আলবদরের স্ত্রী

ভোর চারটা পঞ্চাশের ট্রেন ধরার জন্য আরমান সোয়া চারটায় ঘর থেকে বেরিয়েছে। গেট খুলে রাস্তা নেমেই রিকশা পায়নি। কাজেই কিছুটা পথ হাঁটতেই হলো। কাঠগোলা বাজার পর্যন্ত হেঁটে প্রধান সড়কে উঠে রিকশায় চাপলো। পুরাতন জেলা শহরের জংশন স্টেশনে পৌঁছতে পনের মিনিট সময় লাগে তার। ট্রেন আসার দশ মিনিট আগেই ষ্টেশনে পৌঁছলো আরমান। অগ্রিম টিকিট সংগ্রহ করেছিল সে। নতুবা আসন নিশ্চিত হয় না। ঢাকাগামী আন্ত:নগর ট্রেনটা শেষ পর্যন্ত আট মিনিট বিলম্বে ষ্টেশনে এসে থেমেছে। যাত্রী ওঠা নামার কোলাহলে কেটে যায় ক’মিনিট। এরই মধ্যে আরমানও ঝটপট নিজের আসনে গিয়ে বসে। অল্পক্ষণের মধ্যেই লম্বা হুইসেল দিয়ে ট্রেনটা সরীসৃপ প্রাণীর মত ঝিরঝির করে চলতে শুরু করে। ক্রমেই বেড়ে চলে গতি। এক টানা পয়তালি¬শ মিনিট চলার পর বড় একটা স্টেশনে গিয়ে থামে ট্রেনটা। স্টেশনটা আরমানের খুব পরিচিত। ভোরের ট্রেন থেকে এ ষ্টেশনে যাত্রী যত নেমেছে, উঠেছে তার কয়েকগুন বেশি। প্রচন্ড ভীড়ের মধ্যে যে যেদিক দিয়ে পারছে- ট্রেনে উঠছে। কিছুক্ষনের মধ্যেই ফের ট্রেন ছাড়লো।

যাত্রীরা কোচের মাঝপথ দিয়ে তাদের নির্ধারিত কোচে যেখানে আসন নিশ্চিত করেছে সেদিকে যাচ্ছে। এদের মাঝে দুজন প্রৌঢ় প্রৌঢ়ার প্রতি হঠাৎ আরমানের দৃষ্টি নিবদ্ধ হয়। হ্যাঁ- হ্যাঁ, ত্রিশ/ বত্রিশ বছর আগে যাদের সাথে পরিচয় ছিল- ওরাই তো। যদিও সময়ের ব্যবধানে তাদের শারীরের মানচিত্রে অনেক পরিবর্তন এসেছে, তবুও তো মুখের আদল আমূল পাল্টে যায়নি। হ্যাঁ, প্রৌঢ় লোকটাকে শনাক্ত করেই সে তার অনুগামী মহিলাকে চিনে নিয়েছে। গেলো চলি¬শ বছরের ব্যবধানে এই প্রৌঢ় এখন ঢাকার ধানমন্ডির অভিজাত এলাকায় বহুতল বাড়ির মালিক। ছেলে-মেয়েদের বিদেশে প্রতিষ্ঠিত করেছে বলে আরমান অনেক আগেই জানতে পেরেছে। এই প্রৌঢ় কি এখন তার গাঁয়ের বাড়িতে গিয়ে রাত কাটাতে পারে, নাকি আজো আগের মতো বাড়িতে গিয়ে অন্যের বাড়িতে রাত কাটায়? প্রশ্নটা দানা বাঁধে আরমানের মনে।

প্রৌঢ় দম্পতি দেখে স্মৃতি তাড়িত হয় সে। ট্রেনের জানালা পাশে বসে বাইরে দৃষ্টি দিয়ে সূদূর অতীতে চলে যায় সে। তখন খালেক বাড়িতে থাকতে পারে না। ক’বছর যাবৎ মানুষ তাকে রাতের আঁধারে এসে খোঁজে। গভীর রাতে মুখোশ পরে কখনো হানা দেয়। কিন্তু তাকে একবারো নাগালে পায়নি। সকলের ধারণা- মুখোশধারী লোকগুলো খালেককে কখনো পেয়ে গেলে আর বাঁচিয়ে রাখবে না। যেখানেই পাবে- সেখানেই খুন করে রেখে যাবে। খালেকও জানে ওসব লোকজনের কবলে পড়লে তার আর রেহাই নেই। তাই ঢাকা থেকে বাড়ি আসে না। কদাচিৎ লুকিয়ে রাতের ট্রেনে এলেও নিজস্ব লোকের পাহারায় চুপিচুপি বাড়ি যায়। স্বজনদের সাথে দেখা সাক্ষাৎ করে অন্য বাড়িতে রাত কাটায়। বড় জোর একদিন আত্মগোপন করে থাকে। অতঃপর ভোরের ট্রেনে ফের ঢাকায় চলে যায়। যেখানে তার বেঁচে থাকার নিশ্চয়তা নেই, সেখানে কী করে সে লেখাপড়া করবে। ইন্টারমিডিয়েট পাশ করার পরেই তো ঝামেলাটা বাঁধলো। শুরু হলো মুক্তিযুদ্ধ। জামায়াতে ইসলামীর ছাত্র সংগঠনের সক্রিয় সদস্য ছিল সে। মুক্তিযুদ্ধের সময় অর্থাৎ একাত্তরের মে মাসেই তো ইসলামী ছাত্রসংঘের- নাম পরিবর্তন করা হলো। নতুন নাম হলো ইসলামী ছাত্র শিবির। খালেক ইসলামী ছাত্র শিবির, থানা শাখার সাধারণ সম্পাদকের পদ গ্রহণ করেছিল। পাকিস্তানের পক্ষ অবলম্বনকারী দলটির ছাত্র সংগঠনের সাধারণ সম্পাদকের পদে থাকার কারণে হতে হলো আল বদরের থানা শাখার সেকেন্ড-ইন-কমান্ড। তাদের নিজস্ব কমান্ড তৈরি করেছিল হিটলিস্ট। আর ঐ হিট লিস্টের বা তালিকায় যাদের নাম অন্তর্ভূক্ত ছিল, যুদ্ধ চলাকালে তাদের ধরে ধরে হত্যা করা হলো একে একে।

একাত্তরের ষোল ডিসেম্বর দেশ স্বাধীন হলো। পরাজয় বরণ করে নিল পাকিস্তানিরা। দুর্দিন নেমে এলো খালেকদের ওপর।

যুদ্ধাপরাধের দায় কোনো ভাবেই এড়াতে পারবেনা ভেবে আত্মগোপন করে ঢাকায় তার এক চাচার বাসায়। তার চাচা কোনো এক সরকারি দপ্তরের কেরানী। মুক্তিযুদ্ধের সময় পরিবার পরিজন গাঁয়েই রেখেছিল। তবে নিজে কর্মরত ছিল ঢাকায়। দেশ স্বাধীন হলে ফের সপরিবারে ঢাকায় বসবাস করতে থাকে। যুদ্ধের ডামাডোলে কোনো এক বিহারীর বাসা কাগজ করে নিয়েছে।

খালেকুজ্জামান ঠাঁই নিল ঐ চাচার বাসায়। চাচার এক ছেলে এবং এক মেয়ে। ছেলে বড়; মেয়ে ছোট। তখন মাত্র এসএসসি দিয়েছে। ঐ চাচাতো বোন আয়েশার সাথে চলে তার গোপন প্রণয়। কিন্তু চাচী তাকে আলবদর বলে পছন্দ করে না। তাই মেয়েকে রাখে কঠোর নিয়ন্ত্রণে। চাচা অবশ্য উভয় সঙ্কটে। ঘোর বিপদের দিনে ভাইস্তাকে তো ফেলে দেওয়া যায় না। খালেকুজ্জামানের আত্মগোপন অবস্থা একের পর এক বছর গড়ায়। তবু গাঁয়ে যেতে পারে না। স্বজন হারা মানুষ প্রতিশোধ স্পৃহা চরিতার্থ করার জন্য তাকে কেবল খোঁজে। সুযোগ পেলে ওসব মানুষেরা তাকে হত্যা করে যুদ্ধাপরাধের প্রতিশোধ নেবে।
পঁচাত্তরের পনের আগস্ট হঠাৎ জাতির পিতাকে সপরিবারে নিহত করে পট পরিবর্তন করা হয়। তখন ওরা মানে খালেকরা আত্মগোপনের খোলস ছেড়ে আত্মপ্রকাশের সুযোগ পায়। আর ঐ সুযোগেই একটি রাষ্ট্রীয় ব্যাংকে খালেক কেরানীর চাকুরি নেয়। গাঁয়ের বাড়িতেও অনেকটা বুক ফুলিয়ে আনাগোনা শুরু করে। এদেশের মানুষ তখনো চুয়াত্তরের দুর্ভিক্ষের রেশ কেটে উঠতে পারেনি। কিন্তু খালেকদের তো দুর্ভিক্ষে পায়নি। পঁচাত্তরের শেষ মাসেই তাদের গাঁয়ের বাড়িতে চোখ ধাঁধানো ডব্লি¬উ প্যাটার্নের এক টিনের ঘর তৈরী করে। এ ঘটনায় গাঁয়ের মানুষের চোখে তাক লেগে যায়। সবার মনে অব্যক্ত এক প্রশ্ন, মানুষ যেখানে খেয়ে পরে বাঁচতে পারে না; সেখানে ওদের এত টাকা এলা কোত্থেকে? তার বাবা তো একজন কৃষক মাত্র। সাকুল্যে জমির পরিমাণ তিন চার একর। তারপক্ষে তো কৃষির আয় দিয়ে এমন বাড়ি তৈরি একেবারেই অসম্ভব। তাহলে ঐসব টাকার উৎস কী মুক্তিযুদ্ধকালের লুঠতরাজ করে প্রাপ্ত সম্পদ?

এলাকার জনমনে ওসব প্রশ্ন অব্যক্তই থেকে যায়। সময় তখন ওদের অনুকূলে। ওসব প্রশ্ন জিজ্ঞাসার সময় তখন নয়। খালেকের পোস্টিং তখন ঢাকার কেন্দ্রীয় রাষ্টীয় ব্যাংকে। গাঁয়ের বাড়িও গুছিয়ে নিয়েছে। তখন বিয়ের সময় ঘনিয়ে আসে। বাবার দুই সন্তানের মধ্যে সেই বড়। ছোট বোনের বিয়ে হয়েছে। লোক স্বল্পতার জন্য ছোট বোনটি বরসহ বাড়িতেই থাকে। ঘর জামাই বোনের বর ৩য় শ্রেণীর সরকারি চাকুরে। স্বচ্ছল আলবদর খালেকের কাছে বিয়ে দিতে তার চাচা-চাচিও তখন নিমরাজী হয়। আয়েশা তখন ইডেন কলেজে বিএ পড়ছে। বাড়িতে তেমন ধুমধাম করেনি। বলা তো যায় না আড়ম্বরপূর্ণ অনুষ্ঠানের কবলে রাতের বেলায় প্রতিশোধ পরায়ণ সেইসব স্বজনহারা মানুষ আবার চড়াও হয় কিনা ! তাই একেবারে শাদামাটা উপায়ে ঢাকার ধানমন্ডিতে চাচার বাসাতেই বিয়েটা হয়। বিয়ের এক মাসের মাথায় কোনো অনুষ্ঠানাদি ছাড়াই খালেক বউ নিয়ে গাঁয়ের বাড়ি আসে। দুদিন গাঁয়ে থাকে। তারপর বউ নিয়ে ফের ঢাকায় চলে যায়।

গাঁয়ের বাড়িতে অবস্থানকারী ছোটবোনের জামাই আরশেদ আলীর কর্মস্থল পাশের থানাতেই ছিল। হঠাৎ করে তাকে বদলী করা হয় পশ্চাদপদ দুর্গম এলাকায়। গারো পাহাড়ের পাদদেশ অবস্থিত সীমান্তবর্তী এক থানায়। ঢাকার অদূরে ময়মনসিংহের দক্ষিণাঞ্চল থেকে পাহাড়ি এলাকা তো বেশ দূরেই। সুনামগঞ্জের পশ্চিম উত্তর দিকে। তবে নেত্রকোনার উত্তরে। পশুপালন বিভাগে কর্মরত আরশেদ আলী সীমান্ত ঘেঁষা গ্রামে পশু চিকিৎসা করতে গিয়ে এক কৈশোরোত্তীর্ণ ছেলের সাথে পরিচিত হয়। ছেলেটা ইন্টারমিডিয়েট পাশ করেছে ভালোভাবেই। কিন্তু গাঁয়ের কৃষক পরিবারের এক পিতৃহারা সন্তান বলে কথা। বিধবা মা তো বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ালেখা করানোর মতো আর্থিক যোগ্যতা রাখেন না। তাই ভালো কলেজে পাশ কোর্সে বিএ পড়াতে আগ্রহী। তবে পশ্চাদপদ ঐ সীমান্ত এলাকায় তো ভালো কলেজ নেই। তাই মা ছেলেটার পড়াশোনার বিষয়টা নিয়ে উদ্বিগ্ন। আরশেদ ছেলেটার বিনম্র আচরণ আর মেধার বিষয়টা বিবেচনা করে মনে মনে ভাবেন, ওকে যদি আমাদের বাড়িতে লজিং রেখে থানা সদরের কলেজে ভর্তির ব্যবস্থা করে দিই। তাহলে আমার তিন ছেলে-মেয়েকে পড়াতে পারবে। ওদিকে ছেলেটারও পড়াশোনা হবে। তাছাড়া বাড়িতে একজন পাহারাদারও হবে। আরশেদ আলী চলতি সপ্তাহেই সাপ্তাহিক ছুটিতে বাড়িতে যায়। স্ত্রী এবং শ্বশুর শাশুড়ির সাথে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেয়। কর্মস্থলে এসেই ঐ ছেলেদের বাড়ি যায়। বিধবা মা এবং ছেলে আরমানের কাছে প্রস্তাবটা দেয়। বিধবা সম্মতি দেয়। আরমান এসে ঐতিহ্যবাহী কলেজে ভর্তি হয়। লজিং থাকে আরশেদ আলীদের তখা খালেকদের বাড়িতে। ঐ বাড়িতে অবস্থানের পনের দিনের মধ্যেই আরমান বুঝতে পারে এ বাড়িতে ঘর জামাই আরশেদ আলীর তেমন কর্তৃত্ব নেই। তার শ্বশুর একদিন আরমানকে ডেকে বলে, শোন আরমান! নাতি-নাতনিদের পড়ালেখার সুবিধার জন্য আমার পক্ষ থেকে তোমাকে লজিং রাখার ব্যবস্থা করা হয়েছে। তোমার খাবার দাবার সব তো আমারই যোগান দিতে হবে। তাই নাতি-নাতনিদের পড়ালেখা তোমার করাতে হবে। শুনেছি তুমি কৃষিকাজেও নাকি পটু!

না, তেমন না। বাবা নেই তো। সেজন্য আমাদের জমিটুকুর চাষাবাদ তো আমাকেই করতে হয়।
-হ্যাঁ, যেহেতু অভিজ্ঞতা আছে, আমার কৃষি কাজেও মাঝে মধ্যে একটু সহযোগিতা করো।


আরমান কোনো জবাব দেয় না। ভেতরে ভেতরে ক্ষুব্ধ হয় এবং মনে মনে বলে, আমাকে কৃষি শ্রমিকের মত ব্যবহার করতে চাও বুড়ো। তোমাদের অন্নের কী এতই মূল্য। তিনটা ছেলে-মেয়েকে পড়াই, তবু অন্নমূল্য শোধ হয় না। থাকতে তো দিয়েছো খড়ের কুঁড়ে ঘরে।

আরমান কিছুদিনের মধ্যেই যে তথ্যটি জানতে পেরেছে, তা শুনে ভেতরে ভেতরে সে দ্রোহী হয়ে উঠে। সে যে একজন আলবদরের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছে- এ বিষয়টা ক্রমাগতই তাকে পীড়া দেয়। মনে মনে বলে, একাত্তরের ছাব্বিশ জুলাই কলমাকান্দা উপজেলার নাজিরপুরের যুদ্ধে আমার বাবা শহীদ হলেন। শহীদ মুক্তিযোদ্ধার ছেলে হয়ে আমি কিনা শেষে আলবদরের বাড়িতে থেকে পড়াশোনা করছি? ছিঃ।

আত্মখেদে মনে মনে কথাগুলো বলে কেমন যেন মানসিক উত্তেজনায় ভোগে সে। ঐ তথ্য জানার পর ঐ বাড়ির সবগুলো মানুষের প্রতিই এক ধরনের অকথ্য ঘৃণাবোধ জন্ম নেয় তার। কেবল ঘৃণা হয় না তিনটি ছাত্র-ছাত্রীকে। তাই ওদের সান্নিধ্যে এলে সে একটু উৎফুল্ল¬ হয়। নয়তো সারাক্ষণ বিষণœ হয়ে থাকে। তার এ বিষন্নতা দৃষ্টিগ্রাহ্য হয় কলেজের বন্ধুদের কাছে। ক্লাসে তার মতই এক পিতৃহীনের সাথে বেশি ঘনিষ্ঠতা তার। বন্ধুটি আরমানের বিষণœতার কারণ জানতে চায়। খুব পীড়াপিড়ির এক পর্যায়ে আরমান তার মনোকষ্টের কারণ জানায়। সবশুনে বন্ধুটি বলে, হায়- হায়! তাহলে তুমি কি এ এলাকার কুখ্যাত আলবদর ঐ খালেকদের বাড়িতেই থাকো? ঐ খুনিরাই তো একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের সময় আমার পিতাকেও …..

  • বলো কী !
    -হ্যাঁ ! ঐ কুখ্যাত আলবদরদের ঘৃণ্য ও জঘন্য হত্যাকান্ডের জন্য এ অঞ্চলে অনেকেই আমাদের মতই পিতৃহীন।
  • এ কাজ কর না বন্ধু। আমি আর ঐ ঘৃণ্য বাড়িতে থাকতে চাই না। আমার জন্য একটা লজিং খুঁজে দাও না। অন্য লজিং বাড়ি পেলেই আমি ঐ বাড়ি ছেড়ে চলে আসব।

কিন্তু অত সহজে তো আর সুবিধাজনক লজিং বাড়ি খুঁজে পাওয়া যায় না। আরমান ধৈর্য্য ধরে। লজিং বাড়িতে এলেই কেমন যেন আনমনা হয়ে যায়। কিছু ভালো লাগে না তার। ভেতরের অন্তর্দহন নিয়ে সে কলেজের একটা লম্বা ছুটিতে বাড়ি যায়। বিধবা মাকে ঘটনা খুলে বলে। সবশুনে মা তো আৎকে উঠেন। উদ্বেগের স্বরে বলেন, এখন কী করবিরে আরমান?
-চিন্তা করো না মা। আমার এক বন্ধু ফিরোজ। আমার মতই। মুক্তিযুদ্ধের সময় আলবদরদের হিটলিস্টে নাম অন্তর্ভূক্ত থাকায় শহীদ হয়েছেন তার বাবা। সে বলল, একটা লজিং এর ব্যবস্থা করে দেবে।
-আচ্ছা, তাই কর। শহীদ মুক্তিযোদ্ধার ছেলে কখনোই খুনি আলবদরদের বাড়িতে নিরাপদ হতে পারে না।
-এ বিষয়ে আমিও সচেতন। তার ওপর ঐ বাড়ির লোকগুলোও কেমন যেনো অমানবিক বলেই মনে হয়।

  • বলিস কী? তোকে খাওয়া-দাওয়ায় বা অন্য কোনোভাবে কষ্ট দেয় কি ওরা?
  • তেমন কিছু না মা !
    -বাড়িতে এসেই কি নিস্তার পাস! ভোর থেকে পড়ালেখা। তারপর সকালে মাঠে যাস। গ্রীষ্মের রোদে পাটক্ষেত নিড়ানো। আখ ক্ষেতে ঘামে ভেজা শরীরে কোদাল দিয়ে নিড়ানির কাজ করা। ধারালো আখের পাতার আঁচড়ে দুই হাতের নানা স্থান কেটে কেমন যেনো কালো হয়ে গেছে। এত কষ্ট করে লেখাপড়া করিস। তার ওপর দুমোঠো ভাতের জন্য লজিং বাড়ির অমানবিক আচরণ হজম করতে হয় তোর!

এসব বলতে বলতে আরমানের মার দু’চোখ জলে ভিজে যায়। কলেজ খোলার ক’দিন পর আরমানকে লজিং বাড়িতে যেতে হয়। কারণ, বাড়িতে চাষাবাদের কাজটা তো তারই সামাল দিতে হয়। লজিং বাড়ি গিয়ে দেখতে পায় খালেক তার স্ত্রীকে নিয়ে বাড়ি এসেছে। দুদিন বাড়িতে অবস্থান করেছে। সেদিন স্ত্রীকে বাড়িতে রেখে সন্ধ্যার ট্রেনে ঢাকায় চলে যাবে খালেক।

বিকেলে বাড়ির উঠোনে আরমানের সাথে মুখোমুখি দেখা হয় খালেকর। আরমান অবাক চোখে চেয়ে থাকে। পলকহীন দৃষ্টিতে দেখে যুদ্ধাপরাধী খালেকের চোখ ও মুখের প্রচ্ছদ। খালেক আরমানের ক্ষুরধার দৃষ্টি দেখে ভেতরে ভেতরে কেমন যেনো চমকে ওঠে। ও দৃষ্টিতে তো সেইসব দৃষ্টির অভিব্যক্তি ফুটে ওঠে। যে সব দৃষ্টিকে এড়াতে সে আত্মগোপন করে থাকে। স্বল্প কথার আলাপ পরিচয় শেষে উভয়েই উভয়ের আশ্রয়ে চলে যায়।

সন্ধ্যার ট্রেনে খালেক ঢাকার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হয়। ওদিকে বাড়িতে অবস্থানকারী অন্ত:স্বত্বা খালেকের স্ত্রীর সাথে এরই মধ্যে আরমানেরও পরিচয় হয়। একই ক্লাসে পাঠরত দুজনই। অন্ত:স্বত্বা হওয়ায় আয়শার শরীর ভারী হচ্ছে ক্রমশ: আরমান ভাবে আয়শার দেহে খুনি আলবদরের সন্তান ধীরে ধীরে বড় হচ্ছে। সেও একদিন ভূমিষ্ঠ হবে। বাড়াবে ওদের বংশধর। রাত যখন গভীর হচ্ছিল, গর্ভ-যন্ত্রণায় আয়শা কুকিয়ে কুকিয়ে মা-গো, বাবা-গো বলে তার বেদনা প্রকাশ করছিল। এক সময় সেও ঘুমের গভীরে তলিয়ে গেলো।

রাত যখন প্রায় দুটো বাজে তখনি ঐ বাড়িতে অনেকগুলো মানুষের পদচারণার শব্দ শোনা গেলো। অতর্কিতে বাড়িটির প্রতি ঘরের দরজায় মুখোশধারী সশস্ত্র লোকগুলো অবস্থান নিলো। একে একে সবগুলো ঘর তল¬াশী করলো ওরা। জানতে চায় খালেক কই ? সবাই বলল, বাড়িতে নেই। ঢাকায় চলে গেছে। তবু ওরা শান্ত হয়নি। বাড়ির সব মানুষকে একত্রে জড়ো করা হলো। খালেকের ঘরে নেয়া হলো- তার মা-বাবা, বোন-ভাগ্নে এবং আরমানকেও। সবার সামনে খালেকের স্ত্রীকে ওদের নেতা বলল, জেনে শুনে একজন খুনি আলবদরকে বিয়ে করলে কেন?

স্ত্রী আয়শা ভয়ে কম্পমান। দু’ঠোঁটে কোনো কথা ফুটে না। নেতা আবার বলে, গর্ভে তো ধারণ করেছো ঐ আলবদরের সন্তান। খুনি খালেক তো কত মায়ের সন্তানকে হত্যা করেছে। তেমনি যদি তোমার পেটের সন্তান সহ …..

  • না, ও কথা বলো না !
    ভয়ে আৎকে উঠে মনে মনে বলে আয়শা। ওদের নেতা আবার ভারী গলায় বলে উঠে, আমরা মানে মুক্তিযুদ্ধে স্বজন হারানো মানুষেরা এসেছিলাম খুনি আলবদর খালেককে ধরতে। পারিনি। এবারও বিফল হলাম। তবে একদিন তাকে ধরা দিতেই হবে। আমরা অপেক্ষায় থাকব- দিন-মাস-বছর, যুগ-যুগান্তর। আজ আমরা তার অপরাধের শাস্তি নির্দোষ মানুষের ওপর চাপিয়ে দেব না।

এই বলে নেতা চোখ তুলে আয়শার দিকে তাকায়। অনুযোগের স্বরে বলে, তুমি কেনো জেনে-শুনে যুদ্ধাপরাধীকে বিয়ে করলে ! আবার সন্তানও ধারণ করেছো গর্ভে। সে জন্য তোমার কিছুটা দন্ড তো নিতেই হবে।
ওদের এমন কথা শুনে ভয়ে শিউরে উঠে আয়শা। একই ঘরে জড়ো করা অন্যান্যরা তখন ভয়ে স্তব্ধবাক। এবার নেতা গোছের লোকটি আরমানের দিকে তাকিয়ে বলে, তুমি-একজন শহীদ মুক্তিযোদ্ধার সন্তান হয়ে আলবদরের বাড়িতে কী করে আশ্রয় নিলে? ধিক তোমাকে ! ছি:।

আরমান মুখ নিচু করে দাঁড়িয়ে থাকে। ততক্ষণে ওদের নেতাটি দৃঢ় কণ্ঠে ফের আয়শাকে লক্ষ্য করে বলে, শোন তুমি। আলবদরের স্ত্রী বলে এবং তোমার গর্ভে ঘৃণ্য আলবদরের সন্তান ধারণ করেছো বলে আমরা তোমাদের ঘৃণা করি। এ জন্য আমরা এখন তোমার ঐ মসৃণ মুখে সকলে মিলে থুথু নিক্ষেপ করে ঘৃণা প্রকাশ করছি। বলেই লোকটা আয়শার মুখে একদলা থুথু নিক্ষেপ করে। সাথে সাথে অনুচরদের একই কায়দায় থুথু দিতে আদেশ দেয়। উপস্থিত বিশ-পঁচিশজন লোকের ঘৃণার থুৎকারে মুহূর্তে ভরে যায় আলবদরের স্ত্রীর মুখ-মন্ডল, মাথা ও চুল।র

খড়ের ঘরের দরজায় সেদিন ভোরে কড়া নাড়ার শব্দে ঘুম ভেঙেছিল আরমানের। দরজা খুলে দেখলো তার ছোট ছাত্র পড়ানোর জন্য ডাকতে এসেছে।

এই তো সেই আলবদর এবং তার স্ত্রী। যুদ্ধাপরাধী এই আলবদরের নামে সুনির্দিষ্ট কোন অভিযোগ আছে কিনা আরমান জানে না। তবে মুক্তিযুদ্ধকালে আলবদর রাজাকারদের হাতে নিহত লোকদের স্বজনরা তো প্রতিশোধ পরায়ণ হয়ে রাতের আঁধারে তাকে খুঁজতো। ঐ সব লোকেরা তার বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ করবে না হয়তোবা। যদি সুনির্দিষ্ট অভিযোগ না থাকে তাহলে কি এই আলবদর নেতার বিচার হবে না?

এমন একটা প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে আরমান যখন চলমান ট্রেনের দোলাচলে দুলতে থাকে, তখনি সে কান পেতে শুনতে পায় সেই প্রশ্নের জবাব। দ্রুত ধাবমান ট্রেনটি তার চলার ছন্দে বলে চলছে, “বিচার হবে- বিচার হবে।” আরমান ট্রেনটির সমিলছন্দের ঐ রকম জবাবের সাথে একাকার হয়ে সুর মিলিয়ে যায়- “বিচার হবে- বিচার হবে।’’

আবু সাইদ কামাল

আবু সাইদ কামাল

জন্ম:- ৫ জানুয়ারি ১৯৫৯, ধামাইল, গফরগাঁও।

পেশা- সরকারি চাকুরী (অবঃ)

আগ্রহ- ছড়া, কবিতা, গল্প, উপন্যাস, নাটক ও প্রবন্ধ।

সম্পাদনা - পাদদেশ, ছোটদের সাহিত্য, ছড়াপাতা, বইশিল্পী।

প্রকাশিত গ্রন্থ-

ছড়াগ্রন্থ -
আলোফোটা ভোরের ছড়া, আন্ধাখালির বাঁকে, নির্বাচিত ছড়া ১ম ও ২য় খন্ড

কবিতাগ্রন্থ-
শেষ বিকেলের রোদ, বিনষ্ট হয়ে যায় উঠতি ফসল, বাংলাদেশ এক অখণ্ড কবিতা

গল্পগ্রন্থ -
চুড়ি ফিতা আলতা, গারো হাজং ও অন্যান্যদের গল্প, নির্বাচিত গল্প

কিশোর গল্পগ্রন্থ-
সোয়া ডজন ভৌতিক গল্প, কিশোর মুক্তিযুদ্ধের গল্প, সোনার সিঁড়ি 

উপন্যাস-
সুমিতা হাজং, দূরত্ব, ভাঙন, ঠিকানা, বাহাতি তানিয়া, মা হারা

প্রবন্ধগ্রন্থ-
মাতৃকূলভিত্তিক গারো সমাজ, হাজংদের অতীত বর্তমান

নাটক-
অপবাদ

ইমেইল- abushayedk@yahoo.com

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

%d bloggers like this: