস্তে বলাবলি করত ওমুক আর নেই। আমার দাদুর তখন গাজাঁর নেশাটা বেশ চড়ে যেত। তিনি তখন কালী সাধনায় বসে যেতেন। রামপ্রসাদের পরে মা নাকি শেষ আশ্রয় তাকেই করেছিল। রামপ্রসাদের লাইন কেটে গিয়েছিল তাই সশস্ত্র কালী কে নিরস্ত্র করে বাঙ্গালি বউ বানিয়ে তার ভাঙ্গা বেড়া তালি দেবার কাজে লাগিয়েছিল। কিন্তু দাদু আমার, কালীর সাক্ষাৎ খড়গ ছিল; অন্ধকারে । রায় বাবুরা কোন দিন দাদুর কল্কি সাধনায় ব্যাঘাত ঘটতে দেয়নি, নিরন্তর চালিয়ে গেছেন। দাদুও মা কালীর কাপালিক হয়ে নিসংশয়তায় রামপ্রসাদের কলঙ্ক কিঞ্চিৎ হলেও দূর করেছেন।

অত্র এলাকায় একমাত্র তিনিই দুর্গা পূজা করতেন। দশ হাতি মায়ের পূজা দশ দিকে রোজগার না থাকলে করা যায় না। অতএব এ এলাকার দুই হাতি সাধারণ শ্রমজীবী মানুষ মনসাকেই তাদের সবচেয়ে বড় পূজা মনে করে। বাবুরা দুর্গাপূজায় মহিষ বলি দিতেন। আর আমাদের মধ্যে যারা সচ্ছল তারা মনসা পূজায় দেন হাঁস বলি। বড় মায়ের বড় খাবার, ছোট মায়ের ছোট খাবার। দুর্গাপূজায় বাবুরা তাদের কলিকাতা থেকে গানের দল আনতো পূজায়। তিনদিন জলটোপরের প্রতি বাড়িতেই অন্যগাঁয়ের মানুষেরা এসে অতিথি হত। রায় বাড়ির দুর্গা পূজা এ এলাকার মানুষের কাছে আজো স্মৃতি। বিসর্জনের দিন নৌকায় করে বড় নদীতে নিয়ে গিয়ে বিসর্জন করা হত। ঠাকুরদা রায় বাড়ির খাবারের কথা মনে করে, বলতে বলতে কখনো অন্যমনস্ক ভাবে হাত চাটেন এখনো।

সেই রায় বাড়ির দুদর্ন্ড প্রতাপ ও জৌলুসের বাতি নিভে গেল একটি মাত্র মৃত বিষ্ণুর খন্ডিত মস্তক প্রর্দশনে। তখন ভারত স্বাধীন হয়েছে, কিন্তু হিন্দু মুসলমানে লেগে গেল ভাগাভাগি । হিন্দু হলে হিন্দুস্তান মুসলিম হলে পাকিস্তান। এখন বাংলা হবে কোন স্থান ? শুরু হয়ে গেল খেলা। যে দুর্গা মায়ের মন্দিরের সামনে মহিষ বলী দিয়ে রায় বাড়ির গৌরবের সিড়ি আকাশ চুম্বি হচিছল। সেই মন্দিরের সামনে রাতের অন্ধকারে কে বা কারা একটি গরুর মাথা বেঁধে রেখে গেল আর তাতেই ফলাফল পুরো উল্টে গেল। প্রতি দিনকার মত বাবু প্রাতে নিদ্রা ভঙ্গের পর, পিতৃ মন্ত্র পাঠ করেন। তারপর পঞ্চ সতীর নাম নিয়ে শয্যা ত্যাগ করেন এবং প্রথমেই যান দুর্গা মন্ডপে। সেখানে প্রথম প্রণাম সেরে আরও নয়টি প্রণাম বিভিন্ন জায়গায় করে বাড়ি প্রদক্ষিণ করেন। কিন্তু সেদিন বাবুর নয়টি প্রণাম অসমাপ্ত রইল। ভগবতীকে প্রণাম করতে এসে ভগবান বিষ্ণুর খন্ডিত মস্তক ঝুলন্ত অবস্থায় দেখে বিচক্ষণ বাবু সোজা ভিতরে চলে গেলেন। তারপর দুপুর পড়ে জলটোপর গাঁয়ের মানুষ দেখতে পেল উলুধ্বনি দিয়ে বাবুদের বাড়ির ঘাট থেকে দুটি বিশাল পাতাম নাও ছেড়ে যাচ্ছে। রায় বাবু বেচারা এত কষ্ট পেলেন যে উমেদ বংশীর খোঁজটাও নিলেন না যাবার সময়। উমেদ বংশী যখন শুনতে পেল তখন বাবুদের বড় নৌকার বড় পালে জোর হাওয়া লেগেছে। উম্বা কতক্ষণ নদীর পাড় ধরে দৌঁড়াল আর চিৎকার করে ক্লান্ত হয়ে হতাশ বসে নৌকার দিকে তাকিয়ে রইল। সারা গাঁয়ের মানুষ বুঝে গেল রায় বাবুরা চলে যাচেছন। অথচ তারা তখনো বিষ্ণু বধ পর্ব জানে না।

ঠাকুরদা কি মনে করে রায় বাড়ির দিকে দৌঁড়াল। ফাঁকা বাড়ি দরজা জানালা সব খোলা। গরুগুলো গোয়ালে সার সার বাঁধা , বিড়ালগুলো রান্না ঘরে বাবুদের শেষ খাবারের উচ্ছিষ্ট নিয়ে পরমানন্দে আছে।

গৃহ দেবতার ঘর বন্ধ আছে এবং বাবু যাবার সময় এখানে হাত দেননি তা বুঝা যায়। যথার্থই গৃহদেবতাকে গৃহ পাহারার দায়িত্ব দিয়ে গেছেন। ঠাকুরদার মনটা খারাপ হয়ে গেল, দেবতাদেরকে এভাবে কেউ ফেলে যায়! এ সময় মাসুক আলি ও সেকুল ঠাকুরদার পিছনে দাঁড়াল। দুজনের মুখ ভয়ানক অন্ধকার। রায় বাড়ির বছর খোরাকী বিশ্বস্ত ভৃত্য। ঠাকুরদা বিস্ময়াবিষ্ট হয়ে জিজ্ঞেস করলেন- কি হলরে সেকুল ? বাবু এমনি হুট করে চৌদ্দপুরুষের ভিটেমাটি ছেড়ে একে বারে চলে গেল ! সেকুল মুখে কোন কথা না বলে, ঠাকুরদার হাত ধরে দুর্গা মন্ডপের সামনে নিয়ে দাঁড় করাল। ঠাকুরদা সেকুলের দিকে তাকিয়েই বলল ওখানে কী ! সেকুল আঙ্গুল উঁচিয়ে দেখাল কালীর হাতের নর মুন্ডের মত ঝুলছে, মন্ডপ বারান্দায় গো-মুন্ড। ঠাকুরদা হ্যাঁ গোবীন্দ বলে এক চিৎকার, এক দৌড়ে একেবারে গ্রামের সর্বজনীন মনসা মন্দিরে এসে পড়ল আর বেহুশ হয়ে গেল।

ঠাকুরদা এবার দ্বিতীয় পর্ব শুরু করবেন, তার আগে আরেকটা বায়ু পাস করবেন। আমরা তৈরী এ পর্ব দ্রুত শেষ করার জন্য। ঠাকুরদার পাছা বলল বুম আর ঠাকুরদার মুখ বলল বোয়া: এবার আমাদের নাকে গন্ধ লাগবে না এবং আমরা দৌঁড়ে ছুটব না।

এত্ত বড় মহাপাপ কী সহ্য করবেন মা ? এ বাড়ির ছত্রিশ পুরুষের জাগ্রত মন্দির। যার আশীর্বাদে এ বাড়ির সম্পদের কোন অভাব নেই তাঁর মন্দিরে এই গর্হিত অপরাধ ! কই, তিন দিনের মাথায় রান্না ঘরের আগুনে তিন ঘর পুড়ল। যে রান্না ঘর ছিল কর্তা মার অন্নপূর্ণার মন্দির, সেখানে কিনা গো মাংস রন্ধন ! সম্ভার দিতে গিয়ে আগুন লেগে গেল চালে নিমিষে তিন ঘর শেষ, আর বড় বিবি অর্ধকাষ্ট। তিন মাসের মধ্যে তিনি গত হইলেন। রাতে বিলে আউল্যারা দিতে গিয়ে ছোট ছেলে খলজি মিয়া আর ফিরতে পারল না। ছোট বিবি রাতে বাহ্যি করতে গিয়ে সেই যে এক চিৎকার দিল আর জবান খুলল না। এর পর থেকে জালু শেখ, বাড়ির সবাইকে রাতে বের হতে নিষেধ করলেন। রাতে ঘরের মধ্যে সবাই পাতিলে কাম সারত। কিন্তু তাতে কি হবে, রাতে এ গাছের ডাল ভাঙ্গেতো এ ঘরের চাল উড়ে, বিনা বাতাসে নদীর পাড়ে বাড়ি ভাঙ্গে ধপাস করে। জালু শেখ শেষে উপায়ান্তর না দেখে এক দিন সন্ধ্যায় আমার কাছে আসে। আমি তখন সুবলের ছেলের অন্নপ্রাশন শেষ করে বাড়ি ফিরছি। পথে আমার সাথে হাঁটতে হাঁটতে একথা সেকথা বলছে। ঠাকুর ভাই আমি তোমারে ছইতাম না, তুমি আমারে বাচাঁও, রায় বাড়ির অর্ধেক তোমার । তুমি এই দেবীরে পূজা দিয়া ঠান্ডা কর। যা লাগে আমি দিবাম। তুমি বিশ্বাস কর, বাবু আমার কাছে সব বেইচ্যা গেছে। আমি গরুর মাথা তোমরার মন্ডব ঠাঙ্গাইছি না। দোয়াই মাবুদ আল্লার। এই দেখ আমার হাতে তছবি। পচ্ছিমবাডি ফিইরা কইতাছি। মিছা হইলে আল্লাহ মাফ করত না। আমি কইলাম- না রে ভাই, আমার অত শক্তি নাই। আমি হইলাম বঙ্গজ ব্রাহ্মণ, এদেশের মানুষের সহজ পূজা পার্বণ পারি। বাবু তাঁর দুর্গা পূজার লাইগ্যা হিন্দুস্তান থাইক্যা কুলীন ব্রাহ্মন আনাইতাইন। আমি লগে থাইক্যা কুল ডুঙ্গা কাইট্যা দিতাম। জালু শেখ কইল; তাইলে চল তুমি আমারে লইয়া হেই দেশ থাইক্যা ব্রাহ্মণ আনি। আমি কইলাম তোমার মাথা খারাপ হইছে ! তাঁরা আর আইব এই অজাতের দেশে। মইরা গেলেও আর আইতনা। জালু শেখ এরপরেও আমারে বের্গাতা করছে কিন্তু আমি তার কথা হুনছি না। মনে মনে কই তুমি যে পাপ করছ, তার শাস্তি পাইতাই হইব।

এভাবেই রায়বাড়ি যে দিন থেকে শেখ বাড়ি হয়ে গেল, সে দিন থেকে পুরো জল টোপর গাঁয়ের মানুয়ের সাথে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল। এ বাড়ির বিপদ আপদে কোন মানুষ এগিয়ে যায় না। তারা ধরেই নেয় এ কুপিত দেবীর শাস্তি চলছে। শেষ মেষ এ বাড়ির মায়া জালু শেখকে ছাড়তেই হল। বাবুদের সকল জমির ধান, বিলের মাছ তার গোলায় উঠত ঠিকমত। কিন্তু বাবুদের বসতবাড়িটাকে তিনি বাগে আনতে পারেন নি। তারপর এটাকে গুদাম বাড়ি বানিয়ে ফেললেন। সারাদিন থাকে কামলাদের দখলে আর রাতে থাকে দেবতাদের দখলে। আমরা ছোটরা মাঝে মধ্যে দিনে এখানে সবাই মিলে খেলতে আসতাম কিন্তু সূর্য ডুবার আগেই ভাগতাম।

কিন্তু আজ সূর্য মেঘের খাঁচায় বন্দি। কামলারাও নেই অথচ আমার কোন ভয় করছে না। বরং প্রশ্ন জাগছে দেবীর যদি এত ক্ষমতাই থাকত তাহলে রাতে যারা গরুর মাথা নিয়ে এসেছিল তারাইত মরে পড়ে থাকত। তাদের বিচার না করে বড় বিবিকে পুড়িয়ে মারল। বড় বিবিত আর মুক্তিখলা থেকে রাতে জলটোপর গাঁয়ে গরুর মাথা বাঁধতে আসেননি। তাহলে এটা কেমন বিচার হল? আমি ভাবতে লাগলাম হাওরে গুলি হলে পরে উম্বা দাদু কালী সাধনায় বসে যেত, এখানেও তেমন কিছু হয়নি তো ? ওত নিশাচর, রাত ওর কাছে প্যাঁচার মত পরিষ্কার। মনে পড়ে সুমেশ্বরীর বেল-কুশাইলের মেলার কথা।

তখন ফাল্গুন মাস হাওরে জলের চিহ্ন মাত্র নাই, সমস্ত হাওর জুড়ে সবুজের মাখামাখি। হাঁটাপথ, দাদু আমার হাত ধরে কান্দা দিয়ে হাটছে। আঙ্গুরিলি আসতেই সব কালো হয়ে গেল। আকাশের তারা ছাড়া আর কিছু দেখা যায়না। দাদু আমাকে ইঞ্জিনে বাঁধা বগির মত টেনে হিঁচড়ে নিয়ে যাচ্ছে। বর্ষার কাদাঁ মাটি গরুর পায়ের খুড়ে সাচ হয়ে ছিলো এখন শুকিয়ে একেবারে ভাঙ্গা ইটের মত হয়ে রয়েছে। আঙ্গুলের মাথায় লাগলে ফেটে চৌচির হয়ে যায়। আমি ভয়ে ভয়ে বললাম দাদু: পাও বেদনা করতাছে হাটতাম পারতাছি না। কিচ্ছু না বলে এক ঝটকায় আমাকে কাঁধে তুলে নিল। আমার এক হাতে বেল, তা দাদুর বেলের (মাথা) উপর রেখে অন্য হাতে দাদুর কপাল পেছিয়ে ধরলাম। মনে মনে বলি যা শালা, এবার যেতে থাক কোন সমস্যা নাই। অনেক্ষণ যাবার পড়ে হঠাৎ থেমে গেল, আমাকে কাঁধ থেকে নামিয়ে দিল। এই কাম সারছে আবার হাটতে হবে। কিন্তু না, আমাকে বলল তুই ঐ উঁচা জায়গাটায় যা। আমি ঐ দিকে যেতে শুরু করলাম এবং গিয়ে উঠলাম। একটু আগে যে গ্রাম গুলিতে ছোটছোট কুপির আলো দেখতে পাচ্ছিলাম এখন তাও নাই। মানে রাত হয়েছে সব বাতি নিভিয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে। তখন সপাৎ সপাৎ করে চার পাচঁটা বাড়ির শব্দ হল মাটিতে। আমি ভয়ে আৎকে উঠলাম: এ অন্ধকারে আবার কী শুরু হল ! ওখানে দাঁড়িয়েই দাদু দাদু বলে কাঁদছি । তখন লাঠির মাথায় ওটাকে ঝুলিয়ে আমার সামনে ধরে বললেন; দেখ কত বড় দারাস সাপ ! আমি তখন ওরে বাবারে বলে সপ্তমে।

এই ভেউয়া চেচাইতেছিস কেন? একটা গর্দভের গর্ভে একটা কেচো জন্মিয়াছে। মৃগ শাবক কাদিঁবার জন্য হরিণের কানের মত কান খাড়া করিয়া রাখে।

আবারও এক ঝটকায় এক হাতে কাধেঁ তুলে নিল। অপর হাতে লাঠির আগায় সাপটি দুভাগ হয়ে ঝুলছে, আমি আবছা দেখতে পাচ্ছি। ভয়ে আমার গা কাঁটা দিয়ে রয়েছে। এক হাতের বেল কখন ধরায় পতিত হয়েছে জানি না। আমি দুই হাতে ওর মাথা নাক মুখ আর দুই পায়ে সিন্দাবাদের সাগর পাড়ের বুড়ার মত গলা এমন প্যাঁচিয়ে ধরলাম যেন নিজেকে মাফলারের মত ওর মাথার সঙ্গে প্যাঁচিয়ে ফেলেছি।
পদ যুগল আলগা কর, নইলে ফেলিয়া দিব।
আমি মাগো বলে আরও জান সর্বস্ব শক্তি নিয়োগ করে ঝাপটে ধরলাম। হাঃ হাঃ করে হাসতে হাসতে একটা ভেন্না গাছের ছুবায় বসে পড়ল। আমি আর বিশ্বাস করতে পারছি না ও মানুষ !!!
সর্পটি, আমার গলায় পেঁচাইব তুই নামবি কিনা বল?
আমি বললাম বাড়িত যায়াম।
লাঠি থেকে সাপটি নিয়ে আমার গায়ে লাগিয়ে দিল। এই বার ভয়ে ঘার থেকে ঝপাৎ করে পড়ে গেলাম এবং উঠেই দৌড় শুরু করলাম মাগো বাঁচাও, মাগো বাঁচাও ! কিন্তু ঐ পিশাচ তখন ভেন্না ছুবায় বসে দিগন্ত বিস্তারি হাসিতে আমার কান্নাকে ঢেকে দিল। আমি প্রাণ পনে দৌঁড়াচ্ছি জানি না কোথায়, কোন দিকে, কোন খানে । ও পেছন থেকে বলছে দৌঁড়া বেটা দৌঁড়া ! সাবধান পড়িয়া যাইবি না, আমি আছি তোর পিছনে। ঠিক তখনি ধপাস ধরনী তল। উঠার সামর্থ ছিল না, অনেকটা বেহুশের মত পড়ে আছি উপুড় হয়ে। এখন শব্দ করে কান্নার মত শক্তিও নাই। মনে হল যেন মার কাছে এসে গেছি। ও আমার কাছে এসে আসন করে বসল। আমি যেন শব, ও আমাকে নিয়ে সাধনায় বসবে। গলা থেকে মৃত সাপটা খুলল তারপর দুহাতে টান দিয়ে সোজা করে আমার পিঠের উপর লম্বা করে বিছিয়ে দিল। আমার মেরুদন্ডে যেন লম্বা একটা বরফের লাঠি রাখা হল। একটা শীতল অনুভূতি আমাকে শিহরিত করল। এবার দাদু বলল কার শক্তি বেশী, তোর না এ্ই মৃত সাপটার ?
আমি স্পষ্ট করে বললাম;- আমার।
তাহলে উঠে দাঁড়া।
আমি উঠে দাড়ালাম।
পিঠ থেকে পড়ে যাওয়া সাপটার দিকে তাকিয়ে বলল, ওইটা তোল।
আমি একটা দড়ির টুকরার মত করে সাপটা তুললাম।

দাদু বলল ভয় লাগিতেছে ? আমি বললাম না: তাহলে এই সাপটা আমার গলায় পেচা। আমি হাটু ভেঙ্গে বসে মাফলারের মত তিন পরতে তার গলায় প্যাঁচালাম। এরপর আমাকে বুকের মধ্যে জড়িয়ে ধরে বললেন, তুই কার নাতি ? আমি বললাম উম্বার । হেসে বললেন না, তুই উমেদ বংশির পৌত্র। তোর বাবা একটা ভুল জন্ম। সে আমার মনপুত নয়। আমার জীবনের ভয়ানক ভুল। তুই যখন তাহার মত হইবার চেষ্টা করিস তখন তোকে আছড়ে মারিয়া ফেলিতে ইচ্ছে করে। তোকে আমি তোর বাবার মত হইতে দিব না। তোকে আমার মত সাহসী হইতে হবে। আমার চেয়েও বেশী। জগন্নাথ দেব রায়ের মত । কথা হইবে চোখ দিয়ে, মুখ দিয়ে নয়। মুখ নাড়ে মেয়েলোকে। পুরুষলোকের কাজ হাত নাড়া। তোকে অন্ধকারের রাজা বানাইব। অন্ধকারের জন্য আমি তোকে তৃষ্ণার্ত করিয়া তুলিব। তোর সামনে অন্য জগৎ খুলিয়া যাইবে। আলোয় যাহারা চলে তাহারা তোর কাছে মনে হইবে মৃত মানুষ। তোর মুগুর চালনা শিখিতে হইবে। একেবারে দুর্যোধনের মত গদা চালনা। এখানে তোর কোন সমকক্ষ থাকিবে না। একবার মুগুর উঠলে একটা শেষ হইবে। এই একমাত্র মন্ত্রে দীক্ষিত হইতে হইবে। বল পারবি।
পারব ।
এরপর আর কিছুতেই ভয় পাবি না?
না।
কেউ তোর পরিচয় জিজ্ঞাস্য করিলে কি কহিবে ?
আমি উমেদ বংশীর পৌত্র।
সাবাস বেটা সাবাস ! মনে রাখিবে তোর দাদু কলিকাতায় গিয়াও এক মুগুরে একজন শেষ করিয়াছে। এই হাওর রাজ্যে তোর দাদু একটা মূর্তিমান আতঙ্ক। তোর দাদুকে মানুষ যখন দেখে তখন সাথে একটা অদৃশ্য মুগুরও দেখে। তোর বেলায়ও যেন এমনটি হয়। আমার মাত্র একটা অসমাপ্ত কাজ সমাপ্ত করিয়া দিতে পারিবে না দাদু ?
পারব।
এইত চাই , উঠ কাধেঁ ব্যাঘ্র শাবকের মত

এবার আমার পাছার নিচে মৃত সাপ। সাপের মাথা আর লেজ আমার দু পায়ের সাথে ঝুলছে। সত্যিই আমার এখন অন্যরকম লাগছে। সাপটা টেনে ছিড়ে ফেলতে ইচ্ছে করছে।

ইচ্ছে করছে ওটাকে শিবের মত গলায় পেছিয়ে এক হাতে শিঙা ফুঁকি আর অন্য হাতে ত্রিশূল দিয়ে লাখে লাখে মানুষ খুঁচিয়ে মারি। বললাম দাদু আমাকে নামিয়ে দাও আমি কড়চ গাছে উঠব।
করচ গাছে উঠবি ? তাহলে একটা চিৎকার দে । যদি তোর চিৎকারে ঐ পেঁচাটা ডাল থেকে উড়াল দেয় তাহলে গাছে উঠতে পারবি।
আমি চিৎকার দিলাম কিন্তু কাজ হলো না। দাদু হেসে বললেন এবার দেখ, বলেই এক ভয়াল হিংস্র প্রাণীর ক্ষুধার্ত চিৎকার দিল। মনে হল যেন এখনি সব খেয়ে ফেলবে। শুধু পেঁচা নয় গাছে আশ্রিত সবগুলো পাখি এক সঙ্গে ডানা ঝাপটা দিয়ে উড়াল দিল। দাদু বললেন এই সব তোর নখ দর্পণে চলিয়া আসিবে। আমি তোকে রাতের বাদশা বানাইয়া দেব। বীর ভোগ্যা বসুন্দরা। এই পৃথিবীটা সাহসী এবং শক্তিমানের।

এরপর টানা দশ দিন জ্বরে ভুগেছি। সারাক্ষণ ঘোরের মধ্যে থাকতাম, শুধু আবোল তাবোল বকেছি। কেবলি রাতের ট্রেনিং এর কথা। আমার অবশ্য কিছুই মনে নেই, সুস্থ হয়ে উঠার পড় মা আর পিসিমা আমায় এসব বলতেন। আর জিজ্ঞাসা করতেন,
আচ্ছা হাছা কছাইন , এইদুন গা রাইতে তোর দাদু তোরে কি দেখাইছিল ?
আমি কিন্তু তাও বলি নি।
আমায় যেন আজকে অন্ধকারের হাতছানি পেয়ে বসেছে উঠতে ইচ্ছে করছে না। রাত যত বাড়বে তত মজা হবে। উম্বা দাদু ঠিক আমাকে খুঁজে বের করবে। তার রাজ্যে তার নাতি হারিয়ে যাবে এটা অসম্ভব। আজকের রাতটাও যেন সেদিনের রাতের মতই, কিন্তু মশা ছাড়া আর কিছুই নাই। অথচ সেই রাতে কোন মশা কামড়ায় নাই। সব নিঃস্তব্দ ঠিক আছে কিন্তু কিছু একটা ঘটবে এমন সম্ভাবনা নাই। মনে হচ্ছে যেন সাধারণ একটা ভাত ঘুম দুপুরের মত। ঠিক তখনি কান্ডটা ঘটল। কানে আসল একসাথে নিপেন্দ্র ও কাইল্যার কন্ঠ। মনে মনে বললাম এই কাম হইছে দুপুরে যে নিপেন্দ্রদের বাড়িতে যাই নাই তা ফাঁস হয়ে গেছে। তাহলে এতক্ষণ কোথায় ছিলাম ? কি বলব। শেখ বাড়ির খড়ের গাদায় ? এই দুপুর থেকে রাত অব্দি! কেউ বিশ্বাস করবে না। উম্বাত পারলে মুগুর নিয়ে আসবে। আমি যে কতবড় চামচিকে সাহসী এটা তার চেয়ে আর ভাল কে জানে। আচ্ছা, আগে এখান থেকে বের হই। ভাঙ্গা দোলের পাশ দিয়ে গিয়ে আস্তে আস্তে খালটা পার হলাম। প্যান্টটা শুকিয়ে গিয়েছিল আবার ভিজল। সেখান থেকেই বললাম আয়া পড়ছি। বাড়িতে উঠে দেখি রীতিমত সমিতি বসে গেছে। আমি বুঝতে পারছি গুরুতর একটা কিছু বলতে হবে নইলে রক্ষে নেই।
ফুলভরি গেছিলামগা, আমার সাথে যে পড়ে ভুবন চৌধুরির নাতি নিরঞ্জন, এর মামা মোহনগঞ্জ থাকে। আমারে মোহনগঞ্জ গয়না ঘাটে পাইয়া একটা চিঠি দিয়া কইল; বাবা তুমি আজকের মধ্যে চিঠিডা নিরঞ্জনেরা বাড়িতে দিবা। আজকে যদি না দেও সর্বনাশ হইয়া যাইব। আমি কইছিলাম চিন্তা করবেন না, আমি যাওনের সময় ই দিয়া যায়াম। কিন্তু নৌকার মধ্যে মনে আছিল না। নিপেন্দ্ররা বাড়িতে যাওয়ার সময় পকেটে হাত দিয়া দেখি চিঠি। আর তখন একটা গয়না ছাড়ে দেইখ্যা উইঠ্যা পড়ছি। কেরে নির্মইল্যা কইছে না ? আমিত যাওয়ার সময় হেরে কইয়া গেছি।
ডাহা মিথ্যা কথা, তবে আপাতত আমি বাঁচি পরে না হয় নির্মলকে বাঁচানো যাবে।

ব্রাত্য রয়

ব্রাত্য রয়

জন্ম ২৫ মে ১৯৭৩, মোহনগঞ্জ, নেত্রকোনা।পেশায় কলেজে অধ্যাপনা (প্রভাষক, রয়েল মিডিয়া কলেজ, ময়মনসিংহ।)

আগ্রহ কবিতা, গল্প, প্রবন্ধ ও উপন্যাসে। 

প্রকাশিত গ্রন্থ-
উপন্যাস- নাম পুরুষ ( ২০১৮)

প্রবন্ধ- গুরু পুঁছিও জানো (২০১৯), খেরোয়াল (২০১৯), আপন আরশিতে অচেনা আনন (২০১৮), তৈল সংহার (২০১৮), ইতি পাতি রাজ হাস (২০১৭), আপ্তবাক্য (২০১৭), বাঙাল ধর্মত্ত্ব (২০১৬)

ই-মেইল : bratyoroy@gmail.com 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

%d bloggers like this: