আশরাফ মীরের কবিতাঃ বিশুদ্ধ জীবনের মায়াবী বয়ন

সত্তর দশকের এক উজ্জ্বলতর কবির নাম আশরাফ মীর। জন্ম ১৯৫৪ সালের ৩ এপ্রিল ময়মনসিংহের শম্ভুগঞ্জে। আজ অবধি আছেন সেখানেই। সেখানে থেকেই লিখে যাচ্ছেন নিরন্তর। তবে তার কবি সত্তায় কোন লম্ফ-ঝম্ফ নেই। নেই তথাকথিত পরিচয় প্রতিষ্ঠার চিৎকার চেঁচামেচি। আছে মায়াবী প্রকৃতির মতো এক ধরনের নিভৃতচারী মনোভাব। এই মনোভাব থেকে উৎসারিত স্নিগ্ধ রূপ সৌন্দর্যে ঋদ্ধ কবিতাই আশরাফ মীর-কে সত্তর দশকের অপরাপর কবি থেকে স্বতন্ত্র ভিত্তিলোকে এনে দাঁড় করিয়ে দেয়।

ষাট দশকের অনেক কবির কবিতায় যে উন্মোচন, উন্মাদনা, সর্বোপরি রিরংসার শরীরী টংকার অনুরণিত হয়েছে, সত্তর দশকের কবি হলেও মীরকে তার পূর্ববর্তী কবিদের সেই জীবন-চেতনা এতটুকু তাড়িয়ে বেড়াবার সুযোগ পায়নি। না পাওয়ার কারণ হচ্ছে তার নিজস্ব অনুভবলোক। ষাট দশক থেকে শুরু করে আজকের দিন পর্যন্ত আধুনিক বাংলা কবিতার বিশাল আঙ্গিনায় যে যৌনতা, অনিকেত চেতনা আর আত্মধ্বংসী স্বমেহনের রাহুগ্রাস পেলব-সৌন্দর্য নষ্ট করে চলছে,
মীরের কবিতা সে সব থেকে অবস্থান করছে অনেক দূরে। তার কবিতায় আছে এক ধরনের নস্টালজিক বাউল ভাবনা। তবে সেই ভাবনা বা চেতনা জীবনকে ফাঁকি দিয়ে নয়, নয় সন্ন্যাস ব্রতে। “বৈরাগ্য সাধনে মুক্তি / সে আমার নয়।’’ এ বিশ্বাস রবীন্দ্রনাথের। অনুরূপ বিশ্বাস কবি আশরাফ মীরেরও। সঙ্গত কারণেই আশরাফ মীরের কবিতা অন্তহীন স্বপ্ন আর সম্ভাবনাময় জীবনকে আবর্তিত করে ক্রমশ অগ্রসরমান-

স্নেহ এসে ডাকে মসৃণ বিকেলে
তোমার চোখের মতো, সভ্যতা সাহসী গান হয়ে উঠে।
(ভোরের কুশলঃ যে দৃশ্য মনে আসে)

পারিপার্শ্বিক জড় অনুষঙ্গের ভেতরও মীর খোঁজেন প্রাণের স্পন্দন। জীবনবাদী কবির বৈশিষ্ট্যই এরূপ। নার্সিসিজম আক্রান্ত আত্মপ্রেমী মানুষের মতো স্বকীয় অস্তিত্বের কাক চক্ষুজলে। কবি নিজেকে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখতে চান। শব্দহীনতার ভেতর আবিষ্কার করতে চান শাব্দিক সংসারের বুদবুদ। সঙ্গত কারণেই ব্রহ্মপুত্র রেল সেতুকে তার প্রশ্ন-

দীর্ঘ সময় অতিক্রম করে তুমি দাঁড়িয়ে আছে
তোমার অসুখ বাৎসরিক ছুটি কিংবা পিকনিকে যাওয়া নেই?
তোমার বুকে হেটে মানুষের প্রয়োজন পৌছে যায়
তোমার পোশাক ধোয়া নেই
প্রিয় বোনের প্রতি চিঠি লেখা নেই?
(ব্রহ্মপুত্র রেলসেতুঃ যে দৃশ্য মনে আসে)

জন্ম সূত্রে কবিতার ভেতর এক ধরণের বৈপরিত্যের সূত্রপাত হয়। তবে এই বৈপরীত্য কি ব্যক্তিসত্তাকে স্পর্শ করেই। ব্যক্তি কখনো নিজেকেই নিজের ভেতর থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলেন। বিচ্ছিন্ন করে ফেলেন পরিবার থেকে, সমাজ থেকে এমনকি রাষ্ট্রযন্ত্র থেকেও। এই যে বিচ্ছিন্নতাবাদী চেতনা- তা জাগরিত হয় কখনো ক্ষোভ থেকে, কখনো অভিমান থেকে, আবার কখনো প্রেমজাত বিরহ-বেদনা থেকে, আত্ম-উত্থিত শ্লেষ বা ঘৃণা থেকে। তবে এর শেকড় খুব বেশি দূর অগ্রসর হতে পারে না। না পারার কারণটি হচ্ছে কবি সত্তার বৈপরীত্য রূপ। কবি
যেখানে আঘাত করেন, সেখানেই আবার নির্মাণের গান গাইতে চান। যেখানে অভিমান করেন, সেখানেই আবার নিজেকে উন্মোচিত করতে চান, বিকশিত করতে চান, নিবেদিত করতে চান। মোদ্দা কথা, কবি সত্তা শেষ পর্যন্ত প্রেম-সুন্দর, মানুষ-সুন্দরের কাছেই পরাজিত হয়। কবি আশরাফ মীরের বেলায় একথা অনিবার্য সত্য-

তোমার কথা ভাবতে ভাবতে, হাত তুলে আকাশকে ডাকি
যে পাখিটি চঞ্চুতে প্রেম লুকিয়ে গভীর অরণ্যে ঘুমায় তাকেও ডাকি।
নিন্দুক, যারা ক্রোধের আগুনে জ্বলে,
তাদের দুর্ভাগা মাথায় জল ঢালি
একদিন নিশ্চয়ই সুন্দর আমার সখী হবে।
(সুন্দর আমার সখী হবে; যে দৃশ্য মনে আসে)

মীরের কবিতায় একটি ঠিকানা আছে; আর সে ঠিকানায় একিভূত হয়েছে জীবন ও শিল্প। জীবনের স্বতোচ্ছল প্রবাহের মধ্যে মীর জাগিয়ে রাখতে চান তার ব্যক্তিগত দ্বীপ, দেশ, সমাজ, সংসার। এই যে স্বপ্ন, এই স্বপ্নের ভেতর এসে আবার আশ্রয় নেয় তার রোমান্টিকতা। বলা চলে, রোমান্টিকতা, স্বপ্ন, বাস্তববোধ এ-সব কিছু মিলে-মিশে মীরের কবিতাকে নিয়ে গেছে শিল্প সৌন্দর্যের অমোঘ ঠিকানায়। তার কবিতার প্রাণ পাখি হয়ে দিকচিহ্নিত পথে উড়াল দিতে রাজি নয়। কবিতার প্রাণকে তিনি সুসংহত করেছেন, সুসংবদ্ধ করেছেন শব্দের পাথরে পাথর বসিয়ে। এতে করে তার রোমান্টিক মেজাজ উল্লাসহীন শব্দের বয়ন না হয়ে, হয়েছে জীবনের প্রয়োজনসূত্র। এক্ষণে আমরা তার ‘নাইওর’ কবিতার অংশ বিশেষ দিয়ে বিষয়টির সত্যাসত্যতা যাচাই করতে পারি-

তুমি নাইওর গেছে আষাঢ়ে মেঘ মুখ ভার করে আছে।
উদাসী পথে একা বসে তরুইবাশী কাঁদছে
তুমি নাইওর গেছে বসন্ত রাত ধূপছায়া হয়ে গেছে
দুটি শিশু পিতার সান্নিধ্য ভেঙ্গে
(নাইওর: যে দৃশ্য মনে আসে)

যে দৃশ্য মনে আসে আশরাফ মীরের দ্বিতীয় কবিতাগ্রন্থ। তার আগে বেরিয়েছে ‘সুন্দর ছিলো সকলের ডাক নাম’। ফেব্রুয়ারি ২০০২ বাংলা একাডেমী বই মেলায় বেরিয়েছে ‘বনভূমির মৌনতা’ ও ‘দিগন্তের দিন’ নামে দু’টি কবিতাগ্রন্থ। চারটি কবিতাগ্রন্থে আশরাফ মীর শৈশব, কৈশোর আর যৌবনের প্রান্ত ছুঁয়ে যাওয়া অনুষঙ্গ সমূহের শিল্পীত বিন্ন্যাস করেছেন। এই বিন্নাসে পারিপার্শ্বিকের যন্ত্রণাদগ্ধ চোখের ছাপ নয়, সৌহার্দ্য ভরা চোখের বিনয় প্রদর্শন করেছেন। এ বিনয়ে আছে গ্রাম জীবনের হাতছানি, সন্তাপিত, উদ্ভ্রান্ত, জীবনাক্রান্ত মানুষের প্রতি মায়াবী ডাক, যে কারণেই কবি নগর সভ্যতা আর বণিক সভ্যতার সর্বগ্রাসী রূপ দেখেও বলতে পেরেছেন দ্বিধাহীন-

‘লিখেছি আমাদের চিরকালীন মিলনমৈত্রী নিভৃত সভ্যতা’

এবং-

‘লিখেছি নিটোল হেমন্তদিন, বকুলগঞ্জ
মধুর বর্ণিল পেখমে নাচে উদাসী আবেগ,
স্বপ্নের কোমল ভাজে প্রনয় উচ্ছ্বাস মেখে
লিখেছি চপল চঞ্চল শুভার্থী।”
(চিঠি: বনভূমির মৌনতা)

কবিতার নামে আশরাফ মীর তথাকথিত মতবাদ, শাব্দিক সন্ত্রাস, আবেগ উতরোল আবাহন কিংবা সাত স্যাতে সেন্টিমেন্টালিজমের ভন্ডামি করার চেষ্টা করেননি। কবিতায় তিনি অন্তর্গত আবেগকে উপস্থাপন করেছেন সংহত আর সুসংবদ্ধতার ভেতর। এরপ মেজাজ রক্ষিত হয়েছে তার ভাবনার আপাদমস্তকে। কবি রোমান্টিকতা করেছেন, তবে সেখানেও অস্থির নন তিনি; শান্ত-সমাহিত, ধীর-স্থির ভাবুক মানুষের মতো কথা বলেছেন-

‘বাড়ি ফিরে যাচ্ছে
ঘুমন্ত গ্রাম জেগে উঠছে
ধান কাটা শুরু হচ্ছে কৃষকের হাতে
এখন তোমার হাতে বেশ শস্যময়।”
(বাড়ি ফিরে যাচ্ছে: বনভূমির মৌনতা)

বাংলা কবিতার সুতিকাগারেই তৈরী হয়েছে আধ্যাত্মিক-জীবন বেদের উৎসারণ, একই সাথে আত্মজাত খরতাপের সর্বগ্রাসী আগ্রাসন। এই খরতাপে অনেকেই মৃত্যুন্মুখ পথের বর্ণনা দিয়েছেন এবং সে পথের পথিক হওয়ার আকাঙক্ষা ব্যক্ত করেছেন। এরূপ মানসিকতা ব্যক্তিকে অতিক্রম করে সমষ্টির জীবনেও নিয়ে আসে এক ধরণের হতাশা। হতাশাতে জন্ম দেয় পরাজয়ের অর্থাৎ হেরে যাওয়ার পথ, আর হেরে যাওয়া মানেইতো হারিয়ে যাওয়া। এরূপ বিলীনতা আসে মৃত্যুর ভেতর দিয়ে, আবার আসে মৃত্যু চিন্তার ভেতর দিয়ে। আশরাফ মীর হতাশা, হেরে যাওয়া কিংবা হারিয়ে যাওয়ার পক্ষে নন। ফলশ্রুতিতে মৃত্যুর মতো অপ্রিয় প্রসঙ্গকেও তিনি স্বপ্নময় করে তুলেন।মৃত্যুকে মৃত্যু না বলে বলেছেন দূর ভ্রমণ-

“রাত্রি তোমার নাম ধরে ডাকলেই
মনে হয় এই কোলাহলে,
বেঁধেছি বয়সের কোঁকড়ানো চুল,
কাটাতে স্বজনেরা গেছে দূর ভ্রমণে।
(বিশুদ্ধ বিভোরঃ বনভূমির মৌনতা)

গ্রামতো আশরাফ মীরের অস্থি-মজ্জায়, শিরা-উপশিরায়, প্রতিটি রক্ত কণিকায়। মমতা মাখা চৌদ্দ পুরুষের ভিটে যেনো তার কাছে তীর্থ স্থান। সর্বোপরি বালকবেলার নৈসর্গিক মহিমা, আত্মীয় – অনাত্মীয়ের নিবিড় আন্তরিকতায় কবি হয়ে অনুভূত হয় বলেই তাকে “অমায়িক আতিথ্যে গৃহস্থ বাড়ি ডাকে।” “মাটির মৌনতা ঘেরা ধুলো রাস্তা হেঁটে” কবি যেতে চান শৈশবে, কৈশোরে; যেখানে ক্লেষ কলুষ নেই, নগর জীবনের অস্থিরতা নেই, আত্মকেন্দ্রিকতার অসুখ নেই, আছে একে অন্যের প্রতি সবুজ আকুলতা। আর এরই নাম দিয়েছেন তিনি স্মৃতি-বিনম্র অতীতপুর। এই অতীতপুর কবিতার মতোই একই কেলাসনে নির্মিত হয়েছে বনভূমির মৌনতা কাব্যের ‘নিভৃত উল্লাস’ ‘বঞ্চিত কৈশোর’, ‘বৈশাখের বৃষ্টিতে ভিজে’, ‘অতীত’, ‘মৃত্তিকার সান্নিধ্যে’, ‘প্রাকৃতিক’, “নির্জনতা”, ‘‘আবহমান’’ ইত্যাদি কবিতা।
মীরের কবিতায় প্রেম এসেছে প্রথাবিরোধী ভঙ্গিতে। প্রেমাস্পদকে তিনি চান একেবারেই ব্যক্তিগত ভূখন্ডে ধরে রাখতে। পারিপার্শ্বিকের সংস্কৃতির ভেতর নয়, আর দশ জনের জীবন ধারায় নয়, তিনি চান প্রেয়সী তার প্রচলিত সমাজ ব্যবস্থার ভেতর থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ব্যক্তি স্বাতন্ত্র্যবাদের ভিত্তিলোকে দাঁড়িয়ে ব্যক্তিত্বের অস্তিত্ব ঘোষণা করুক। সর্বোপরি চান প্রেয়সীকে বুকের গহীন গভীরে-

‘‘একা ঘরে বসে থাকো, এই ব্রত নাও
প্রায় সকলের কাছে অসাধ্য বিষয়টি
তুমি প্রতিজ্ঞা করো, একা একা চুপ চাপ বসে থাকো।
………………………….
একা ঘরে খিল এটে চুপচাপ বসে থাকো, এই ব্রত নাও।
(এই ব্রত নাওঃ বনভূমির মৌনতা)

ভাব-ভাষা আর ভাবনার অপূর্ব সমন্বয় মীরের কবিতায় উড়ায় শিল্পের সুবর্ণ গান্ডিব। কবিতা হাতুরি-বাটালে নির্মিত কোন কাঠশিল্প নয় যে ইচ্ছে করলেই শব্দের গায়ে শব্দ পেরেক আঁটিয়ে নির্মাণ করা যায়, এ বিষয়ে মীরের জ্ঞান টনটনে। সঙ্গত কারণেই তিনি কবিতায় বল প্রয়োগের আশ্রয় নেননি, আশ্রয় নিয়েছেন স্বতঃস্ফুর্ততার। এই স্বতঃস্ফুর্ততা অন্যান্য কাব্যের মতো “দিগন্তের দিন”-ও বর্তমান। স্বতঃস্ফূর্তভাবে বলেন, তিনি তাঁর উন্মার্গীয় যৌবন দিনের দিকচিহ্নরহিত ভুলপরিক্রমনের কথা-

“মধ্যরাতে মনে পড়ে ভুলগুলো
মধ্যরাতে মনে পড়ে অধৈর্যগুলো
প্রিয়জন মন খারাপ করে চলে যায়।”
(আমার ভুলগুলো: দিগন্তের দিন)

আত্মদহনে দগ্ধ হতে হতে অবশেষে ঝিনুকেরও কিছু প্রাপ্তি আসে। একজন কবি, মানুষের বৈরী সমাজে কিছুই পায় না। অন্তত যা সে প্রত্যাশা করে। একজন কবি কি প্রত্যাশা করে? অর্থ নয়, বিত্ত নয়, প্রত্যাশা করে অকৃত্রিম ভালোবাসা। প্রত্যাশা করে প্রিয়জন ভালোবেসে যা মাখা হাতে উপরে ফেলুক কবি হৃদয়ে প্রোথিত বেদনার বিষবৃক্ষের মূল। প্রত্যাশা আর প্রাপ্তির খেরো খাতায় যখন কবি দেখেন যোগফল শুন্য, তখনই তার কণ্ঠ বলে আক্ষেপের সুর। হাহাকার করে তার অন্তরাত্মা। এই হাহাকার কবির একার হলেও শেষ পর্যন্ত একা থাকে না। হয়ে যায়
সংবেদনশীল সব মানুষের হাহাকার, আক্ষেপ। আশরাফ মীরের কবিতায় এ বিষয়টি উঠে এসেছে ঋদ্ধ চেতনার হাত ধরে-

“দুঃখের খবর বেশীদুর পৌঁছায় না
দুঃখের তাহলে কি রকম চাওয়া পাওয়া,
দুঃখ বুঝি সঙ্গোপনে বিষন্নতায় ভুগে,
দুঃখ তবে কি গতকাল ফিরে চায়?

আমরা আগেই বলেছি আশরাফ মীরের কবিতা জীবনকে, সমাজকে, সংসারকে পারিপার্শ্বিকতাকে পাশ কাটিয়ে কিংবা ফাঁকি দিয়ে নয়। তার কবিতা জীবনভিত্তিক, জীবনের অভিজ্ঞতা ভিত্তিক। তাঁর কবিতায় উৎসার জীবনের শুদ্ধ কেন্দ্র থেকে। যে ভাববাদ এসেছে তা শেষ পর্যন্ত মরমীবাদের দুয়ার খুলতে পারেনি। তার আগেই মীৱেৱ কবিতায় সাধারণ মানুষের অস্তিত্বের প্রবল ঘোষণার সূত্রপাত। ফলে তিনি কখনো আত্মনিবেদিত আবার কখনো আত্মাভিমানে আক্রান্ত। এই দুই পরস্পর বিরোধী ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া মীরের যাবতীয় ভাবনা-চিন্তার মূলে এক অনির্বচনীয় শক্তির সঞ্চার করেছে। আর সেই শক্তির প্রকাশ ঘটেছে প্রেমে, নিবেদনে, অভিমানে, বিদ্রোহে, স্বঘোষণায়-

“তোমার চাহনি জুড়ে সমগ্র প্রান্তর বসে থাকে
আমি পারিনা এই চমন বাহার ধরে রাখতে
তোমার অপলক দৃশ্যময়তায় উদ্ধোধন থাকে
তোমার চোখের অনিমেষ দৃষ্টিতে স্বাগত সুন্দর।”
(বিখ্যাত ভঙ্গিমা: দিগন্তের দিন)

“মাটির মমতাকে বলি, দাও সবুজ পল্লব”। আশরাফ মীরের কবিতা মানেই মাটির কাছে যাওয়া, প্রকৃতি-পল্লবের কাছে যাওয়া, গ্রামে যাওয়া, শৈশবে- কৈশোরে যাওয়া, শেকড়-সভ্যতা আর মাটি সংলগ্ন দেশজ সংস্কৃতির সন্ধানে যাওয়া। তার সব কটি কাব্যেই সেই চেতনার প্রতিফলন ঘটলেও ‘দিগন্তের দিন’ কাব্যের- প্রকৃতির প্রচ্ছদ, কুয়াশার চোখে কুহেলিকা, গ্রাম, বিশ্বাস, বনভূমি, লাজুক উচ্ছাস, সাগর ছাড়া কেউ জানেনা, ভাঙ্গা বাড়ি, যুক্ত করো, প্রকৃতি, গৃহত্যাগী ও প্রান্তর বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

আশরাফ মীর’র কবিতার বহুলাংশ পর্যালোচনায় যে সত্যটি উদ্ভাসিত হয়ে উঠে তা হচ্ছে, তার কবিতায় অনুরণিত হয়েছে জীবনের মৌলিক সুর। তবে এই সুরে নগরজীবনের ধাপাধাপি নেই, আছে গ্রাম জীবন আর গ্রামীণ সভ্যতার পেলবতা। কবিতায় ব্যবহৃত উপমা, রূপক, চিত্রকল্প কখনো কখনো জীবনানন্দ দাস, জসীম উদ্দীন, আবুল হাসান ও আল মাহমুদের কথা স্মরণ করিয়ে দিলেও আশরাফ মীরকে ফ্যাসন চর্চক অর্থাৎ পারিপার্শ্বিকের জীবনবোধে, স্রোতে, মিছিলে নিজের অস্তিত্ব নিয়ে হারিয়ে গেছেন, একিভূত হয়ে গেছেন কিংবা বিলীন হয়ে গেছেন- এ কথা
বলার সুযোগ নেই। আশরাফ মীর অনেকের ভেতর থেকেছেন, আছেন। তবে চলার পথ নির্মাণ করেছেন নিজস্ব স্টাইলে। আর সেই স্টাইল বা ভঙ্গি তার একার। এখানেই আশরাফ মীর’র স্বাতন্ত্রবোধ, এখানেই তার কবিতা হয়ে উঠেছে আধুনিক বাংলা কাব্যের বিশাল আঙ্গিনায় এক অনিন্দ্যসুন্দর ঝুল বারান্দা। সুতরাং দিন যাবে, আশরাফ মীর উজ্জ্বলতর হবেন।

আসাদ উল্লাহ

আসাদ উল্লাহ

জন্ম- ৩রা মার্চ ১৯৬৯, উথুরী, গফরগাঁও, ময়মনসিংহ। 

পেশায় কলেজ শিক্ষক।

আগ্রহ মূলত কবিতা ও প্রবন্ধ।

সম্পাদনা- আমাদের কাগজ, দেয়াল (শিল্প-সাহিত্য বিষয়ক)

প্রকাশিত গ্রন্থ-

কাব্য- মেয়েটিকে দেখি না, বারবার মন বলে যাই

ই-মেইল: asad.deyal@gmail.com 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

%d bloggers like this: