আবদুল হালিম খাঁ রচিত শাহজালালের জায়নামায উপন্যাসের শৈল্পিক নির্মিতি

আবদুল হালিম খাঁ (জন্ম-১৯৪৪) কবি হিসেবেই সমধিক পরিচিত। ছড়া, কবিতা, গল্প, উপন্যাস ও প্রবন্ধ রচনায়ও তাঁর সৃষ্টিশীলতা পাঠক ও সমালোচক মহলে সুবিদিত। তিনি একজন ঐতিহ্যবাদী লেখক। তিনি ঐতিহ্য ধারণ করেছেন তাঁর রচনাবলিতে। শাহজালালের জায়নামায (২০০৫) ঐতিহ্যবাহী ঐতিহাসিক উপন্যাসধর্মী আখ্যান। এ আখ্যানে লেখকের মনোভূমিতে লালিত স্বপ্ন-কল্পনা বীরযোদ্ধা শাহজালালের কর্মময় জীবনে উদ্ভাসিত হয়েছে। ইসলামী জীবনাদর্শের দীপ্ত সাধক, ধর্মপ্রচারক ও মানবতাবাদী মহান নেতা শাহজালালের আধ্যাত্মিকতা ও মহানুভবতা আলোচ্য উপন্যাসে উপজীব্য হিসেবে প্রকটিত হয়েছে।

উপন্যাস বাংলা সাহিত্যের অধুনাতম বাহন। দেশকালের পরিপ্রেক্ষিতে মানব জীবনের বৃহত্তর আঙিনা উপন্যাসে পরিব্যাপ্ত হয়। উপন্যাসের ধারণ ক্ষমতা অপরিসীম। মানব জীবনের অন্তঃভাগ এবং বহিঃভাগ-এর বিচিত্র অনুষঙ্গ, দ্বন্দ্ব-সংঘাত, জীবনযাত্রা প্রণালী ও জীবনাদর্শ অনায়াসে চিত্রিত হয় এ শিল্পমাধ্যমে। জীবন রূপায়ণের শিল্পমাধ্যম হচ্ছে উপন্যাস। তাই বলে উপন্যাস কিন্তু জীবন নয়, জীবনের প্রতিবিম্ব। জীবনের তাৎপর্যপূর্ণ বিকাশে উপন্যাসের ভূমিকা অপরিসীম। একটি আদর্শ উপন্যাসে প্লট, চরিত্র, সংলাপ, দ্বন্দ্ব, পরিপ্রেক্ষিত ও জীবন দর্শন লেখকের রচনাশৈলীতে মূর্ত হয়ে ওঠে। যদিও বিভিন্ন চরিত্রের বিকাশ উপন্যাসে পরিলক্ষিত হয়, তথাপি লেখকই উপন্যাসের মূল চরিত্র ও জীবন দর্শনের প্রতিভূ। লেখকের রচনায় পাঠক একাত্ম হয়ে যান, লেখক-নির্মিত জগতকে পাঠক নিজের ভুবন বলেই গ্রহণ করে।

আবদুল হালিম খাঁ বেশ কয়েকটি উপন্যাস রচনা করেছেন। তাঁর উল্লেখযোগ্য উপন্যাসগুলির নাম- শাহজালালের জায়নামায, স্বপ্ন দিয়ে গড়া, কাশ্মীরের পথে-প্রান্তরে, খেদাও, কালো ছেলের অবাক কান্ড, দোয়েল পাখির বিশ্বভ্রমণ, নতুন পৃথিবীর স্বপ্ন ইত্যাদি। শাহজালালের জায়নামায উপন্যাসটি বাংলা সাহিত্য পরিষদ, ঢাকা থেকে প্রকাশিত। এ গ্রন্থটি লেখকের প্রথম উপন্যাস। এ উপন্যাসে ২৫টি শিরোনামবিশিষ্ট পরিচ্ছেদ রয়েছে। পরিচ্ছেদের শিরোনাম পড়লেই আলোচ্য বিষয় স্পষ্ট হয়ে ওঠে। শিরোনামগুলি হল- ‘আযান, ‘নাম, ‘কুরবানী, ‘নেমে এল বিপদ, ‘রাজার স্বপ্ন, ‘রক্তের বিনিময়, ‘সম্রাটের দরবারে, ‘বাংলার পথে, ‘গান আর গান, ‘প্রতীক্ষার পর, ‘আশ্চর্য রকম স্বপ্ন, ‘ইয়ামেনের পথে, ‘আউলিয়ার দরবারে, ‘নতুন সেনাপতি, ‘মিলন মোহনা, ‘অলোকা, ‘ভেঙে গেল ধনুক, ‘অলোকার চিঠি, ‘কে সেই মহাপুরুষ, ‘রাজপ্রাসাদ পড়লো খসে, ‘তৈরি হলো আস্তানা, ‘জালালী কবুতর, ‘মারো তীর, ‘সিল্-হট ও ‘আমাকে উদ্ধার করো শাহজালাল’।

উপন্যাসের আখ্যান শুরু ‘আযান’ দিয়ে। শেখ বোরহান উদ্দীন নামের আরবীয় বণিকের শিশুপুত্র শেখ জালাল উদ্দীনের আকিকা উপলক্ষে গরু জবেহ ও তার গোশত বিতরণ, ঘটনাক্রমে আকিকাকৃত গরুর গোশত পাখি কর্তৃক বহনের সময় গৌড় গোবিন্দের মন্দিরের সামনে পড়ে যাওয়া, মুসলিমদের প্রতি হিন্দু রাজার আক্রোশ, শিশু জালালকে রাজার নির্দেশনায় মন্দিরে বলিদান এবং শিশু জালালের মাতা-পিতার হস্ত কর্তন, সিলেটের মজলুম মুসলিম জনতাকে হিন্দু রাজার অত্যাচার থেকে রক্ষার মানসে শেখ বোরহান উদ্দীন কর্তৃক বাংলার সুলতান ইলিয়াস শাহের নিকট গমন ও প্রতিকার প্রার্থনা, ইলিয়াস শাহ কর্তৃক স্বীয় পুত্র সিকান্দর শাহের নেতৃত্বে সৈন্য প্রেরণ ও ব্যর্থতা, পুনরায় শেখ বোরহান উদ্দীনের দিল্লি গমন এবং বাদশাহ ফিরোজ শাহ তুঘলকের কাছে প্রতিকার প্রার্থনা, দিল্লির বাদশাহ ফিরোজ শাহ কর্তৃক সেকান্দর গাজির নেতৃতে ¡সৈন্য প্রেরণ, ইয়েমেন থেকে শাহজালালের ভারতবর্ষে আগমন, ভারতের দিল্লিতে ঘটনাক্রমে সেকান্দর গাজির সেনাবাহিনির সঙ্গে শাহজালালের যোগদান, সিলেটে আগমনের পথে তাঁর জায়নামাযে চড়ে নদী পার হওয়া, রাজা গৌড় গোবিন্দকে দ্বীনের দাওয়াত প্রদান, গৌড় গোবিন্দের মোনাফেকি আচরণ ও পতন ; একই সাথে ইতিহাস, ঐতিহ্য, আধ্যাত্মিকতা, যুদ্ধ ও প্রেম- আলোচ্য উপন্যাসে বিবৃত হয়েছে।

এ উপন্যাসের অসংখ্য চরিত্রের মধ্যে উল্লেখযোগ্য চরিত্র হলো-সাধক পুরুষ হযরত শাহজালাল (রহঃ), শেখ বোরহান উদ্দীন, হামিদা বানু, শেখ জালাল উদ্দীন, জনৈক দরবেশ, সুলতান ইলিয়াস শাহ, সুলতান সিকান্দর শাহ, রেজাশাহ, অলোকা ওরফে নুরুন নাহার, সম্রাট ফিরোজ শাহ তুঘলক, সেনাপতি সেকান্দর গাজি, সেনাপতি নাসির উদ্দীন, আলিফ ব্যাপারি, খাজা নিযাম উদ্দীন আউলিয়া, রেজা শাহ, জালালী কবুতর, রাজা গৌড় গোবিন্দ, আচক নারায়ণ, সেনাপতি চক্রপানি, মন্ত্রী মনা রায়, সভাসদবর্গ, সেনাবাহিনি ও সাধারণ জনগণ।

এ উপন্যাসের প্রধান চরিত্র হযরত শাহজালাল রহঃ (১১৯৭-১৩৪৭)। এ চরিত্রটি ঐতিহাসিক, আধ্যাত্মিক ও শৌর্য-বীর্যের অধিকারী অনুপম চরিত্র। তাঁর জন্ম, শিক্ষা, বেড়ে ওঠা ও কর্মময় জীবনের অনুপুঙ্খ বর্ণিত হয়েছে উপন্যাসের পরতে পরতে। সুদূর ইয়েমেনের হেজাজ প্রদেশে হযরত শাহজালাল (রহ.) এর জন্ম। পিতার নাম মুহাম্মাদ। বাল্যকালেই তাঁর মাতা-পিতা পরপারে পাড়ি জমান, ফলে তিনি তাদের স্নেহ-ভালবাসা থেকে বঞ্চিত হন। এ অবস্থায় তাকে মায়ের আদর ও পিতার স্নেহ দেওয়ার জন্য এগিয়ে আসেন তার মামা সৈয়দ আহমদ কবীর। তার মামা ছিলেন আধ্যাত্মিক সাধক-ওলিয়ে কামেল। তিনি স্বীয় ভাগ্নের চোখ-মুখ দেখেই বুঝলেন – এ কোন সামান্য শিশু নয়। মহান স্রষ্টা এ শিশুকে দিয়ে পরবর্তীকালে নিশ্চয় কোন মহান কাজ সম্পন্ন করবেন। আহমদ কবীর থাকতেন তুরস্কের কুনিয়া শহরে। তিনি ভাগ্নেকে
সেখানে নিয়ে গেলেন। তাঁকে কুরআন, হাদিস, তাফসির, ইলমে ফিকাহ্ ও ইলমে তাসাউফ শিক্ষা দিলেন। তারপর দুআ’ করলেন-
ইয়া রব্বুল ইজ্জত শাহজালালকে আপনার প্রিয় বান্দাদের অন্তর্ভুক্ত করে নিন। আপনার সেবায় তাকে নিয়োজিত করুন। সে যেন সর্বদা আপনার চিন্তা, আপনার ধ্যানে ও আপনার কাজেই ব্যস্ত থাকে। যাবতীয় পার্থিব আসক্তি তার অন্তর থেকে দূর করে দিন এবং সমাজ ও জাতির সংস্কারের কাজে নিয়োজিত করে তাকে জগত বরেণ্য করুন। (পৃ.৫৫)

মহান রব্বুল আলামিন আহমদ কবীরের প্রার্থনা কবুল করলেন। মাত্র ষোল বছর বয়সে শাহজালালের জ্ঞানচর্চা ও আধ্যাত্মিকতার সুনাম চতুর্দিকে ছড়িয়ে পড়ল। হাজার হাজার কণ্ঠে চারদিক হতে তার প্রশংসা উচ্চারিত হতে লাগল। তুরস্কে অবস্থানকালেই শাহজালাল র. স্বপ্নযোগে রসুল স. এর নির্দেশনা পেলেন। যে নির্দেশনায় তাকে হিন্দুস্তানে যাওয়ার কথা বলা হয়েছে। তিনি তার মামা আহমদ কবীরকে স্বপ্নের কথা জানালেন। তার মামা তাকে হিন্দুস্তান (ভারতবর্ষে) গমনের পরামর্শ দিলেন এবং তাকে দুটি উপহার দিলেন :
এক : মৃগচর্মে নির্মিত জায়নামায। যে জায়নামাযে বসলে আসমান-জমিনের সবকিছু তিনি অবলোকন
করতে পারবেন। সব সমস্যার সমাধান খুঁজে পাবেন।
দুই : এক মুঠি মাটি। যে স্থানের মাটির সাথে এই মাটির রং ও গন্ধ মিলে যাবে, সেখানেই হবে তার
কর্মস্থল।

শাহজালাল তার মামার নিকট থেকে বিদায় নিয়ে হিন্দুস্তানে গমনের পূর্বে তার জন্মস্থান ও পূর্বপুরুষদের বাসভূমি ইয়েমেনের রাজধানীতে গিয়ে হাজির হলেন। তার উদ্দেশ্য – পূর্ব পুরুষদের কবর জিয়ারাত এবং শেষবারের মত জন্মভূমি দেখা।

ইয়েমেনের সুলতান ছিল খুব চতুর ও পাপাসক্ত। তার রাজ্যে নানা অরাজকতা বিরাজমান ছিল। কিন্তু এ অরাজকতা নিধনে তার কোন ভূমিকা ছিল না। সে সর্বদা মদ পান, জুয়া ও ব্যভিচারে মগ্ন থাকতো। ফলে দুষ্ট প্রকৃতির লোকেরাও তার পথ অনুসরণ করতো। কিছুদিনের মধ্যেই রাজা কঠিন রোগে আক্রান্ত হয়ে পড়ে। দেশের বিখ্যাত কবিরাজ ও হেকিমরা তাদের চিকিৎসায় রাজাকে সুস্থ করতে পারলো না। সুলতান বুঝলো, তার মৃত্যুর সময় ঘনিয়ে এসেছে। সে শেষ মুহূর্তে কোন কামেল পিরের হাতে তাওবা করে শান্তি পেতে চায়। তার সভাসদগণ সুলতানের ইচ্ছানুযায়ী হজরত শাহজালালকে রাজদরবারে নিয়ে এলেন। কিন্তু পাপিষ্ঠ সুলতান তার জীবন-সায়াহ্নে এসেও কুমতলব পরিত্যাগ করতে পারলো না। সে পিরে কামেল হজরত শাহজালাল রহ.কে পরীক্ষা করার জন্য বিষমিশ্রিত এক গ্লাস সরবত পান করতে দিল। লেখকের ভাষায়-
শাহজালাল সরবতের গ্লাস হাতে নিয়ে আধ্যাত্মিক বলে বুঝতে পারলেন এতে সাংঘাতিক বিষ মিশানো হয়েছে, সাধারণ মানুষের জন্য জীবন নাশক হলেও তার জন্য সরবত- সরবতই, সুস্বাদু ও সুগন্ধযুক্ত। শাহজালাল সভাসদদের লক্ষ্য করে বললেন- এ সরবত পান করতে আমার আপত্তি নেই, তবে সুলতানের ন্যায় অবিশ্বাসী ও খলকে আমি মুরীদ করবো না। এ রূপ পাপিষ্ঠ লোকের জন্য আল্লাহর কঠোর শাস্তি অপেক্ষা করছে।

অতঃপর শাহজালাল বিসমিল্লাহ বলে দ্বিধাহীন চিত্তে সেই বিষ মিশ্রিত সরবত পান করলেন। আল্লাহর অসীম কুদরতে সেই তীব্র বিষ শাহজালালের দেহে কোন প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করলো না, এমনকি তার চেহারার রংও বিন্দুমাত্র পরিবর্তিত হলো না।
আল্লাহর কি মহিমা! শাহজালাল সেই বিষ পান করার সাথে সাথে পাপিষ্ঠ সুলতানের দেহে তীব্র বিষের যন্ত্রণা আরম্ভ হলো। এবং ভয়ানক যন্ত্রণায় চিৎকার করতে করতে মৃত্যুবরণ করলো। (পৃ.৫৮-৫৯)

সুলতানের মৃত্যুর পর রাজ্যের সভাসদবর্গ সুলতান-পুত্র শেখ আলীকে সিংহাসনে প্রতিষ্ঠিত করতে মনস্থ করলো। কিন্তু শেখ আলী ছিলেন দুনিয়ার প্রতি নিরাসক্ত মর্দে মুমিন। তিনি রাজ-ক্ষমতা গ্রহণে অনীহা প্রকাশ করলেও শাহজালালের পরামর্শে সুলতানের দায়িত্ব গ্রহণ করলেন। অতঃপর শাহজালাল তাকে নানা অসিয়ত করে ভারতবর্ষের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করলেন। যাত্রার প্রারম্ভে তাঁর মামা প্রদত্ত মাটি তাঁর শিষ্য প্রখ্যাত আলিমে দ্বীন ও ভূতত্ত্ববিদ শেখ ওসমানের কাছে হস্তান্তর করলেন। যে স্থানের মাটির সঙ্গে এই মাটির বর্ণ ও গন্ধ মিলে যাবে, সেই স্থানই হবে তাদের কর্মস্থল। শেখ ওসমানও গুরুপ্রদত্ত এই দায়িত্ব স্বানন্দচিত্তে গ্রহণ করলেন। অতঃপর শাহজালাল বাগদাদ, সমরকন্দ, কিরমানশাহ, গজনী, মূলতানসহ প্রভৃতি স্থান অতিক্রম করে দিল্লি এসে উপস্থিত হলেন। দিল্লি এসে খাজা নিযাম উদ্দিন আউলিয়া (রহ.) এর সঙ্গে তাঁর সাক্ষাৎ হয়। দুই আধ্যাত্মিক সাধকের ভ্রাতৃত্ববোধ সম্প্রীতিতে পূর্ণতা পায়।

শাহজালাল দিল্লিতে বেশি দিন অবস্থান করলেন না। কারণ রাসুল স. এর স্বপ্ন ও তাঁর মামার নির্দেশনা অনুযায়ী একটি স্থায়ী কর্মক্ষেত্রের অনুসন্ধানে তিনি অত্যন্ত উদ্বিগ্ন ছিলেন। তাঁর মামা প্রদত্ত মাটির রঙ ও গন্ধ কোথাকার মাটির সঙ্গে মিলে যায়, তা দেখার জন্য তিনি খুব অস্থির হয়ে পড়েন। খাজা নিযাম উদ্দিন আউলিয়া তাঁর বন্ধুর মনের অবস্থা বুঝতে পারলেন এবং তাঁকে এক জোড়া কবুতর উপহার দিলেন। তিনি বললেন, এ হলো শান্তির কবুতর, একে খাঁচায় রাখতে হবে না, আপনি যেখানে যাবেন – এ কবুতর জোড়া উড়ে উড়ে আপনার সাথে যাবে এবং পথ নির্দেশ করবে।

পরবর্তীকালে এ কবুতর জোড়া থেকে অসংখ্য কবুতরের জন্ম হয়, যা পরবর্তীকালে জালালী কবুতর নামে খ্যাত। এবং এখনও এ কবুতরের বংশ বিদ্যমান।

দিল্লি অবস্থানকালে সিলেটের একটি দুর্ঘটনা শাহজালালকে সিলেট গমনে অনুপ্রাণিত করে। দুর্ঘটনাটি হলো : সিলেটের জনৈক মুসলিম বাসিন্দা শেখ বোরহান উদ্দীন মান্নত করেছিলেন যে, তাঁর একটি পুত্র সন্তান জন্মগ্রহণ করলে তিনি একটি গরু জবাই করে আকিকা দেবেন। যথাসময়ে তাঁর একটি পুত্র সন্তান জন্মগ্রহণ করলে তিনি গরু জবাই করে স্বীয় মান্নত পুরা করেন। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত একটি চিল উক্ত গরুর এক টুকরা গোশত নিয়ে স্থানীয় এক রক্ষণশীল ব্রাহ্মণের বাড়িতে ফেলে। উক্ত ব্রাহ্মণ গো-হত্যার এই ঘটনাটি তৎকালীন সিলেট অঞ্চলের রাজা গৌড় গোবিন্দের নিকট জানিয়ে এর প্রতিকার দাবি করেন। রাজা গৌড় গোবিন্দ উক্ত ঘটনার প্রতিকার স্বরূপ শেখ বোরহান উদ্দীনের নবজাতককে মন্দিরে বলী এবং বোরহান উদ্দীনের ডান হাত কর্তনের নির্দেশনা জারি করেন ও তা কার্যকর করেন। এ ঘটনার পর শেখ বোরহান উদ্দীন স্বাধীন বাংলার রাজধানী গৌড়ের সুলতানের কাছে গমন করেন ও এর প্রতিকার প্রার্থনা করেন। গৌড়ের সুলতান তাঁর ভাগ্নে ও জামাতা সিকান্দার খান গাজীকে সিলেটের রাজার বিরুদ্ধে অভিযানে প্রেরণ করেন। কিন্তু সিলেটের যাদুকর রাজার কাছে সিকান্দার খান পরাজিত হন। গৌড়ের সুলতান সিকান্দার খানের সহায়তায় সেনাপতি নাছির উদ্দিনকে অতিরিক্ত সৈন্যসহ প্রেরণ করেন। ঠিক সে সময়েই শাহজালাল রহ. তাঁর ৩৬০ জন অনুসারীসহ তাদের সঙ্গে যোগ দেন এবং গৌড় গোবিন্দের বিরুদ্ধে যুদ্ধে জয়ী হন। গৌড় গোবিন্দ পরাজিত হয়ে আসামের পার্বত্য অঞ্চলে পলায়ন করেন এবং সিলেট অঞ্চল গৌড়ের মুসলিম শাসনাধীনে আসে। বাংলার সুলতান আলাউদ্দিন হোসেন শাহের (১৪৯৩-১৫১১) আমলে হজরত শাহজালালের নামে উৎসর্গকৃত সিলেট অঞ্চলের এক শিলালিপি থেকে জানা যায় যে, সিকান্দর খান গাজী কর্তৃক বাংলার সুলতান ফিরোজ শাহ দেহলভীর রাজত্বকালে (১৩০২-১৩২২) ৭০৩ হিজরিতে ( ১৩০৩ খ্রিঃ) সিলেট অঞ্চল বিজিত হয়। উল্লেখ্য, সুলতান ফিরোজ শাহ দিল্লির সুলতান গিয়াস উদ্দিন বলবনের (১২৬৬-১২৮৭) নাতি ছিলেন। (ড. শাহ মো. শফিক উল্লাহ, বার্ষিকী ৯৩, শাহজালাল হল,চট্টগ্রাম বিম্ববিদ্যালয়)- এ ঐতিহাসিক উপাদানকে লেখক তাঁর উপন্যাসের আখ্যান ও চরিত্রের উৎস হিসেবে গ্রহণ করেছেন।

ঔপন্যাসিক ইতিহাসের মূল সত্যকে অবিকৃত রেখে হজরত শাহজালালের সিলেট আগমনকে স্বীয় কল্পনার রঙে রঞ্জিত করেছেন। লেখক দেখিয়েছেন, সম্রাট ফিরোজ শাহের সেনাপতি সৈয়দ নাসির উদ্দিন হজরত শাহজালালের শিষ্যত্ব গ্রহণ করে সিলেটে আগমনের পূর্বে তাঁর দুআ’ কামনা করলেন। হজরত শাহজালাল রহ. সেই মুহূর্তে তার জন্য মহান রবের দরবারে প্রার্থনা করলেন এবং জানালেন যে, তিনি ও তাঁর ৩৬০ জন সহচরও তাদের সঙ্গে সিলেটে যাবেন। অতঃপর শাহজালাল রহ., ৩৬০ জন দরবেশ, নাসির উদ্দিন, বোরহান উদ্দিন ও সৈন্য-সামন্ত সিলেট অভিমুখে যাত্রা করলেন। ব্রহ্মপুত্র নদের তীরে সিকান্দর গাজির বাহিনির সঙ্গে মিলিত হলেন। সেখানে কয়েকদিন অবস্থান করে তাঁরা নদী পার হওয়ার সমস্যা নিয়ে শাহজালালের সঙ্গে পরামর্শ করলেন। কেননা, রাজা গৌড় গোবিন্দের অনুসারীরা নদী থেকে নৌকা সরিয়ে ফেলেছিল। শাহজালাল বললেন-
আজই মাগরিবের ওয়াক্তে আমরা নদী পার হবো। …
আজ মাগরিবের নামাযের ইমামতি করব আমি। তোমরা সবাই আমার পিছনে নামাযের নিয়ত করে তাহরিমা বাঁধার সাথে সাথে চোখ বন্ধ করে রাখবে। যখন আমি নামায শেষে সালাম ফিরাবো তোমরা সালাম ফিরাবে এবং তারপর চোখ খুলবে। …
নামায শেষে সালাম ফিরিয়ে চোখ মেলে দেখলেন সবাই নদীর পূর্ব পারে। সাথের মালসামান যা যা ছিল সবই ঠিক ঠাক এপারে তাদের সাথে। (পৃ. ৭১-৭২)

পরের দিন ভোরে মুসলিম বাহিনি কুমিল্লার দিকে যাত্রা শুরু করল। কুমিল্লা পৌঁছেই শাহজালাল তাঁর বিশাল বাহিনি নিয়ে অগ্রসর হলেন চৌকি নামক স্থানের দিকে। চৌকি পাহাড় থেকেই গোবিন্দের সৈন্যরা ইতঃপূর্বে সিকান্দর শাহের সৈন্যদের উপর আক্রমণ চালিয়েছিল। এবারও মুসলিম বাহিনি এখানে পৌঁছামাত্র গোবিন্দের সৈন্যরা পূর্বের কায়দায় পাহাড়ের আড়ালে লুকিয়ে থেকে ঝাঁকে ঝাঁকে বিষাক্ত তীর নিক্ষেপ করতে লাগলো। কিন্তু মহান স্রষ্টার অপার মহিমায় শাহজালালের দুআ’র বরকতে হিন্দু সৈন্যদের নিক্ষেপকৃত তীর এবার আর মুসলিম সৈন্যদের শরীরে বিদ্ধ হল না, তাদের নিক্ষেপকৃত প্রতিটি তীরই শন শন শব্দে ফিরে গিয়ে নিক্ষেপকারীর শরীরে বিদ্ধ হতে লাগলো। মুহূর্তের মধ্যেই হিন্দু সৈন্যরা মারে-বাবারে-মরলামরে বলে চিৎকার দিয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়তে লাগলো। আপনাপন তীরের আঘাতে গোবিন্দের অসংখ্য সৈন্য নিহত ও আহত হলো। এই আশ্চর্যজনক ঘটনায় অবশিষ্ট সৈন্যরা দ্রুত পালিয়ে প্রাণ রক্ষা করলো। গোবিন্দ তার সৈন্যদলের এরূপ বিপর্যয় শ্রবণে অত্যন্ত ভীত-সন্ত্রস্ত হলো।

হজরত শাহজালাল তাঁর বিশাল বাহিনি নিয়ে সতরসতী পরগণার ফতেহপুরে এসে যখন পৌঁছালেন, তখন সন্ধ্যা ঘনিয়ে এসেছে। তাঁরা আর অগ্রসর না হয়ে সেখানেই রাত যাপন করলেন। পরের দিন ফজরের নামাজের পর বরাক নদীর তীরে এসে উপস্থিত হলেন। কিন্তু মুসলিম বাহিনির আগমন সংবাদ পেয়ে রাজা গৌড় গোবিন্দের সৈন্যরা পূর্ব থেকেই নদী থেকে সব ধরণের বাহন সরিয়ে নিয়েছিল। নদী পার হওয়ার চিন্তায় সৈন্যরা চিন্তিত হয়ে পড়লো। শাহজালাল সবাইকে আশ্বাস দিয়ে বললেন, বন্ধুগণ, চিন্তার কোন কারণ নেই। সমস্যার সমাধান আল্লাহ্ করে দেবেন। আল্লাহর রহমতে আমরা নদী পার হয়ে যাব। নৌকায় চড়ে নদী পার হওয়া তো অনেক ঝামেলা। কয়েক হাজার লোকের নৌকায় নদী পার হতে অনেক নৌকা ও সময়ের ব্যাপার। তার চেয়ে আমরা সহজেই নদী পার হয়ে যাচ্ছি। এই বলেই তিনি হাতের জায়নামায পানির উপর বিছিয়ে নিজে গিয়ে তাতে দাঁড়ালেন। তাঁর পিছনে তাঁর শিষ্যরা, তারপর সৈন্য-সামন্ত ও রসদ; সবাই জায়নামাযে দাঁড়াতেই প্রবল স্রােতের উপর দিয়ে তরতর করে মুহূর্তের মধ্যে ওপার গিয়ে পৌঁছালো জায়নামায। সৈন্য-সামন্ত শিষ্যবর্গ আগে নামলেন তীরে, তারপর শাহজালাল তীরে নেমে জায়নামায পানি থেকে উঠিয়ে নিলেন। সৈন্যগণ মহান আল্লাহ্ তায়ালার অপরিসীম দয়ার জন্য শুকরিয়া আদায় করলেন এবং আল্লাহু আকবার ধ্বনি দিয়ে আকাশ-বাতাস প্রকম্পিত করলেন। তাদের মনোবল আরো বৃদ্ধি পেল, এ নদীও তাঁরা জায়নামাযের উপর পাড়ি দিলেন।

একাদিক্রমে কয়েকটি কঠিন বাঁধা অতিক্রম করে হজরত শাহজালাল যখন তার বিশাল বাহিনি নিয়ে রাজধানীর অতি নিকটে উপনীত হলেন, তখন রাজা গৌড় গোবিন্দ বুঝলেন- এবার তার পতন অত্যাসন্ন। রাজা তার সৈন্যবাহিনি রাজধানীর চতুর্দিকে মোতায়েন করলেন। তিনি দূত মারফত অবগত হলেন যে, মুসলিম সেনাবাহিনির মধ্যে একজন অলৌকিক ক্ষমতাসম্পন্ন মহাপুরুষ আছেন। তাঁর আধ্যাত্মিক শক্তির বলেই এসব অসম্ভব কাজ সম্পন্ন হচ্ছে। তাঁর হাতে রয়েছে একটি মৃগচর্মের জায়নামায। সেই জায়নামায বিছিয়ে হাজার হাজার সৈন্য নিয়ে তিনি নদী পার হচ্ছেন, পাহাড়ের উপর দিয়ে উড়ে যেতে পারেন, কোথায় কি ঘটছে জায়নামাযে বসে সব দেখতে পারেন। রাজা চিন্তা করতে লাগলেন, যে ব্যক্তি এমন আধ্যাত্মিক ক্ষমতার অধিকারী, যিনি আমাদের সৈন্যের নিক্ষিপ্ত তীর ফিরিয়ে দিয়ে আমাদের সৈন্যকেই হতাহত করলেন, তার সাথে যুদ্ধে জয়লাভ সুদূর পরাহত। সে কারণে রাজা গৌড় গোবিন্দ মনে মনে কৌশল নির্ধারণে ব্যস্ত সময় পার করেন। রাজার অস্ত্রাগারে একটা বিরাট লোহার ধনুক ছিল , সেটাতে কেউ কোন দিন জ্যা পরাতে পারে নি। এই ধনুক দিয়েই ওদেরকে কাবু করার পরিকল্পনা গ্রহণ করে। সে দূত মারফত শাহজালালকে জানায়-
মহাশয় জানতে পারলাম যে, আপনি একজন সাধক মহাপুরুষ। যদি সত্যি তাই হয় আপনার সঙ্গে আমার কোন বিবাদ নেই।

আমি সম্পূর্ণ বিনা শর্তে আপনার নিকট আত্মসমর্পণ করে আমার রাজ্য আপনার হাতে তুলে দেবো এবং খুশিমনে আপনার নিকট আপনার ধর্ম গ্রহণ করবো। তবে আপনি সত্যি সাধক পুরুষ কি না তা আমি পরীক্ষা করে দেখতে চাই।

আমার অস্ত্রাগারে একটা ধনুক আছে। আপনি অথবা আপনার পক্ষের কোন লোক যদি অই (ওই) ধনুকে জ্যা যোজন করতে পারেন তবে বুঝবো যে, আপনি সত্যি একজন মহাপুরুষ। কিন্তু যদি এ কাজে এসে ব্যর্থ হন, তবে আমি তাকে প্রাণদন্ড দেবো। (পৃ.৭৬-৭৭)

রাজা গৌড় গোবিন্দ মনে মনে ভাবতে লাগলো যে, এই অসাধ্য সাধনের জন্য অন্য কেউ তো আসবেই না, যদি আসে তবে সেই মুসলমান ফকিরই আসবে, আর এই অজুহাতে যদি তাকে হত্যা করতে পারি তবে বিজয়ের পথের সব কাঁটা দূর হয়ে যাবে।

হজরত শাহজালাল রাজা গৌড় গোবিন্দের দূতকে বলে দিলেন যে, আগামী কাল আমার পক্ষের যে কোন একজন গিয়ে তেমাদের রাজার ধনুকে জ্যা পরাবে। দূত সংবাদ নিয়ে রাজার কাছে চলে গেল। রাজা গৌড় গোবিন্দ তার কৌশল সফল হওয়ার আশায় মনে আনন্দ অনুভব করতে লাগলেন। পরদিন সকালে সেনাপতি নাসির উদ্দিন শাহজালালের দুআ’ নিয়ে রাজার অস্ত্রাগারে গেলেন, এবং ধনুকে জ্যা পরিয়ে ধনুকটি ভেঙে ফেললেন। বীর নাসির উদ্দিনের এই সাহসী ও শক্তিশালী কান্ড দেখে রাজা ও তার সহচরগণ নির্বাক ও স্তম্ভিত হয়ে গেলেন। কিন্তু রাজা তার প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী ইসলাম গ্রহণ ও পরাজয় স্বীকার করলেন না। তার ভাষায়- ‘ মুসলমানদের আমি ঘৃণা করি, মনে প্রাণে ঘৃণা করি। তারা আমার শত্রু, আমাদের জাতশত্রু। তাদের কাছে আমি অবনত হতে যাব না।’(পৃ.৯৬) রাজা প্রকাশ্যে মুসলমানদের ঘৃণা করলেও সাধক পুরুষ হজরত শাহজালালকে দেখার জন্য সাপুড়ের সাপের ঝুড়িতে করে মুসলিম শিবিরে গিয়ে হাজির হলেন। সাপুড়িয়া মুসলিম সেনা শিবিরে সাপ খেলা দেখানোর অনুমতি নিয়ে তার কার্যক্রম শুরু করল। সে একটা ঝুড়ির মুখ খুলে সাপ বের করে সাপ খেলা দেখিয়ে সেটা রেখে আরেকটা ঝুড়ি থেকে আরেকটা সাপ বের করে। হজরত শাহজালালও কৌতূহলবশত সেখানে উপস্থিত ছিলেন। একটি ঝুড়ি ছাড়া সব ঝুড়ি খুলে সাপ খেলা দেখানোর পর হজরত শাহজালাল বললেন, তোমার ওই ঝুড়ির সাপ বের কর। কিন্তু সাপুড়ে ওই ঝুড়িটি খুলতে সম্মত হল না। হজরত শাহজালাল কাশ্ফের মাধ্যমে আগেই অবগত হয়েছিলেন যে, গৌড় গোবিন্দ সাপুড়িয়ার ঝুড়ির ভেতর বসে তার সামনে উপস্থিত হয়েছে। তিনি সেই ঝুড়িটার দিকে লক্ষ্য করে বললেন – ‘ হে গৌড় গোবিন্দ, তুমি আমার সাথে যথেষ্ট বিশ্বাসঘাতকতা করেছ। কিন্তু আর নয়, যদি ঝুড়ি থেকে বের হয়ে না আস, তবে চিরজীবন তোমাকে সাপ হয়ে অই(ওই) ঝুড়ির মধ্যে থাকতে হবে।’(পৃ.১০০)

হজরত শাহজালালের কথা শুনে গৌড় গোবিন্দের অন্তর আত্মা কেঁপে উঠলো। সে দ্রুত ঝুড়ি থেকে বের হয়ে এসে হজরত শাহজালালের সামনে অবনত মস্তকে ক্ষমা প্রার্থনা করলো। বললো : হে মহাপুরুষ, আপনি সত্যি মহাসাধক, সত্য ধর্মে আছেন। আমাকে ক্ষমা করুন, আমার প্রাণভিক্ষা দিন। হজরত শাহজালাল বললেন :
হে গৌড় গোবিন্দ, তোমার বিগত জীবনের ইতিহাসের পাতা একবার পাঠ করে দেখ। কি কলঙ্ক কালিমায় মাখা তোমার জীবন। তুমি ছিলে দেশের রাজা। জাতি ধর্ম নির্বিশেষে প্রজাপালন করাই রাজার সর্বপ্রধান ধর্ম। তোমার কর্তব্য ছিল সবার প্রতি ন্যায় বিচার করে দেশে শান্তি প্রতিষ্ঠা করা, কিন্তু তুমি সেই পথ সম্পূণরূপে পরিহার করে প্রজাপীড়নের নীতি অবলম্বন করেছিলে। তোমার অন্যায় অত্যাচারে তোমার সব প্রজাই অসন্তুষ্ট হয়েছিল, মাত্র মুষ্টিমেয় তোমার কয়েকজন মোসাহেব ব্যতীত। মুসলমানদের প্রতি অত্যাচার তো সব সীমা ছাড়িয়ে গিয়েছিল।…
মনে করে দেখ শেখ বুরহান উদ্দীনের শিশুপুত্রকে কিরূপ নির্মম ক্রোধে হত্যা করেছিলে, তার ও তার স্ত্রীর হাত কিরূপ হিংস্রতার বশবর্তী হয়ে কেটে দিয়েছিলে। তুমি খুনী।…কত মুসলিম প্রজার নিকট থেকে জুলুম করে পূজার চাঁদা নিয়েছ, কত মুসলিম প্রজাকে নামাজ পড়ার কারণে পথের পাশে গাছে ঝুলিয়ে ফাঁসি দিয়েছ। বলো, এগুলো অপরাধ নাকি রাজার রাজ্যশাসন নীতি ?
আরো শুনেছি তোমার লাল বাহিনী মুসলমানদের মাথার টুপি কেড়ে নিয়েছে, জোর করে তাদের দাড়ি কেটে দিয়েছে। তুমি মুসলমানদের ধর্মগ্রন্থ আল কুরআন জ্বালিয়ে দিয়েছ, নামাযের জায়নামায ময়লায় নিক্ষেপ করেছ। বলো এসব মিথ্যা না সত্য?
গৌড় গোবিন্দ সম্পূর্ণ নিরুত্তর- নির্বাক। … সে সম্পূর্ণ দোষ স্বীকার করে করজোড়ে ক্ষমা প্রার্থনা করতে লাগল। (পৃ. ১০১-১০২)

হজরত শাহজালাল সম্পূর্ণ বিনা শর্তে আল্লাহর দিকে চেয়ে রাজা গৌড় গোবিন্দের অপরাধ ক্ষমা করে দিলেন। তারপর তার নিজের ও দেশের কল্যাণের জন্য তাকে ইসলাম গ্রহণের আহবান জানালেন। রাজা গৌড় গোবিন্দ শাহজালালের এমন উদারতা ও মহৎ ব্যবহারের পরিচয় পেয়ে বিস্মিত হয়ে গেল। সে ভেবেছিল, মুসলমানরা তাকে ধরতে পারলে জবেহ করে তার গোশত টুকরা টুকরা করে শেয়াল কুকুর দিয়ে খাওয়াবে। সে যে এত সহজে পার পেয়ে যাবে, তা স্বপ্নেও চিন্তা করেনি। তার মাথার উপর চেপে পড়া বিশাল এক পাহাড় যেন হঠাৎ সরে গেল। সে যেন মৃতদেহে পুনরায় প্রাণ ফিরে পেল। সে হজরত শাহজালালের পায়ের কাছে লুটিয়ে পড়ে বললো – হে হজরত আমাকে আপনার পবিত্র ধর্মে দীক্ষা দিয়ে ধন্য করুন। আমার জীবন সফল করার সুযোগ করে দিন। হজরত শাহজালাল তাকে কালিমাতুত্ তাইয়িবা পাঠ করিয়ে ইসলামী জীবন ব্যবস্থায় দীক্ষা দিলেন। রাজা গৌড় গোবিন্দ পবিত্র কালিমা পাঠ করে মুসলিম হলো এবং আরো বললো , ‘হুজুর , আগামী দিন আমার পরিবারের সব সদস্যকে আপনার কাছে নিয়ে আসবো, তারা ইসলাম গ্রহণ করবে।’ এই বলে সে দ্রুত রাজপুরীর দিকে চলে গেল।

রাজা গৌড় গোবিন্দ ছিল হাড়ে হাড়ে শয়তান, মিথ্যাবাদী ও বিশ্বাসঘাতক। তার ইসলাম গ্রহণ ছিল ধোকার নামান্তর। প্রাণ বাঁচানোর জন্য সে আত্মসমর্পণ ও ইসলাম গ্রহণ করেছিল। তার ইসলাম গ্রহণ ছিল শুধু মৌখিক- অন্তরে নয়। সে রাজপুরীতে গিয়ে তার ইসলাম গ্রহণের কথা গোপন রাখে এবং মুসলমানদের কাছে আত্মসমর্পণ না করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। সে সপরিবারে লৌহনির্মিত দুর্গের সর্বনিম্ন কক্ষে প্রবেশ করে। পরের দিন হজরত শাহজালালের কাছে সপরিবারে তার যাওয়ার প্রতিশ্রুতি থাকলেও সে যায়নি, ফলে হজরত শাহজালাল তার প্রতি অত্যন্ত রাগান্বিত হলেন এবং তাকে শাস্তি দেওয়ার জন্য মন স্থির করলেন।

পরদিকে সিলেটের পার্শ্ববর্তী রাজ্য তরফের হিন্দু রাজা আচক নারায়নও মুসলিম প্রজাদের নিপীড়নে অগ্রণী ভূমিকা পালন করতো। হজরত শাহজালাল তাকে সমুচিত শিক্ষা দেওয়ার মানসে সেনাপতি নাসির উদ্দিনের নেতৃত্বে তিন হাজার পদাতিক ও এক হাজার অশ্বারোহী সৈন্য দিয়ে অভিযানের নির্দেশনা দেন। মুসলিম বাহিনির সঙ্গে রাজা আচক নারায়নের সেনাবাহিনির তুমুল যুদ্ধে আচক রাজার সৈন্য-সামন্ত পর্যুদস্ত হয়, রাজা প্রাণভয়ে সপরিবারে আসামে পালিয়ে যায়। নাসির উদ্দিনের নেতৃত্বে তরফ রাজ্যে মুসলিম বাহিনির বিজয় পতাকা উত্তোলিত হয়। হজরত শাহজালাল তরফ রাজ্য বিজয়ে মহান রব্বুল ইজ্জতের শোকর গুজার হন এবং নাসির উদ্দিনকে ওই অঞ্চলের শাসক নিযুক্ত করেন।

রাজা গৌড় গোবিন্দ যেহেতু হজরত শাহজালালের সঙ্গে প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করেছে, সেহেতেু তার জন্য অপেক্ষা করছিল কঠিন পরিণতি। শাহজালাল যখন জানতে পারলেন গোবিন্দ লৌহনির্মিত কক্ষে আত্মগাপন করেছে, খন তিনি তাঁর শিষ্য শাহচটকে মৃগচর্মের জায়নামাযে দাঁড়িয়ে উচ্চস্বরে আযান দেওয়ার নির্দেশ দিলেন। আযান দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে গৌড় গোবিন্দ নির্মিত সাত তলা বিশিষ্ট প্রাসাদ ভেঙে চুরমার হয়ে গেল। লেখকের ভাষায় :

আযান শেষ হলো। প্রাসাদটিও ভেঙে মাটিতে পড়া শেষ হয়ে গেল। শাহচট যখন আযান দিচ্ছিলেন তখন দের ইটগুলো এত জোরে শব্দ করে ছুটে ছুটে – পড়ছিল যে কামানের গোলার মত আওয়াজ হচ্ছিলো। চারদিকে মাঠে ঘাটে রাজপথে যেসব লোকজন ছিল তারা সবাই আযানের অলৌকিক ঘটনা দেখে বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গেল।(পৃ.১০৯)

রাজা গোবিন্দ রাজ প্রাসাদের অদূরে দূর্গের তলদেশে লৌহনির্মিত কক্ষে অবস্থান করে তার প্রাসাদ ধ্বংস হওয়ার চিত্র প্রত্যক্ষ করলেও নিজে বাঁচার জন্য বেরিয়ে আসেনি, বরং তার সেনাপতিকে নির্দেশ দিয়েছিল-হজরত শাহজালালের গায়ে তীর মারতে। তাদের সে প্রচেষ্টা ব্যর্থ হলে সৈন্য-সামন্ত সবাই পালিয়ে যায়। হজরত শাহজালাল দুর্গের পাশে দাঁড়িয়ে উচ্চারণ করেন ‘সিল হট্’। এ শব্দদ্বয় উচ্চারণের সঙ্গে সঙ্গে রাজার এ দুর্গটিও ভেঙে পড়তে থাকে। সপ্তম তলা থেকে তৃতীয় তলা পর্যন্ত ভেঙে যাওয়ার পর দয়াবান শাহজালাল রাজা গৌড় গোবিন্দকে শেষবারের মত বাঁচার সুযোগ দিলেন। তিনি বললেন
বেরিয়ে এসো, বেরিয়ে এসো। যদি বাঁচতে চাও, যদি পরিবারের লোকজনকে বাঁচাতে চাও, তবে বেরিয়ে এসো।
এসো। এখনো তোমাকে বাঁচার সুযোগ দিচ্ছি।
জেনে রেখ এবারই শেষ কথা- শেষ সুযোগ। (পৃ.১২৩)

রাজা গোবিন্দ দেখলো, তার রাজ প্রাসাদ এবং দুর্গও ধ্বংস হয়ে গেল, সৈন্য-সামন্তও উধাও, নিজের আত্মজাও পিতৃপক্ষ ত্যাগ করেছে, সবই তো শেষ হয়ে গেল। এখন আছে সুরক্ষিত দুর্গের লৌহ নির্মিত অংশ। এটুকু নিশ্চয় থাকবে। এটুকু ধ্বংস করতে পারলে তো একবারেই ধ্বংস করে ফেলতো। এ চিন্তা-ভাবনা করে গোবিন্দ হজরত শাহজালালের কথায় কোন গুরুত্ব না দিয়ে স্বীয় পত্নীর সঙ্গে হাসি-তামাশায় মেতে উঠলো। আর আল্লাহ রব্বুল আলামিনের গজব তার ওপর তখনই নেমে এলো।
হজরত শাহজালাল এবারো ‘হট্ যা’ বলার সাথে সাথে দুর্গের নিচের লৌহ নির্মিত প্রথম ও দ্বিতীয় তলার অংশ প্রচন্ড রকমের একটা ঝাঁকি দিয়ে কেঁপে উঠলো। এক হাজার ফুট তলিয়ে গেল রাজা গৌড় গোবিন্দের দুর্গ। কেউ আর বের হতে পারলো না।

হজরত শাহজালাল রহ. এর দীক্ষাগুরু এবং তাঁর মামা পির আহমদ কবীর প্রদত্ত মাটির সাথে সিলেটের মাটির মিল খুঁজে পেলেন ভূতত্ত্ববিদ শেখ ওসমান। তিনি জানালেন মাটির প্রতিটি কনায় কনায় মিল রয়েছে। হজরত শাহজালাল রহ. মহান স্রষ্টার দরবারে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করলেন। এবং এ স্থানকেই স্বীয় কর্মস্থল হিসেবে গ্রহণ করলেন। তিনি টিলার ওপর একটি আস্তানা নির্মাণ করলেন। তাঁর সঙ্গে যে তিন শত ষাট জন কামেল ওলি ছিলেন তাদেরকে খেলাফাত দিয়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে ইসলাম প্রচারের কাজে নিযুক্ত করলেন।

আলোচ্য উপন্যাসে হজরত শাহজালাল রহ. এর সহযোগী চরিত্রগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন- শেখ বুরহান উদ্দিন, হামিদা বানু, শেখ জালাল উদ্দিন ; দরবেশ, সুলতান ইলিয়াস শাহ, সুলতান সিকান্দর, অলোকা ওরফে নুর নাহার, সম্রাট ফিরোজ শাহ তুঘলোক, সেনাপতি সেকান্দর গাজী, সেনাপতি নাসির উদ্দিন, খাজা নিযাম উদ্দিন, রেজা শাহ, জালালী কবুতর এবং তাঁর সহচরবৃন্দ।

শেখ বুরহান উদ্দিন, হামিদা বানু এবং শেখ জালাল উদ্দিন একই সূত্রে গাঁথা তিনটি চরিত্র। স্বামী-স্ত্রী ও সন্তান এই সম্পর্কে উপন্যাসে তাঁরা চিত্রিত হয়েছেন। বুরহান উদ্দিন একজন আরবীয় বণিক। এদেশে ব্যবসা করতে এসেছিলেন। তবে ব্যবসাই তার মূল উদ্দেশ্য নয়। মূল উদ্দেশ্য এদেশে ইসলাম প্রচার। ব্যবসা করতে এসে তিনি দেখলেন এ দেশটি শস্য শ্যামলে পরিপূর্ণ সুন্দর ছবির মত। কিন্তু এদেশের মানুষ অধিকাংশই মূর্তিপূজারি ও কুসংস্কারাচ্ছন্ন। ইসলাম ও আল্লাহ-রসুলের জ্ঞান তাদের নেই। মানুষ নানা পাপাচারে লিপ্ত। অত্যাচারীর অত্যাচারে মানুষ অতিষ্ঠ। গরু ছাগলের মত মানুষ বিক্রি হচ্ছে। কুশাগ্রবুদ্ধি কিছু সংখ্যক ব্রাহ্মণের চক্রান্তে মানুষে মানুষে সাম্য-সমতা ও ভ্রাতৃত্ববোধ লুপ্ত হয়েছে। সমাজে শ্রেণিভেদ সৃষ্টি হয়েছে। তাই এদেশে ইসলামের সত্য সুন্দর জীবনধারা প্রচারের উদ্দেশ্যে স্থায়ী অধিবাসী হয়েছেন শেখ বুরহান উদ্দিন। তার সঙ্গে আরো কয়েকজন ব্যবসায়ী এখানে স্থায়ীভাবে বসবাস করছেন। এদেশের নদ-নদী, মাঠ-ঘাট ও মানুষকে ভালবেসে ফেলেছেন তারা।

তারা ভেবেছিলেন অনাবাদী জায়গা-জমি আবাদ করবে, আল্লাহর দ্বীন প্রচার করবে, হক কথা বলবে, স্বাধীভাবে চলাফেরা করবে, তাতে তো আর কারো ক্ষতি হবে না। আযান দিলে যে রাজ্যেও আইন অমান্য হয়, কারো কানে খারাপ লাগে, মনে কষ্ট লাগে, বুরহান উদ্দিন তা কখনও ভাবেননি। তিনি একজন সৎ ব্যবসায়ী। ব্যবসা করে অঢেল সম্পদের মালিক হয়েছেন। তিনি খোদাভীরু, পরোপকারী, বন্ধু বৎসল ও অতিথিপরায়ণ। মুসলমানদের ধর্ম-কর্মে উৎসাহদাতা। অভাবী লোকদের সাহায্যকারী। এলাকার সবাই তার গুণে মুগ্ধ। সবার মুখে তার সুনাম সুখ্যাতি। কিন্তু কোন সন্তান না থাকায় স্বামী-স্ত্রী দু জনেই অসুখী।

তারা অনুক্ষণ ইবাদাতে মহান রবের কাছে সন্তান কামনায় দুআ’ করেন। তারা বলতে থাকেন, ‘হে প্রভু! পরওয়ারদিগার! আমাদেরকে একটি পুত্র সন্তান দান কর।’ গভীর রজনীতে তাহাজ্জুদ নামায পড়ে মহান আল্লাহ্ তায়ালার কাছে অশ্রসিক্ত নয়নে বুরহান উদ্দিন প্রার্থনা করলেন-
হে রব আমার, তুমি তো সর্বশক্তিমান। তুমি সবই করতে পারো। আমাকে একটি সন্তান দান করো। তার মাধ্যমে আমার বংশ রক্ষার সাথে সাথে তোমার দীনের দাওয়াত দেয়াও সম্ভব হবে। পুত্র সন্তান হলে তার শোকরানা স্বরূপ তোমার উদ্দেশ্যে একটি গরু কুরবানী করব। (পৃ.১০)

মহান রব্বুল ইজ্জত তাদের প্রার্থনা কবুল করেন। তাদেরকে একটি পুত্রসন্তান দান করেন। তারা মহান আল্লাহ তায়ালার দরবারে শুকরিয়া আদায় করেন। দুজনে মিলে সন্তানের নাম রাখেন শেখ জালাল উদ্দিন। ইতঃপূর্বে শেখ বুরহান উদ্দিন ‘মানত’ করেছিলেন ‘যদি তার পুত্র সন্তান হয়, তাহলে তিনি একটি গরু কুরবানী দিবেন।’ তিনি তার মানত অনুযায়ী প্রতিবেশীদের নিয়ে স্বীয় গরুর পালের সবচেয়ে সুন্দর এবং বড় ষাঁড়টি কুরবানী করে উক্ত ষাঁড়ের গোশত প্রতিবেশীদের মধ্যে বণ্টন করে দিলেন। কিন্তু সে সময়েই একটি দুর্ঘটনা ঘটে :

শেখ বুরহান উদ্দীনের বাড়ির ভিতর গরু যবেহ করে যখন গোস্ত কাটা হচ্ছিল, তখন কোথা থেকে একটা চিল এসে ছোঁ মেরে বেশ বড় এক টুকরো গোস্ত নিয়ে উড়ে গেল। উপস্থিত সবাই দেখলো। কিন্তু তখন তো চিল ধরার উপায় ছিল না। চিলে এক টুকরো গোস্ত নিয়ে গেল, এতে ভাবারই বা কি আছে।
চিল উড়ে যাবার সময় ঠিক রাজা গৌড় গোবিন্দের বাড়ির সামনে গেলে গোস্তের টুকরোটা চিলের মুখ থেকে খসে পড়ে গেল। কথায় বলে যেখানে বাঘের ভয় সেখানেই রাত হয়। (পৃ.১৪)

রাজা গৌড় গোবিন্দ যখন অন্দর মহলে স্বীয় স্ত্রীর সঙ্গে একান্ত আলাপচারিতায় মগ্ন ছিলেন, তখনই খবর এলো- দেবালয়ের সামনে গো-মাতার মাংস, যা চিলের মুখ থেকে পতিত হয়েছে। রাজা গোবিন্দের জীবিত অবস্থায় গো-মাতার ওপর এমন অত্যাচারের প্রতিশোধ নিতে সে মরিয়া হয়ে উঠল। রাজ্যময় ঘোষিত হল-যে এই অপকর্ম করেছে, তাকে উপযুক্ত শাস্তি দেওয়া হবে। ‘প্রয়োজনে একটাগো-হত্যার বদলে আমি দশটা মানুষকে বলী দেব।’ (৯পৃ.১৭)। অতঃপর সমগ্র রাজ্যে তল্লাশী করে শেখ বুরহান উদ্দীন, তার স্ত্রী হামিদা বানু এবং নবজাতক শেখ জালাল উদ্দীনকে রাজা গোবিন্দের সৈন্য-সামন্তরা বেষ্টন করে রাজ-দরবারে নিয়ে এলো। রাজা এই পরিবারের সদস্যদের জন্য কঠিন শাস্তি ঘোষণা করলো। ‘যে শিশুর জন্য গো-হত্যা করা হয়েছে সে গো-হত্যা পাপের প্রায়শ্চিত্ত স্বরূপ শিশুটাকে দেবতার সামনে বলী দিন। আর যে হাত দিয়ে বুরহান গো হত্যা করেছে সেই হাত কেটে দিন। বুরহানের স্ত্রীর হাতও কেটে দিন।’ (পৃ.২১)

রাজার হুকুম অনুযায়ী প্রথমে নবজাতক শেখ জালাল উদ্দীনকে হামিদা বানুর কোল থেকে ছিনিয়ে নিয়ে দেবতার পদতলে তাকে হত্যা করা হল। শেখ বুরহান উদ্দীন ও হামিদা বানু এই দৃশ্য দেখে বেহুঁশ হয়ে পড়ে গেলেন। সেই বেহুঁশ অবস্থায়ই তাদের দুজনের হাত কর্তন করা হল। পাপিষ্ঠ রাজা গোবিন্দ তারপর জল্লাদকে হুকুম দিল- শিশু জালালের কর্তিত দেহ এবং বুরহান উদ্দীন ও হামিদা বানুর দেহ খন্ডগুলি কুপিয়ে ছোট ছোট করে কুকুরকে খেতে দাও। জল্লাদ রাজার কথা অনুযায়ী উক্ত দেহখন্ডগুলি ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র করে কুকুরকে খেতে দিলেও কুকুর শুঁকে শুঁকে চলে গেল। একটাতেও মুখ দিল না। জল্লাদেরা হতবাক হয়ে গেল। গাছের ডালে কাক এবং আকাশে চিল উড়াউড়ি করলেও গোস্তের একটা টুকরাও তারা নিল না। জল্লাদেরো আরো বিস্মিত হল। জল্লাদেরা ভেবেছিল গোস্তের টুকরোসমূহ কুকুরগুলি খেয়ে ফেলবে, চিল-কাকে ছোঁ মেরে নিয়ে যাবে, কুকুরে রক্ত চেটে খাবে। তারপর পানি দিয়ে মুছে পরিষ্কার করে ফেলবে মন্দিরের আঙ্গিনা। কিন্তু বেলা ডুবে গেল, অন্ধকার নেমে এলো ; জল্লাদেরা মন্দিরের আঙিনা ছেড়ে একটু দূরে গিয়ে দাঁড়ালো। যেন শেয়ালগুলো এগিয়ে এসে গোস্তগুলো খেয়ে যায়। শেয়ালগুলো এগিয়ে এসে গোস্ত শুঁকে শুঁকে হুয়া হুয়া করে চলে গেল। একটা টুকরোতেও মুখ দিল না। জল্লাদেরা আরো অবাক হল। তারা তাদের চিন্তায় কোন সমীকরণ মিলাতে না পেরে ছুটে গেল সেনাপতি চক্রপানির কাছে। সেনাপতি ঘটনা শুনে অবাক হয়ে গেল। সে নিজেও কোন সিদ্ধান্ত দিতে না পেরে ছুটে গেল রাজা গোবিন্দের কাছে। রাজাও সর্ম্পূণ ঘটনা শুনে আশ্চর্যান্বিত হয়ে গেল। রাজা বললো- ওই গোস্তের টুকরোগুলি আগুনে জ্বালিয়ে দিতে, কিন্তু আগুনেও জ্বললো না। রাজা তার অনুচরদের বললো সব গোস্ত একত্রিত করে একটি ধামায় করে সুরমা নদীতে ভাসিয়ে দিতে। কিন্তু সেই গোস্তের টুকরোগুলি ভেসেও গেল না, আবার মাছেও খেল না। বরং গোস্তের মধ্য থেকে রক্ত ঝরে নদীর সম্পূর্ণ পানি লাল রং ধারণ করলো। সুরমা বিধৌত জনপদের অধিবাসী হিন্দু-মুসলিম সবাই এ ঘটনায় হতবাক হয়ে গেল। রাজা পড়ে গেল দুশ্চিন্তায়। রাজা তার সভাসদদের নিয়ে জরুরি সভা তলব করলো। সভায় দেশের গণ্য-মান্য গুণীজন হাজির হয়ে নিজেদের মতামত ব্যক্ত করলেও উল্লেখযোগ্য কোন সমাধান কেউ দিতে পারলো না। উক্ত সভায় হাজির ছিলেন এক দরবেশ। তিনি অত্যন্ত ভেবে-চিন্তে বললেন-

সুরমা নদীতে ধামা ভরে ফেলে দেয়া গোস্তগুলো তুলে আনতে হবে। তারপর গোস্তগুলো তিন ভাগ করে শিশু শেখ জালালের শরীরের গোস্ত এক ভাগ, হামিদা বানুর কর্তিত হাতের টুকরোগুলো এক ভাগ এবং শেখ বুরহানের হাতের টুকরোগুলো আরেক ভাগ করতে হবে। তারপর এই তিন ভাগের পৃথক তিন জানাজার নামায পড়তে হবে। নামায শেষে পৃথক পৃথক তিনটি কবর খুঁড়ে দাফন করতে হবে। আর সে কবর দিতে হবে রাজ্যের সর্বোচ্চ টোঙ পাহাড়ের উপর।

এই কাজটুকু করলেই সুরমা নদীর রক্ত দূর হয়ে পূর্বের মতো স্বচ্ছ পানি প্রবাহিত হবে। (৯পৃ.২৮)
দরবেশের পরামর্শে দরবারে উপস্থিত রাজাসহ সভাসদবর্গ ভীষণ খুশিহল। তাদের মাথার ওপর থেকে যেন ভারি বোঝা নেমে গেল। দরবেশের পরামর্শানুযায়ী সব কাজ সম্পন্ন করা হলো এবং দরবেশ নিজেই জানাজা ও দাফন-কাফনের ব্যবস্থা করলেন। দরবেশের কথামতআবার সুরমা নদীতে কাঁচা স্বচ্ছ পরিষ্কার পানি প্রবাহিত হতে লাগল। মুহূর্তে রাজ্যের অবস্থা স্বাভাবিক হয়ে গেল। রাজা ও রাজ্যের মানুষ হাঁফ ছেড়ে বাঁচলো। অতঃপর রাজা গৌড় গোবিন্দ দরবেশকে রাজ-দরবারে থাকার অনুরোধ করলেও তিনি তা প্রত্যাখ্যান করলেন এবং চলে গেলেন। এরপর কেউ আর তাঁকে দেখতে পায়নি।

দেবমন্দিরের সামনে শিশুপুত্রের হত্যাকান্ড বুরহান-হামিদা দম্পতিকে নিস্তব্ধ ও হতাশাগ্রস্ত করে দিয়েছিল। সেই মুহূর্তে তাদের হস্তকর্তন ছিল আরেক ন্যাক্কারজনক ঘটনা। শেখ বুরহান উদ্দীন সেই রক্তঝরা কাটা হাত আসমানের দিকে তুলে মহান রব্বুল ইজ্জতের দরবারে প্রার্থনা করলেন-
হে আল্লাহ! তুমি সমস্ত রাজ্যের অধিপতি, তুমি যাকে ইচ্ছা বাদশাহী দান করো এবং যার নিকট থেকে ইচ্ছা বাদশাহী কেড়ে নাও। … তোমার কাজে কেউ বাঁধা দিতে পারে না। আমার শিশুপুত্র জালালের রক্ত , আমার স্ত্রী হামিদা বানুর রক্ত এবং আমার এই কর্তিত হাতের রক্ত তুমি কবুল করো। এই রক্তের বিনিময়ে এই মহাপাপী জালিমের জুলুম থেকে এদেশের মানুষকে উদ্ধার করো। (পৃ.৩০)
শরীর থেকে রক্ত ঝরতে ঝরতে বুরহান উদ্দীন এবং তার স্ত্রী অত্যন্ত দুর্বল হয়ে পড়েছিলেন। তাঁরা আর উঠে বসতে পারছিলেন না। রাজার লোকজন ধরাধরি করে তাদেরকে বাড়িতে রেখে এলেন। বাড়ি ও মহল্লার লোকজনের কান্নাকাটিতে আকাশ-বাতাস প্রকম্পিত হয়ে উঠল। লেখক সে সময়ের অত্যন্ত করুণ চিত্র সফলতার সাথে অঙ্কন করেছেন।

গতকাল সবার বুকে ছিল আনন্দ, মুখে ছিল হাসি। আজ তাদের বুকে বিদ্ধ হয়েছে বেদনার শেল। চোখে নেমেছে অশ্রুর বান। সবার মুখে হায় আল্লাহ। একি হলো! বুরহান উদ্দীনের ভবিষ্যত আশার গোলাপ ধুলিস্মাৎ হয়ে গেল।(পৃ.৩০)

কিছুদিন পর বুরহান উদ্দীন কর্তিত হাতের যন্ত্রণা ক্রমান্বয়ে ভুলতে পারলেও পুত্র শোকের যন্ত্রণা ভুলতে পারলেন না। বুকে বিষাক্ত তীর বিদ্ধ যন্ত্রণার মত অনবরত ব্যথা অনুভব করতে লাগলেন তিনি। আল্লাহর দরবারে দীর্ঘ দিবস-রজনী প্রার্থনা ও ক্রন্দনের পর যে পুত্র সন্তান লাভ করেছিলেন, জালিমেরা সেই পুত্র কেড়ে নিল, নির্মমভাবে তাকে হত্যা করলো। এ ব্যথা তো প্রশমনের নয়। প্রতিবেশী-বন্ধু-বান্ধব তাঁকে সান্ত্বনা দেবার চেষ্টা করলো। কিন্তু সমবেদনা ও সান্ত্বনার বাণীতে পুত্রশোক দূর হওয়ার নয়। কিছুদিন পর সুস্থ হলে নিজের পুত্র সন্তান হত্যার বদলা এবং অসংখ্য নির্যাতিত মুসলিম জনতার মুক্তির জন্য মনে মনে পরকিল্পনা করতে থাকেন। এক পর্যায়ে তারা স্বামী-স্ত্রী মিলে পরামর্শ করলেন বাংলার স্বাধীন পাঠান সুলতান আবু মুজাফফর খাজা ইলিয়াস শাহকে অবহিত করে এই অন্যায়-অত্যাচারের প্রতিকার কামনা করবেন। পরিকল্পনা অনুযায়ী বুরহান উদ্দীন স্বাধীন বাংলার রাজধানী সুবর্ণ গ্রামে গিয়ে সুলতানের নিকট নিজের কর্তিত হাত দেখিয়ে এবং সব নির্যাতনের বর্ণনা দিয়ে এর প্রতিকার প্রার্থনা করলেন।

সুলতান ইলিয়াস শাহ গৌড় গোবিন্দের এ সব নৃশংস অপকর্মের কথা শুনে খুব দুঃখিত ও ক্রুদ্ধ হলেন। একদিকে বুরহান উদ্দীনের প্রতি নিষ্ঠুর অন্যায়-অত্যাচার, অপরদিকে পবিত্র ইসলাম ধর্মের অবমাননা তাকে খুবই বিচলিত করে তুললো। তিনি পাপিষ্ঠ দাম্ভিক গোবিন্দকে উপযুক্ত শিক্ষা দিতে দৃঢ় প্রতিজ্ঞা করলেন। সিলেটের রাজা গৌড় গোবিন্দ এবং তরফের রাজা আচক নারায়ন নানাভাবে মুসলিম প্রজাদের উপর নির্যাতন করে, যেমন- তরফ রাজ্যে নূর উদ্দিন নামে এক মুসলিম প্রজা ছেলের বিয়েতে গরু জবেহ করেছিল, এ অপরাধে আচক নারায়ন নূর উদ্দিনকেই জবেহ করে। এছাড়া হিন্দুদের বারো মাসে তেরো পূজার চাঁদা, রাজা-সেনাপতি-নায়েব মশাইদের ছেলে-মেয়ের বিয়ে ও জন্মদিন উপলক্ষে চাঁদা এবং জমির অতিরিক্ত খাজনা দিতে মুসলমানদের পেটে ভাত জোটে না।

ইলিয়াস শাহ সেই মুহূর্তে রাজা গৌড় গোবিন্দকে শাস্তি দেয়ার মানসে স্বীয় পুত্র সিকান্দর শাহের নেতৃত্বে সৈন্যদল প্রেরণ করেন। কিন্তু মুসলিম সেনাদল সিলেটে পৌঁছানোর পূর্বেই অতর্কিত হামলায় পর্যদুস্ত হন এবং অভিযান পরিত্যাক্ত হয়। ফলে বুরহান উদ্দীন সিকান্দার শাহকে শক্তিশালী করার প্রত্যয়ে দিল্লির বাদশাহ ফিরোজ শাহ তুঘলকের দরবারে গমন করেন। সেখানেও তিনি অত্যাচারী রাজা গৌড় গোবিন্দের অত্যাচারের ফিরিস্তি বর্ণনা পূর্বক প্রতিকার প্রার্থনা করেন। বাদশাহ ফিরোজ শাহ রাজা গৌড় গোবিন্দকে শাস্তিদানে সেকান্দর গাজীর নেতৃত্বে সৈন্যবাহিনি প্রেরণ করলেন। তাদের সাথে যুক্ত হলেন হজরত শাহজালাল। পরবর্তিকালে সৈয়দ নাসির উদ্দিনের নেতৃত্বে এবং হজরত শাহজালালের নির্দেশনায় তাঁরা সিলেটে উপনীত হন এবং রাজা গৌড় গোবিন্দকে পরাজিত করেন। সিলেট অঞ্চলে মুসলমানদের প্রতিষ্ঠার পশ্চাতে শেখ বুরহান উদ্দীনের ভূমিকা অপরিসীম গুরুত্ব বহন করে।

সুলতান ইলিয়াস শাহ স্বাধীন বাংলার সুলতান ছিলেন। প্রজাহিতৈষী শাসক হিসেবে তাঁর যথেষ্ট সুনাম ছিল। শেখ বুরহান উদ্দীন রাজা গৌড় গোবিন্দ কর্তৃক নির্যাতিত হয়ে প্রথমে তাঁর কাছেই উপস্থিত হয়েছিলেন। সুলতান ইলিয়াস শাহ সিলেট থেকে আগত বুরহান উদ্দীনের ব্যথায় সমব্যথী হয়ে সিলেটে স্বীয় পুত্র সিকান্দর শাহের নেতৃত্বে অভিযান পরিচালনা করেন। প্রথম বার অভিযানে ব্যর্থ হলেও দ্বিতীয় বারে সম্মিলিত বাহিনির সঙ্গে আবারও সেনাদল প্রেরণ করেন এবং মুসলমানদের সিলেট বিজয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।

রেজাশাহ এবং অলোকা ওরফে নুরুন নাহার এই উপন্যাসের রোমান্টিক চরিত্র। দুজন দুই ধর্মের অনুসারী হয়েও এক পর্যায়ে হৃদয়ের বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছেন। অলোকা ছিলেন রাজা গৌড় গোবিন্দের একমাত্র কন্যা। তাঁর পরিচয় প্রসঙ্গে লেখক বলেছেন, ‘অলোকা পরমা সুন্দরী, উচ্চ শিক্ষিতা, সুঠাম স্বাস্থের অধিকারী এবং যুদ্ধবিদ্যায় পারদর্শী।’ সেই অলোকাকে শুধু রাজনৈতিক কারণে তরফের রাজা আচক নারায়নের ছেলে আবীর নারায়নের সঙ্গে বিয়ের প্রস্তাব গ্রহণ করেন রাজা গৌড় গোবিন্দ। যদিও এ বিয়েতে অলোকার কোন সমর্থন ছিল না, তথাপি তিনি রাজ পরিবারের সন্তান হিসেবে সরাসরি বিরোধিতা না করে সুযোগের সন্ধান করতে থাকেন। বিয়ের দিন তারিখ ধার্য হয়। বর ও কনে পক্ষের প্রস্তুতি প্রায় শেষের দিকে। রাজ্যময় বিয়ের সাজে সজ্জিত। কিন্তু দুর্ভাগ্য রাজা গৌড় গোবিন্দের। রাজ্য হজরত শাহজালালের বাহিনি কর্তৃক আক্রান্ত হয়। রাজার কন্যার বিয়ের সব আয়োজন ভেস্তে যায়। অলোকা দেবী বাবার অমানবিক আচরণের বিরুদ্ধে আগে থেকেই প্রতিবাদ করে আসছিলেন। এবার রাজ্য আক্রান্তে তিনি তার মাকে আরো জানিয়ে দিলেন, ‘ আমি আর তোমাদের ভগবানে নেই। ভগবানকে আমি দেখেছি…।’

অপরদিকে কূটকৌশলী রাজা গৌড় গোবিন্দ শাহজালালের সেনাবাহিনিকে পরাস্ত করার মানসে এক অভিনব প্রস্তাব পাঠালেন। প্রস্তাবটি ছিল – তার অস্ত্রাগারে রক্ষিত বিশালাকৃতির ধনুকে শাহজালাল বা তার বাহিনির যে কেউ জ্যা পরাতে পারলেই তিনি বিনা শর্তে ইসলাম গ্রহণ করবেন, আর যদি জ্যা পরাতে ব্যর্থহন; তাহলে ওই ব্যক্তির প্রাণদন্ড দিবেন। হজরত শাহজালাল সেনাপতি নাসির উদ্দিন ও রেজা শাহকে ধনুকে জ্যা পরানোর জন্য পাঠালেন। নাসির উদ্দিন একাই ধনুকে জ্যা পরালেন এবং ধনুকে এত শক্তি প্রয়োগ করলেন যে, ধনুকটি ভেঙে খান্ খান্ হয়ে গেল। সিকান্দার শাহের সুযোগ্য সন্তান রেজা শাহও বীরত্বের অধিকারী। সিকান্দার শাহ ও গৌড় গোবিন্দের রাজ্য পাশাপাশি হওয়ায় রেজা শাহের কৃতিত্ব ইতঃপূর্বেই গৌড় গোবিন্দের দরবারে আলোচিত বিষয় ছিল।একবার গৌড় গোবিন্দের একটা পাগলা হাতি ছুটে গিয়ে সিকান্দার শাহের এলাকায় প্রবেশ করলে রাজার কোন লোকই সেই পাগলা হাতির সামনে দাড়াতে পারেনি। অথচ এই রেজা শাহ-ই সেই হাতির পিঠে না চড়ে চাবুকের আঘাতে শান্ত করেছিল। তারপর সেই হাতির পিঠে চড়ে তাড়িয়ে এনে রাজার হাতিশালায় বেঁধে দিয়েছিল এই রেজা শাহ। আরো একটি চমকপ্রদ ঘটনা হলো- গৌড় গোবিন্দের রাজ্য আক্রমণের এক বছর পূর্বে রাজ্যের সীমান্তে বনের ভেতর আনন্দ ভ্রমণে গিয়েছিল অলকা দেবী। ফেরার পথে সে পাহাড়ী দস্যু দ্বারা আক্রান্ত হয়। রেজা শাহও বনে গিয়েছিল হরিণ শিকারে। হঠাৎ বনের ভেতর নারীকণ্ঠের চিৎকার শুনে সে এগিয়ে যায়। দস্যুদের সঙ্গে রেজাশাহের একটা খন্ড যুদ্ধ হয়। সে দস্যুদের হাত থেকে অলোকাকে তার লুণ্ঠিত অলংকারসহ সখিদের উদ্ধার করে অতি সম্মানের সাথে রাজবাড়ি পৌঁছে দেয়। এসব কারণে রেজা শাহকে অলোকা দেবী মনের মণিকোঠায় স্থান দিয়েছিল। রাজবাড়িতে তাকে দেখে কাছে এসে আলাপচারিতাও শুরু করে দিয়েছিল। পরবর্তী সময়ে অলোকা তার মনের আকুতি জানিয়ে রেজা শাহকে একটি চিঠি লিখে প্রেরণ করে। তার প্রেরিত চিঠির চুম্বক অংশ নিম্নরূপ :

হে মহানুভব/ হে আমার প্রিয়তম হৃদয়
আমি রাজকন্যা। তুমি রাজপুত্র। রাজ্য দখল করতে এসেছো। রাজ্য দখল করার আগেই আমার হৃদয় দখল করে ফেলেছো। এখন কি করবে বলে? … আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম- ‘আমাকে উদ্ধার করতে এসেছো?’ তুমি বলেছিলে- ‘তোমাকে নয়, মজলুমদের’। আমি তো এখন মজলুম, ভীষণ মজলুম। এ মজলুমকে উদ্ধার করবে না? …

তুমি আমার বুকে যেন গোলাপের কাঁটার মত বিঁধে আছো। হৃদয় নদী ছুটে চলেছে, অন্য নদীতে মিশতে নয়, মিশবে সাগরে- তুমি আমার সেই সাগর। গোলাপ ফুটেছে, কিন্তু এ গোলাপ সুবর্ণগ্রামের বুলবুল ছাড়া অন্য কাউকে সুবাস দিবে না।…
এখন আমাকে তুমি রক্ষা করো, উদ্ধার করো, গ্রহণ করো। বাঁচাও।…

আমি প্রদীপের ফিতার মতোই জ্বলছি সারারাত। তুমি আমার হাত ধরো। উদ্ধার করো বাঁচাও। আমি শুধু তোমার জবাবের অপেক্ষায় রইলাম। যদি অনাদর করো, আবদার ফিরিয়ে দাও, দিতে পারো, আমি জ্বলে পুড়ে হাওয়ায় মিশে যাবো।… বৈশাখের খরায় কুসুম হৃদয় পুড়ে দগ্ধ হতে পারে। আবার ইচ্ছে করলে সুশীতল বৃষ্টির ধারায় স্নিগ্ধ করতে পারে। সবই মেঘের ইচ্ছে। তুমি একখন্ড জলভরা কালোমেঘ। ভেসে এসেছো আমার মাথার উপর। আমি ভূতল থেকে তাকিয়ে আছি তোমারই দিকে। (পৃ.৮৯-৯১)

অলোকার একান্ত দূত চরণ দাসের মাধ্যমে চিঠিটা পেয়ে রেজা শাহ খুব মনোযোগ সহকারে তা তিন বার পাঠ করলো। তারপর অনুধাবন করলো-একি ছলনা? নাকি সত্যিকার আত্মনিবেদন? সে চিন্তার সাগরে ডুবে গেল। তারপর ভাবলো- এভাবে যে নারী আত্মসমর্পণ করে, তা কখনো ছলনা হতে পারে না। তার বীর হৃদয় প্রেমরসে আর্দ্র হয়ে গেল। সত্য প্রেম বিশ্বে এক অপরাজেয় শক্তি। এ শক্তি অব্যর্থ। দুনিয়ার প্রতিটি জীবজন্তু, কীট-পতঙ্গ, পশু-পাখি, মানব-মানবী প্রেমের সূতায় বাঁধা।

রেজাশাহ অলোকার চিঠি পেয়ে বুরহান উদ্দীনের সঙ্গে অলোকা ও তার চিঠি প্রসঙ্গে বিস্তারিত পরামর্শ করলো। বুরহান উদ্দীন এই তরুণের কথায় হেসে বললেন, অলোকা যদি স্বেচ্ছায় ইসলাম গ্রহণ করে তবে তাকে গ্রহণ করতে পারো। অলোকা খুব সুন্দরী রাজকন্যা, উচ্চ শিক্ষিতা, তার স্বভাব চরিত্র ভাল। তাকে আমাদের কাছে আসতে লিখো। সে তো আসতেই চেয়েছে। তার আন্তরিকতাপূর্ণ বাসনা উপেক্ষা করা সমীচিন নয়। অলোকা এসে জালালের মায়ের কাছে থাকতে পারবে। তারপর তোমার বাবার সাথে আলাপ করে সব ঠিকঠাক করে দেবো। রেজাশাহ তখন বুরহান উদ্দীনের আশ্বাস পেয়ে খুবই আনন্দিত হলেন। বুরহান উদ্দীনের অনুমতি পেয়ে রেজাশাহ অলোকাকে লিখলো:
প্রিয়তম অলোকা

তোমার চিঠি পেয়ে আমি পরম আনন্দ হিল্লোলে আন্দোলিত হয়েছে।… তোমার চিঠির ভাষা তোমার মনের আকুল আকুতি আমার মনের সব দ্বিধা দ্বন্দ্ব ভেঙে দিয়েছে। … ইসলামের বিধান মতে একজন মুসলিম একজন অমুসলিম মেয়েকে বিয়ে করতে পারে না। তুমি যদি স্বেচ্ছায় ইসলাম গ্রহণ করো তবে আমি তোমাকে আনন্দচিত্তে গ্রহণ করবো। তোমার মত সুশিক্ষিতা সুন্দরী ও সাহসিনী মেয়েকে বধূরূপে পেয়ে আমি নিজেকে ধন্য মনে করবো।
তুমি যদি রাজি হও তবে শীঘ্রচলে এসো। …(পৃ.৯২-৯৩)

অলোকা রেজাশাহের প্রত্যুত্তর পত্র পেয়ে আনন্দে আপ্লুত হলো। সে আর সময় নষ্ট না করে প্রিয়তম পুরুষের আহবানে সাড়া দেয়ার প্রস্তুতি গ্রহণ করতে লাগলো। পাঁচটি লৌহ সিন্দুকে সংরক্ষিত সোনা-দানা, হীরা মণিমুক্তা, পোশাক-পরিচ্ছদ ও প্রসাধন সামগ্রীর কিছুই সে না নেয়ার সংকল্প করলো। কেননা, এসবই রাজার অবৈধ উপার্জন থেকে সংগৃহীত। সে তার পবিত্র সম্পর্কে অবৈধ সম্পদ থেকে দূরে থাকবে। তাই সে সন্ধ্যার পর অতি সাধারণ বেশে অসাধারণ রূপে অন্ধকার পরিবেশে চরণ দাসের সঙ্গে হেঁটে মুসলিম সেনা শিবিরে এসে পৌঁছালো। বুরহান উদ্দীনের সাথেই তার প্রথম সাক্ষাৎ হলো। বুরহান উদ্দীন তাঁকে পিতৃস্নেহে মুসলিম শিবিরে বরণ করে নিলেন। অলোকাও এই প্রবীণের পিতৃস্নেহে আবেগে আপ্লুত হলেন। অতঃপর শেখ বুরহান উদ্দীন স্বীয় স্ত্রী হামিদা বানুর কাছে তাকে নিয়ে গেলেন। সেখানে তাদের আতিথেয়তায় অলোকার আনন্দাশ্রু ঝরলো। অতঃপর সাধক পুরুষ হজরত শাহজালালকে বুরহান উদ্দীন অলোকার বিষয়ে বিস্তারিত অবহিত করলেন। শাহজালাল (র.) আনন্দচিত্তে তাকে ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত করলেন। শেখ বুরহান উদ্দীন তার নতুন নাম রাখলেন নুরুন নাহার। অলোকাও এইনতুন নামে খুশি হলো। পরবর্তী সময়ে সিকান্দর শাহের সঙ্গে আলোচনা করে তার উপস্থিতিতে রেজাশাহ-অলোকার শুভ পরিণয় সুসম্পন্ন হলো। হজরত শাহজালাল নবদম্পতির সুখী ও সুন্দর জীবনের জন্য দুআ’ করলেন। মুসলিম সেনা শিবিরের সব সদস্য এ সংবাদে খুশি হলেন এবং নবদম্পতির র্দীঘ আয়ু ও উজ্জ্বল ভবিষ্যত কামনা করে দুআ’ করলেন।

হজরত শাহজালালের বিপরীত মেরুর চরিত্র রাজা গৌড় গোবিন্দ, আচক নারায়ণ, সেনাপতি চক্রপানি, মন্ত্রী মনা রায়, সভাসদবর্গ ও গৌড় গোবিন্দের সেনাবাহিনি। এসব চরিত্র আলোচ্য উপন্যাসের ঘটনাপ্রবাহ ও মুসলিম চরিত্রসমূহের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। সেহেতু, পৃথকভাবে এদের চরিত্র চিত্রায়ণ নিষ্প্রয়োজন।

আলোচ্য উপন্যাসে চারটি স্বপ্ন বর্ণিত হয়েছে। যে স্বপ্নগুলি দ্রষ্টাদের চিন্তা থেকে উদ্ভুত এবং ভবিষ্যত কর্মকান্ডের পথনির্দেশক। প্রথম স্বপ্নটি রাজা গৌড় গোবিন্দের- যেখানে তার রাজ্য হারানোর কথা বর্ণিত হয়েছে (পৃ.১৪-১৫)। দ্বিতীয় স্বপ্নটিও রাজা গোবিন্দের- যেখানে শিশু জালালের মৃত দেহ, শেখ বুরহান ও হামিদা বানুর কর্তিত হাতের রক্তে সমগ্র অঞ্চল ও সুরমা নদী প্লাবিত হচ্ছে। যা তার রাজ্যের জন্য অশনি সংকেত (পৃ.২৪-২৫)। তৃতীয় স্বপ্নটি শেখ বুরহান উদ্দীনের- যেখানে হজরত শাহজালালের সিলেট আগমনের কথা বর্ণিত হয়েছে (পৃ.৩০-৩১)। চতুর্থ স্বপ্নটি হজরত শাহজালালের – যেখানে তার ভারতবর্ষে আগমনের কথা বর্ণিত হয়েছে। এসব স্বপ্ন উপন্যাসের আখ্যান ও চরিত্রের দিক নির্ণায়ক হিসেবে বিবেচিত হয়েছে।

এ উপন্যাসে কিছু অসঙ্গতিও পরিলক্ষিত হয়। যেমন – ‘রাজা গৌড় গোবিন্দ সকালবেলা মন্ত্রী মনারায়ের সঙ্গে ভ্রমণে বেরিয়েছিলেন। হাঁটতে হাঁটতে তেরবেতনের টিলার কাছে পৌঁছে গিয়েছিলেন। এখানে এসে টিলার উপর আযানের ধ্বনি শুনতে পান।’ (পৃ.৬) -এখানে লেখক সকাল বেলায় ফজরের আযানের ধ্বনি শোনার কথা বলেছেন। অথচ সালাতুল ফজরের আযান সুবহে সাদিকের সময় ধ্বনিত হয়, যে সময়ে একজন হিন্দু রাজার বাইরে আসার কথা নয়। অর্থাৎ আলোচ্য ঘটনাংশে ঔচিত্যবোধের অভাব রয়েছে।

শাহজালালের জায়নামায উপন্যাসে লেখক ভাষা ব্যবহারে প্রমিত বাংলা ভাষার পাশাপাশি আঞ্চলিক ভাষাও ব্যবহার করেছেন, তবে তা সীমিত। যেমন-
-আপনে গিয়া ওদের মতলবটা জাইনা আহুই না। যদি এহানে যুদ্ধ-টুদ্ধ বাইজা যায়। তার আগেই বউ পোলাপান লইয়া দূরে চইলা যাই।
-আমি তো এহন সোজা অইয়া খাড়াবার পারি না। যামু কিবায়?
-মাতববর ভাই, আপনে একটা নায় চইড়া যান।
-তাহলে একটা নায় আমাকে তুইলা নু। ওদের কাছে যা বলা দরকার আমিই বলমু। (পৃ.৪৬)
আলোচ্য উপন্যাসে কোথাও কোথাও লেখক চমৎকার আবেগময়ী ভাষা প্রয়োগ করেছেন। যেমন-
গতকাল সবার বুকে ছিল আনন্দ, মুখে ছিল হাসি। আজ তাদের বুকে বিদ্ধ হয়েছে শেল। চোখে নেমেছে অশ্রুর বান।
সবার মুখে হায় আল্লাহ! একি হলো। বুরহান উদ্দীনের ভবিষ্যত আশার গোলাপ ধুলিস্মাত হয়ে গেল। (পৃ.৩০)
শাহজালালের জায়নামায উপন্যাসে লেখক বিভিন্ন অলঙ্কার ব্যবহার করেছেন। যেমন-

চিত্রকল্প :
পায়ের নিচে উতলা ব্রহ্মপুত্র ঢেউ তুলে ছুটে যাচ্ছে কোথায় কে জানে। পাল উড়িয়ে নৌকা যাচ্ছে। ছোট বড় মাঝিরা অনেক রকম। মাঝিরা গান গাচ্ছে। কতজনের মুখে কত সুরের সে গান। (পৃ.৫২)

উপমা :
** কিছুদিন পর কর্তিত হাতের যন্ত্রণা তবু খানিকটা ভুলতে পারলেন, কিন্তু পুত্রশোকের যন্ত্রণা ভুলতেপারলেন না।
বুকে বিষাক্ত তীরবিদ্ধ যন্ত্রণার মতো অনবরত ব্যথা অনুভব করতে লাগলেন বুরহান উদ্দীন।(পৃ.৩০) ** জ্যোৎস্না ধোয়া দুধের মতো সাদা পৃথিবী। (পৃ.৫১)
** রাজা আচক নারায়ন শয়তানের মতই ধূর্ত। (পৃ.১০৫)
** প্রতীক্ষার দিনগুলো শীতকালের মতো। শীতের হিমেল হাওয়ায় পাতা ঝরা গাছগুলো যেমন নির্বাক
দাঁড়িয়ে থাকে, পাখ-পাখালির কণ্ঠের গান রুদ্ধ হয়ে যায়, মানুষ জীব-জন্তু সবাই শীতে কাঁপতে
কাঁপতে যেমন বসন্তের অপেক্ষা করে, তেমনি আমাদের এ অপেক্ষা। (পৃ.১১১)

রূপক :
** এখন রাত একটা। বিছানায় শুতে গিয়ে শুতে পারছি না। ঘুম আসছে না। বারবার তোমার চাঁদমুখ
মনের মুকুরে ভেসে উঠছে। (পৃ.৯০)

প্রবাদ
** যতক্ষণ শ্বাস, ততক্ষণ আশ। (পৃ.৮৭)
** যদি না পারো বলে/ তাহলে চেষ্টা করো/ কৌশলে ও ছলে। (পৃ. ৮৮)
** শরম করলে তো / গরম ভাত খাওয়া যাবে না। (পৃ.৮৮)

পরিশেষে বলা যায় শাহজালালের জায়নামাজ উপন্যাসে লেখক আবদুল হালিম খাঁ সিলেট অঞ্চলে ইসলামী জীবন বিধান প্রচার ও প্রসারে হজরত শাহজালাল র. এর অবদান এখানে চমৎকার ভাষায় উপস্থাপন করেছেন। তৎকালীন সিলেটের রাজা গৌড় গোবিন্দের অন্যায়-অত্যাচার, মুসলিম বিদ্বেষ ও শোষণের চিত্র বর্ণনার পাশাপাশি ইসলামের মাহাত্ম্য ও উদারতাকেও উপস্থাপন করেছেন। আলোচ্য উপন্যাসের আখ্যান, চরিত্র চিত্রণ, দেশকালের প্রেক্ষাপট বর্ণনা এবং অলঙ্কার প্রয়োগে তিনি কুশলতার পরিচয় দিয়েছেন। ইতিহাস থেকে উপাদান সংগ্রহ করে সেখানে রোমান্সের সংমিশ্রণ ঘটিয়ে পাঠককে উপন্যাসের ভিন্ন স্বাদ উপহার দিয়েছেন।

ড. ইয়াহ্ইয়া মান্নান

ড. ইয়াহ্ইয়া মান্নান

জন্ম:- ২ ফেব্রুয়ারি ১৯৭২, জামদিয়া, বাঘারপাড়া, যশোর। 

পেশা- কলেজ শিক্ষক (সহকারী অধ্যাপক, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় মূল ক্যাম্পাস)

আগ্রহ- গবেষণা, গল্প ও প্রবন্ধ

সম্পাদনা - বনফুলের ছোটগল্প (২০১৭, ইত্যাদি গ্রন্থপ্রকাশ, ঢাকা।

প্রকাশিত গ্রন্থ-
আল মাহমুদ ও বিচিত্র অনুষঙ্গ (প্রবন্ধ গ্রন্থ-২০০৭, প্রীতি প্রকাশন, ঢাকা)
আল মাহমুদের উপন্যাস: বিষয় ও চিন্তা (গবেষণাগ্রন্থ - ২০০৭)
শামসুদদীন আবুল কালামের উপন্যাসে সমাজ বাস্তবতা (গবেষণাগ্রন্থ-২০০৮, ইত্যাদি গ্রন্থ প্রকাশ, বাংলা বাজার, ঢাকা।)
ইবরাহীম খাঁর সাহিত্য সাধনা ও চিন্তাধারা (গবেষণাগ্রন্থ, ২০১৭, ইত্যাদি গ্রন্থ প্রকাশ, বাংলা বাজার, ঢাকা)

ইমেইল- dr.eahea.m@gmail.com

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আবদুল হালিম খাঁ রচিত শাহজালালের জায়নামায উপন্যাসের শৈল্পিক নির্মিতি

লেখকঃ ড. ইয়াহ্ইয়া মান্নান