জল হিজল অনল – ১ম পর্ব

শামছু আজ বৃথাই তাঁর সাতটি ঘোড়া ছুটিয়ে পূর্ব পশ্চিম করলেন। জলটোপর গাঁয়ের কোন মানুষ বিশ্বাস করবে না, যে আজ তিনি কাজে বেরিয়ে ছিলেন । শুধু আজ কেন কদিন ধরেই পুরো আকাশ মেঘদেবের দখলে। আমার মনে হয় তাঁর ঘোড়া অথবা তিনি ঘোরতর অসুস্থ হয়ে বিছানা নিয়েছেন, আর এই সুযোগে মেঘরাজ পুরো রাজত্ব দখল করে তার কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। জীমূতেন্দ্র এইবার আকাশের দখল নিয়েছেন বছর শুরুর আগে থেকেই এবং তা বেশ সমারোহে। সূর্যকে সুযোগই দিচ্ছেন না, মুখ দেখানোর। এবার মনে হয় তিনি বছরওয়ারি দুইমাসের হিসাব মানবেন না, বছর দখল করবেন, তাই শুরু থেকেই সরবে গুড়–গুড়–। বৃষ্টি মাঝে মধ্যে ক্লান্ত হয়ে যাচ্ছে হয়তো, কিন্তু পরক্ষণেই নভোমন্ডলে মেঘরাজ তর্জন গর্জন করে মেঘরাশিতে এমন আঘাত করেন; বৃষ্টি ক্লান্তি ভুলে নাচতে শুরু করে দেয়, স্বর্গের অপ্সরা- রম্ভা, মেনকা, উর্বশীর মত। এ কয়দিনে জন্ম গ্রহন করা নবজাতকেরা যেমন মায়ের কোল দখল করেই ভিজিয়ে চলেছে, বাতাসে ভাসমান জলধরও তেমন আমাদের দৃষ্টিসীমা দখল করে অনবরত জল বর্ষণে মানুষের ঘর-গেরস্থালি কেবল ভিজিয়েই যাচ্ছে। এখন যেন কেমন, দখল দখল খেলা চলছে । পাকিস্তান দখল করেছে পূর্ববাংলা, মিলিটারি দখল করেছে আমাদের স্কুল, মেঘ দখল করেছে আকাশ। আপন মনে ঝরছে । এই বিশাল হাওরের মাঝে ছোট ছোট গ্রামগুলি যেন এক একটি সবুজ ছাতার মত জলের উপর ভাসছে। মাথায় জলের ধারা, নিচে জলের ঢেউ আছড়ে পড়ছে। জলে জলাকার যেন দিগন্ত বিস্তৃত এক নিরঙ্কুশ জল রাজত্ব। আমাদের ছাতার নামটি জলটোপর, তার পশ্চিমে ফুলভরী, উত্তরে চান্দের গাঁও, দক্ষিণে বিশরপাশা সবকটি ছাতা জলের উপর দাঁড়িয়ে আছে নি:শব্দ নিশ্চল। কেবল আমাদের নৌকাটি ঝপ ঝপ এক মাপের শব্দে এগিয়ে যাচ্ছে নিজস্ব গতিতে কোন একটি ছাতার দিকে। চার মাল্লা দাড় টানছে, মাঝি বেটা হাল ধরে বসে আছে। আমরা যাত্রীরা শুয়ে বসে নিশ্চুপ নৌকায়, যেন বৃষ্টির শব্দ, জলের শব্দ ছাড়া আর কোন শব্দ শুনতে চাই না, এমন কি নিজেরাও কোন শব্দ করতে চাই না।

আমার আবার খুশির চোটে কিছুই ভাল লাগছে না। আমাদের বাঘা বাঘা স্যারগুলো কেমন মেনি বিড়াল হয়ে গেল। কত নরম করে বলল- “ তোমরা কি জান দেশে যুদ্ধ চলছে ? পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী আমাদের নিরীহ নিরাপরাধ দেশবাসীকে কুকুর বিড়ালের মত মারছে। আমার দেশের বন্দুক, আমাদের বুকের রক্তে রঞ্জিত হচ্ছে, ইচ্ছে হলেই গুলি করে মেরে ফেলছে শত শত মানুষকে। শাসক যখন শোষক হয় তখন সে আর মানুষ থাকে না, হায়েনা হয়ে যায়। আমাদের ধারণা ছিল এত তাড়াতাড়ি এই মফঃস্বলে আসবে না, কিন্তু কাল রাত্রে খবর এসেছে এরা নেত্রকোনায় অবস্থান করছে। যে কোন সময় মোহনগঞ্জে আসতে পারে। মোহনগঞ্জের প্রবেশ পথে আমাদের স্কুল, হয়তো এসে এখানেই আস্তানা গাড়বে। তখন এখানে যাকে পাবে তাকেই গুলি করে মারবে। আগামী কাল থেকে তোমরা যারা হোস্টেলে থাকো, তাদের ছুটি। কতদিন বলা যায় না, তবে দেশ স্বাধীন না হওয়া পর্যন্ত তোমাদের ছুটি । দেশ স্বাধীন হলে আবার তোমরা লেখাপড়া শুরু করবে। তোমরা যারা স্কুল হোস্টেলে থাক তারা আজকের মধ্যে বইপত্র, কাপড়, বিছানা গুছিয়ে নাও। আগামী কাল সকালে তোমাদেরকে যার যার গ্রামের নৌকায় আমরা তুলে দেব। তোমাদের একাই বাড়ি যেতে হবে। যেতে পারবে না ? পারবে, এখন পারতে হবে। প্রয়োজেনে তোমাদেরকেও যুদ্ধ করতে হবে দেশের জন্য, স্বাধীনতার জন্য।”

আমি মনে মনে বলি হ ! দেশ স্বাধীন করে দেই আমি, আর তুমি আমার পিঠে স্বাধীন হাতে বেত মার , কান ধরে টানতে থাক। বেঞ্চের উপর নিল ডাউন করাও, সূর্যের দিকে মুখ করে তাকিয়ে থাকতে বল। জীবনেও তোমাকে স্বাধীনতা দেব না । এবার ঠিক হয়েছে, বেত হাতে নিয়ে বেটাগিরি !

এবার বাড়ি গেলে আর আসবই না। উম্বা দাদুকে এমন ভয় দেখাব যে আর আমাকে মোহনগঞ্জে পাঠাবে না। ইস মিলিটারি যে কেন আরও আগে আসল না, তাহলে আরও কত আগে আমি স্বাধীন হয়ে যেতাম। পাপের ফল! আমাকে ছোট পেয়ে খালি পেটাও এখন বুঝ ঠ্যালা। মিলিটারির সঙ্গে যদি দেখাটা করে যেতে পারতাম তাহলে দু’কথা কানেকানে বলে যেতাম। আমি গাঁধা, আমার মাথায় গোবর, আমাকে গরুর সঙ্গে বেঁধে হাল বাওয়া ছাড়া আর কোন কাজ হবে না। সবার পিছনের বেঞ্চে বসে, তোমাদের মুখের এইসব বাণী আর হাতের বেত ছাড়াতো আমার কপালে জুটেনি কিছুই। সামনের বেঞ্চের সদা, মালা , রফিক এদের মাথায় প্রতিদিন হাত বুলিয়েছ আর বলেছ গুড বয়। আর আমার বেলায় ঠাস ঠাস। কবেই তোমাদের স্কুল ছেড়ে ভাগতাম, পারিনি। বাড়িতে এই যে- আরেক শত্রু উম্বা দাদু । তাছাড়া গায়ে একটু ইজ্জত সম্মান পাই। সবাই বলে- রায় বাড়ি চলে যাওয়ার পর, আর আমাদের গ্রামে তেমন শিক্ষিত নেই , তুই লেখা পড়া শিখে আবার গাঁয়ের মান বাঁচা । তাই না এত নির্যাতন সহ্য করে পড়ে আছি, “দেব সন্তান কচ সম দৈত্যকুলে।” তবে ভক্তের ডাকে ভগবান খাড়া। দেখেছ; কেমন তিনি আমাকে মুক্ত করে দিলেন। এখন তোমরা কী করবে ? যাও সদাদের বাড়ি, রফিকদের বাড়ি, ওখানে গিয়ে গুড বয় – গুড বয় করে এস প্রতিদিন। যে বেত আমাকে মেরেছ তার জন্যই মিলিটারি এসেছে। ম্যাট্রিক দিতে আরও তিন বছর বাকি ছিল, ততদিনে আমি আর বংকু মিলে যুক্তি করে একদির রেল গাড়ির নিচেই হয়তো পড়ে যেতাম। তারপর পুলিশ এসে তোমাদের ধরে নিয়ে জেলে ভরে রাখতো। তার চেয়ে ভগবান এটাই ভাল করেছে, আমাদের মরতেও হলো না, তোমাদের বেতও খেতে হলো না। মিলিটারি এসে আমার মনের ইচ্ছা পূর্ণ করে দিল। “ থাক; বাবা মিলিটারি তোমরা থাক , যত দিন না ওরা আমার মাথায় হাত বুলিযে দেবে এবং সপ্তাহে অন্তত একদিন মারবে না বলে কথা দিবে, ততদিন তোমরা থাকবে, তারপর চলে যেও।”

নাঃ বাড়ির পথ যেন আজ শেষ হচ্ছে না। বৃষ্টিও কমছে না। এত মালপত্র নিয়ে বাড়ি উঠব কিভাবে? সাথে ছাতাও নেই। নৌকা থেকে নেমে আগে বাড়িতে খবর দিতে হবে। এই তোশক ট্রাংক আমি গাঁয়ে টানতে পারব না। স্কুলে, স্যারের জুতা রেল স্টেশন থেকে কালি করে নিয়ে গেছি, সেটা আলাদা কথা। এটা স্যারের জুতা। স্যার শ্রদ্ধেয়, তাঁর জুতাও শ্রদ্ধেয়। তাই বলে নিজ গাঁয়ে নিজের মাল টানা! অসম্ভব। তাছাড়া ও যদি দেখে ফেলে।
এই কাটাখালী দেখা যাচ্ছে তাপর ঘাইট্টা , লখনা , ছিদ্দরপুর। উঃ কী মূর্খ আমাদের গাঁয়ের মানুষগুলো। লক্ষ্মীপুরকে বলবে লখনা, শ্রীধরপুরকে বলবে ছিদ্দর পুর, বিশরপাশাকে বলবে বিয়রপার। এদের কে সূর্যের দিকে তাকিয়ে নিল ডাউন করে রাখা উচিত, আর বাল্মীকির মত এই নামগুলো জপ করতে থাকবে যতক্ষণ না শুদ্ধ হয়। দূর বৃষ্টিই থামে না নিল ডাউন করাবো কিভাবে।

নেতুর লন্ড্রি থেকে হেকিম আলি স্যারের পাঁচটা জামা প্যান্টের সাথে আমার জামাটা ফ্রি ইস্ত্রি করে এনেছিলাম, নৌকার মধ্যেই সে ঠাঁঠ গেল। নৌকাগুলো যে কেন ট্রেনের মত বসার ব্যবস্থা করে না বুঝি না। আসলে আলস্যের যানবাহন হচ্ছে নৌকা। এইসব গায়েঁর মানুষ ছয়মাস ফলায় আর ছয় মাস শুয়ে খায়। আর তাই এদের সব কিছুতেই কেবল শুয়ে পড়ার ব্যবস্থা। নৌকাও চলে শুয়ে শুয়ে, নৌকার যাত্রীও যায় শুয়ে শুয়ে, নৌকা পৌঁছে গিয়ে যেসব গ্রামে, সে গ্রামের মানুষও থাকে শুয়ে। এখন বাড়িতে উম্বা দাদু লম্বা হয়ে শুয়ে আছে হুঁকার নল নিয়ে, মা সময় মত কল্কের আগুন বদলে দিবে। যেমন বাবা এখন ভাই ভাতিজা নিয়ে তাশ পেটাচ্ছে, তবে সময়মত গোয়াল ঘরে গরুকে খড় দেবে। গোয়ালে যেমন গরু এই বর্ষার ছয়মাস শুধু খাবে, চেনাবে আর লেদাবে তেমনি তার মালিকেরও অনুরূপ কাজ। পার্থক্য শুধু একটি, গরু খাবার খেয়ে অবসরে সেই পেটের খাবার মুখে এনে জাবর কেটে অবসর বিনোদন করে। মানুষ এটা পারে না, তাই তাস খেলে। মা জেঠিমারা রান্না ঘরে শ্রাদ্ধের আয়োজন করবে, ভাড়ার ঘরে ছয়মাসের জন্য সব তোলাই থাকে।

খিদের আন্দাজে বুঝতে পারছি দুপুর গড়িয়ে গেছে। স্কুল মসজিদের মুয়াজ্জিন চাচা আমাদের ফজরের আযানের আগে ঘুম থেকে উঠিয়ে তবে নামাজ পড়তে যান, আর আমাদের রেডি করতে রেখে গেছেন পিয়ন হলকরি মহাশয়কে। তিনি এমন তাড়া দিতে শুরু করলেন যেন মিলিটারি এই ঢুকে পড়ল, এই গুলি করে দিল ! শেষ পর্যন্ত উঁচা হিলের জুতা আর সিনেমার আধা ছেঁড়া জমানো টিকেটগুলো মিলিটারির জন্য রেখেই আসতে হল। গয়না ঘাটে মুয়াজ্জিন চাচা শুধু মুখভরে দোয়া আর গাল ফুলিয়ে ফু দিয়ে নৌকায় তুলে দিল, পেটে কিছু দেয় নাই। সকালটা মিলিটারির ভয়ে খিদের কথা মনে পড়ে নাই। এখন যত বাড়ির কাছে আসছি তত মিলিটারির ভয় কমছে আর খিদের মাত্রা বাড়ছে। এসেও পড়েছি : জননী জন্মভূমি জলটোপরের বুড়ো হিজল যেন অসহায় হাতির মত দাঁড়িয়ে ভিজতেছে। মেঘ মনে হয় সূর্যকে মিলিটারি দিয়ে গুলি করে দিয়েছে। সহসা তার সুস্থ হবার কোন সম্ভবনা নাই। বেন্দা (বৃন্দাবন) মৌসাকে দিয়েই বাড়িতে খবরটা পাঠাতে হবে। যাত্রীরা অল্প অল্প করে নামছেন, যাদের ছাতা আছে তারা অগ্রে । বেনদা মৌসা আমার দিকে আসছেন ; এসে বললেন;
আবু তুই বইয়া থাক, আমি তরা বাড়িত খবর দিয়া যাইমুনে , হেসে হেরা ছাতি লইয়া আইয়া তরে নিব নে। আমার ছাতিডা চিরা, আমার লগে গেলে ভিইজ্যা যাইবি।
আমি আচ্ছা বলে নৌকাতেই বসে রইলাম।
নৌকা থেকে নদীর পাড়ে জুঙ্গুরের মাথা দেখা যাচ্ছে, মানে কাইল্যা (কালা কৃষ্ণ) । তারপর ছাতার মাথা মানে বাবা (গোপাল কৃষ্ণ)। দুইজনেরই খালি গা। লুঙ্গি হাটু র্পযন্ত ভাঁজ করে কোমরে ডাবল গিটটু । বৃষ্টির ফোটা তাদের ছাতা আর জুঙ্গুরের মাথায় পড়ে কেমন যেন হরিলুটের বাতাসার মত ছড়িয়ে পড়ছে, বাড়ির ঘাটে মান্দার গাছে বাঁধা কুষা ও কুন্দা গলুই ভাসিয়ে কালো মুষের মত ডুবে আছে খালের জলে। সইয়ের বাড়ির গোবরের টাল থেকে বৃষ্টির জল গোবরজলে মাখামাখি হয়ে নামছে খালের জলে। শান্তি মাসির ভিজা খড়ের চাল ঠেলে বাইরে বেরিয়ে আসা জ্বলন্ত চুলার রান্নার ধুয়া বৃষ্টির ঘায়ে আবার মিলিয়ে যাচ্ছে খড়ের গাদায়। মাঝরাতে বোয়াল ধরার আশায় যইত্যা সাধু যে লাউগ্যা মাছের পিঠে, বড়শি গেঁথে রেখে দিয়েছিল বরুন গাছের নিচে ঝোপের পানিতে, তাতে সাধুর কপালে বোয়াল না জুটলেও লাউগ্যা মাছটির কপালে মরণ জুটেছে। সে এখন বৃষ্টিজলের ঢেউয়ে নিস্প্রাণ ভাসছে ডুবছে। বাবার মুখটা বিস্ময় বোধক অর্থাৎ আমি আবারও পালিয়েছি ! নৌকার ভিতর মুখ দিয়ে আমার তল্পিতল্পা দেখে ভগ্নদূতের মত বল্লেন – অক্কবারে আইয়া ফড়ছচ ? নাকি তরে খেদায়া দিছে মাস্টর হগলে। বাবারে তে অখন কিতা কইতাম

খিদের আন্দাজে বুঝতে পারছি দুপুর গড়িয়ে গেছে। স্কুল মসজিদের মুয়াজ্জিন চাচা আমাদের ফজরের আযানের আগে ঘুম থেকে উঠিয়ে তবে নামাজ পড়তে যান, আর আমাদের রেডি করতে রেখে গেছেন পিয়ন হলকরি মহাশয়কে। তিনি এমন তাড়া দিতে শুরু করলেন যেন মিলিটারি এই ঢুকে পড়ল, এই গুলি করে দিল ! শেষ পর্যন্ত উঁচা হিলের জুতা আর সিনেমার আধা ছেঁড়া জমানো টিকেটগুলো মিলিটারির জন্য রেখেই আসতে হল। গয়না ঘাটে মুয়াজ্জিন চাচা শুধু মুখভরে দোয়া আর গাল ফুলিয়ে ফু দিয়ে নৌকায় তুলে দিল, পেটে কিছু দেয় নাই। সকালটা মিলিটারির ভয়ে খিদের কথা মনে পড়ে নাই। এখন যত বাড়ির কাছে আসছি তত মিলিটারির ভয় কমছে আর খিদের মাত্রা বাড়ছে। এসেও পড়েছি : জননী জন্মভূমি জলটোপরের বুড়ো হিজল যেন অসহায় হাতির মত দাঁড়িয়ে ভিজতেছে। মেঘ মনে হয় সূর্যকে মিলিটারি দিয়ে গুলি করে দিয়েছে। সহসা তার সুস্থ হবার কোন সম্ভবনা নাই। বেন্দা (বৃন্দাবন) মৌসাকে দিয়েই বাড়িতে খবরটা পাঠাতে হবে। যাত্রীরা অল্প অল্প করে নামছেন, যাদের ছাতা আছে তারা অগ্রে । বেনদা মৌসা আমার দিকে আসছেন ; এসে বললেন;
আবু তুই বইয়া থাক, আমি তরা বাড়িত খবর দিয়া যাইমুনে , হেসে হেরা ছাতি লইয়া আইয়া তরে নিব নে। আমার ছাতিডা চিরা, আমার লগে গেলে ভিইজ্যা যাইবি।
আমি আচ্ছা বলে নৌকাতেই বসে রইলাম।
নৌকা থেকে নদীর পাড়ে জুঙ্গুরের মাথা দেখা যাচ্ছে, মানে কাইল্যা (কালা কৃষ্ণ) । তারপর ছাতার মাথা মানে বাবা (গোপাল কৃষ্ণ)। দুইজনেরই খালি গা। লুঙ্গি হাটু র্পযন্ত ভাঁজ করে কোমরে ডাবল গিটটু । বৃষ্টির ফোটা তাদের ছাতা আর জুঙ্গুরের মাথায় পড়ে কেমন যেন হরিলুটের বাতাসার মত ছড়িয়ে পড়ছে, বাড়ির ঘাটে মান্দার গাছে বাঁধা কুষা ও কুন্দা গলুই ভাসিয়ে কালো মুষের মত ডুবে আছে খালের জলে। সইয়ের বাড়ির গোবরের টাল থেকে বৃষ্টির জল গোবরজলে মাখামাখি হয়ে নামছে খালের জলে। শান্তি মাসির ভিজা খড়ের চাল ঠেলে বাইরে বেরিয়ে আসা জ্বলন্ত চুলার রান্নার ধুয়া বৃষ্টির ঘায়ে আবার মিলিয়ে যাচ্ছে খড়ের গাদায়। মাঝরাতে বোয়াল ধরার আশায় যইত্যা সাধু যে লাউগ্যা মাছের পিঠে, বড়শি গেঁথে রেখে দিয়েছিল বরুন গাছের নিচে ঝোপের পানিতে, তাতে সাধুর কপালে বোয়াল না জুটলেও লাউগ্যা মাছটির কপালে মরণ জুটেছে। সে এখন বৃষ্টিজলের ঢেউয়ে নিস্প্রাণ ভাসছে ডুবছে। বাবার মুখটা বিস্ময় বোধক অর্থাৎ আমি আবারও পালিয়েছি ! নৌকার ভিতর মুখ দিয়ে আমার তল্পিতল্পা দেখে ভগ্নদূতের মত বল্লেন – অক্কবারে আইয়া ফড়ছচ ? নাকি তরে খেদায়া দিছে মাস্টর হগলে। বাবারে তে অখন কিতা কইতাম !

জীবনে একবার মাত্র পালিয়েছিলাম অথচ এরপর যতবার ছুটিতে বাড়ি আসি, ততবারই প্রথম প্রশ্ন এই। অশিক্ষিতের দল দেশের কোন খবর রাখে না। যেন গাঁও আর হাওর এর বাইরে কিছু নাই। ভয়ানক গরম হয়ে বললাম- দেশে মিলিটারি আইছে হুনছ না ? স্কুল বন্ধ হইয়া গেছে । স্কুলে এখন মিলিটারি থাকব, থাইক্যা গুলি কইরা মানুষ মারব।
বাবা ট্রাংকটা কাইল্যার মাথায় উঠিয়ে দিতে দিতে নরম সুরে বললেন হুঃ এইডা ত হুনছিই টাউনে যুদ্ধ লাগছে, মনগঞ্জ আইছে কিতার লাইগ্যা ? তুই বাবারে বুঝাইয়া কইছ, বাড়িত গিয়া। তাইন ত আবার রাগী মানুষ, আমার কথা হুনত না।
এই পর্যস্ত আসার আনন্দটাই মাটি হয়ে গেল। এই উম্বার জন্য এখন মন বলছে একটা মিলিটারি সাথে নিয়ে আসা দরকার ছিল। বাঘা মাস্টার সব মেনি বিড়াল হয়ে গেছে আর তুমি উম্বা দাদু, রায় বাড়ির মুগুইড়া মাল! এটা মুগুড় পিঠানো না, একটা গুলি দিব এ্যাঁ এ্যাঁ করে সাড়ে তিন মন লাকড়ির বিছানায় ঘুমিয়ে পড়বা। রায় বাড়ি ইন্ডিয়া যাওয়ার পড় থেকেই উনি বিছানা নিয়েছেন, বাইরে আগের মত আর মালগিরি করতে পারেন না। সেই ঝাল আমাদের উপর শুয়ে শুয়ে মেটান।
কাইল্যা ট্রাংক তোশক মাথার উপর তুলে তার উপর জুঙ্গুর দিয়ে কোমর নাচিয়ে তার স্বভাবসিদ্ধ দ্রূত হাঁটাদৌঁড় শুরু করে দিয়েছে। বাবা এক হাতে ছাতা আর অন্য হাতে পুটলাটা ধরে আমায় নিয়ে রওয়ানা হয়েছেন। আমি জানি এখন ঘরে উঠেই আমার জবান বন্দি দিতে হবে, সবাই আড়ালে শুনবে। বাবা মাঁচাঘরে গিয়েই আটকে যাবে, আর এগুবে না। মা রান্না ঘরে দাঁড়িয়ে শুনবে এগুবে না। কাইল্যা , মেনি, গীতা বিচারালয়ের দর্শক শ্রোতা হয়ে এক পায়ে দাঁড়িয়ে থাকবে। আমি বারান্দা মাড়িয়ে দরজায় এক পা ভিতরে দিয়েছি মাত্র।

আরদালি আসামী হাজির ঘোষণা দিয়ে ফেলেছে (বংশানুক্রমিক আমাদের পোষ্য কুকুরের থার্ড প্রজন্ম মঙ্গলা)। ঘোষণা দিয়েই এখন আমার সাথে খাতির জমানোর লেজ নাড়ানো শুরু করে দিয়েছে। একটা লাত্তি দিতে ইচ্ছে করছে কিন্তু দিলাম না, কারণ মঙ্গলাকে আমি ভালবাসি যদিও সে উম্বার রাতের সহচর। খোলা দরজায় দেখা যাচ্ছে সাড়ে ছয়ফুট লম্বা এক মুর্দা সাদা কাঁথা জড়িয়ে দাফনের অপেক্ষায় পড়ে আছে। আসলে কিন্তু তা নয় এই মুর্দার মুখে হুকোর নল লাগানো আছে, তা থেকে গড়গড় শব্দ উঠবে এবং দুপাশ থেকে পর্যায়ক্রমে ধোঁয়া বেরোবে। তার মধ্য দিয়েই বাক্যালাপ চলবে। তিনি আবার বঙ্গজ ভদ্রলোকের সাধু ভাষায় কথা বলবেন, রায় বাবুর চামচামি করে তা ভালই রপ্ত করেছেন, মাঝে মধ্যে মাতৃভূমির টানটা এসে যায়।
আকস্মিক আগমনের হেতু, কি ঘটিয়াছে ?

গলা শুকিয়ে গেছে, যে ভাবে বলব ভেবে এসেছিলাম সব মামলেট হয়ে গেছে। বললাম- দেশে যুদ্ধ চলছে, তাই মিলিটারি; দেশ– স্বাধীন করতে– স্যার আমাদের বাড়ি চলে এ; এ;– শেষ করা সম্ভব হলো না।
হুঙ্কার ছেড়ে বললেন- “কুলাঙ্গার গুমূর্খ, এক আহম্মকে এক গর্ধভ জন্ম দান করিয়াছে। ইহাকে দিয়া কিছু হইবে না। যাও ইহাকে গোঁয়ালে বাঁধিয়া রাখিয়া আইস।”

চোখের জল এবং কান্নার শব্দ দুটোই একসাথে এসে গেল, সেই সাথে পিসিমা এলেন। আমি পিসিমাকে জড়িয়ে ধরে এ্যাঁ এ্যাঁ করে বলতে শুরু করলাম স্যারের কথা গুলো- আমাদের স্কুলে মিলিটারি এসে উঠবে, তাই স্যার স্কুল বন্ধ করে দিয়েছেন। বাড়িতে খবর দিয়ে আসার মত সময় ছিল না। কাল রাতে সব কিছু গুছিয়ে আজ ভোরে পিয়ন আর মুয়াজ্জিন আমাদেরকে নৌকায় তুলে দিয়ে গেছেন। বেন্দা মৌসাকে বলেছেন আমাকে দেখে নিয়ে আসার জন্য। আমি পালিয়ে আসি নি।
বক্তব্য শেষ হতেই পিসি আমাকে নিয়ে মার ঘরে চলে গেল। মা চোখের জল মুছাতে মুছাতে বলল- আর কান্দিছ না, তোর বেন্দা মৌসা আমারে কইয়া গেছে, তোর মাস্টরের কথা। তোর দাদুরে কইতা সাহস পাইছইন না। ওখন পিরানডা খুইল্যা ফালা ভিইজ্যা গেছে। আমি বললাম না থাক বেশি ভিজছে না। খিদা লাগছে ভাত দেও খাইবাম , পিসি ভাত নিয়ে রেডি, মা পিড়ি বিছিয়ে দিল। খেতে বসে পড়লাম । খেয়ে উঠেই বললাম মা নিপেন্দ্ররার বাড়িত যাই। মা বলল বিষ্টিত ভিইজ্যা আর কামনাই, তোর পিসিমার ছকিত গিয়া ফুইত্যা থাকগা। আমি কইলাম না নিপেন্দ্ররার বাড়িত গিয়া নিপেন্দ্রর সাথে ফুইত্যা থাকিগা ? আইচ্ছা যা ভিজিছ না।

বাবাটা এমন হাবা ! ছাতাটা রেখেছে তার বাবার নাকের উপর। আমি নিশ্চিত যে, ও এই দিকেই তাকিয়ে আছে এবং আমি ছাতাটা ধরতে গেলেই নির্ঘাত পিসির বিছানায় পাঠাবে। না বেরুতে আমাকে হবেই। রান্না ঘর দিয়ে বের হয়ে গোয়াল ঘরের চাল থেকে কাইল্যার জুঙ্গুর নিয়ে ছোট্ট একটা দৌড় মারলাম একেবারে পুরান বাড়ির মাথায় এসে মনে হল, ভুল করে ফেলেছি । ইস্ত্রি করা জামা প্যান্টটা দেখানো যেখানে উদ্দেশ্য, সেখানে মাথায় জুঙ্গুর থাকলেত সব গোবলেট। ওত আমাকে খেয়ালই করবে না। ভাববে কাইল্যা অথবা যেনতেন কেউ। সময়টাও ঠিক আছে এই সময় ওকে বারান্দায় পাওয়া যাবে। আমি প্রথমেই দেখে নেব। যদি দেখি ও আছে তাহলে আর তাকাব না । আর যতক্ষণ দেখতে না পাব ততক্ষণ ঘাড়টা উত্তর মেরু হয়েই থাকবে নিপেন্দ্রদের বাড়ি পৌঁছা পর্যন্ত। নিপেন্দ্র আমার জানের বন্ধু আসলে কিন্তু ওদের বাড়ির পাশে বলে। নিপেন্দ্র বিষয়টা বুঝে না , আসলে ওতো আমার মত শিক্ষিত নয়। বেটা ঝাল! আমার জন্য জান কোরবান। আমাকে দেখা মাত্রই তার হাওর সুলভ কন্ঠে এক চিৎকার দিবে- ভবানন্দ ! আমিও তাই চাই, ও মস্কোর ঘণ্টা বাজানো চিৎকার করুক যেন ও শুনতে পায় এবং বারান্দায় না থাকলে ভিতর থেকে যেন বারান্দায় চলে আসে। যদিও নিপেন্দ্র যা তার স্বভাব একদিনের জন্যও বদলায়নি তদোনুরূপ সেও বারান্দায় কোনদিন ভবানন্দ দর্শনে আসেনি। কিন্তু মন আশাবাদী একদিন আসবে। বেটাকে যে কতবার বলেছি স্কুলে বন্ধুরা এবং স্যারেরা আমাকে আনন্দ বলে ডাকে (আসলে সকলেই আমাকে ভবা বলে ভেঙ্গায়) তুই আমাকে আনন্দ বলে ডাকবি। মাথা মোটার সেটা মনেই থাকে না।

(চলবে)

ব্রাত্য রয়

ব্রাত্য রয়

জন্ম ২৫ মে ১৯৭৩, মোহনগঞ্জ, নেত্রকোনা।পেশায় কলেজে অধ্যাপনা (প্রভাষক, রয়েল মিডিয়া কলেজ, ময়মনসিংহ।)

আগ্রহ কবিতা, গল্প, প্রবন্ধ ও উপন্যাসে। 

প্রকাশিত গ্রন্থ-
উপন্যাস- নাম পুরুষ ( ২০১৮)

প্রবন্ধ- গুরু পুঁছিও জানো (২০১৯), খেরোয়াল (২০১৯), আপন আরশিতে অচেনা আনন (২০১৮), তৈল সংহার (২০১৮), ইতি পাতি রাজ হাস (২০১৭), আপ্তবাক্য (২০১৭), বাঙাল ধর্মত্ত্ব (২০১৬)

ই-মেইল : bratyoroy@gmail.com 

5 thoughts on “জল হিজল অনল – ১ম পর্ব

  • Avatar
    April 12, 2019 at 5:54 pm
    Permalink

    পরের পর্ব কবে পাবো

    Reply
    • Avatar
      April 15, 2019 at 1:57 pm
      Permalink

      প্রতি বৃহস্পতিবার একটি করে পর্ব দেওয়া হবে। ধন্যবাদ আগ্রহের জন্য।

      Reply
  • Avatar
    April 15, 2019 at 5:29 am
    Permalink

    বাহ, সুন্দর।

    Reply
  • Avatar
    April 19, 2019 at 6:00 am
    Permalink

    যতবার পড়ি ততবারই বিস্মিত হই।
    অগাধ সম্ভ্রম লেখক-(গুরু)ব্রাত্য রয়♥

    Reply

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

%d bloggers like this: