অ্যাপোলো বনাম মারসিয়াস

দেবি এথিনী একদিন বনের ভেতর বাঁশি বাজিয়ে যাচ্ছেন। বাঁশির সুর বন জঙ্গলের আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে পড়ছে আর চারদিকে মুগ্ধ পরিবেশের সৃষ্টি করছে। গাছের ডালে ডালে পাখির মনমাতানো সুরকে ছাড়িয়ে তা দূরে বহুদূরে ধ্বনিত প্রতিধ্বনিত হচ্ছে।

বনের ধারে নদীর পাড়ে মেষ চড়াচ্ছে মারসিয়াস নামে এক রাখাল। এথিনীর বাঁশির সুর তার কানেও পৌঁছে। সে জঙ্গলে লুকিয়ে থেকে কান পেতে শুনতে চেষ্টা করে কার কণ্ঠ থেকে ভেসে আসছে এমন মধুর সুর।

দেবি এথিনী নদীর তীরে এসে বসেন। তার বাঁশি বাজানো তখনো চলছে। অসাধারণ সুন্দরী দেবি এথেনী! ঝরনার পাশে গাছের ছায়ায় বসে বাঁশি বাজাচ্ছেন। দুধের মতো সাদা দুই হাঁটুর নিচের অংশ অনাবৃত।
মুহূর্তের জন্য তার চোখ পড়ে ঝরনার ওপর। পানির উপর নিজের চেহারা দেখে তিনি নিজেই বিরক্ত হন। দুই গালই তার ফোলা। হবেই তো। গাল-মুখ না ফুলিয়ে কেউ কি বাঁশি বাজাতে পারে? তারপরেও দেবি নিজের প্রতি নিজে বিরক্ত হয়ে বলেন, ছিঃ এমন বাজে চেহারা আমার! আমার সৌন্দর্য আমি নিজেই নষ্ট করেছি। সঙ্গে সঙ্গে বাঁশিটি তিনি ঝরনার জলে ফেলে দেন। সাথে সাথে চারদিকে নীরবতা নেমে আসে।

রাখাল মারসিয়াস কাছেই লুকিয়ে লুকিয়ে এতোক্ষণ দেবির বাঁশি বাজানো শুনছিলো। এথিনী দেবি ঝরনার জলে বাঁশি ফেলে দিয়েছেন সেটাও তার নজর এড়ায় না। সে ভাবে, ইচ্ছে করলে বাঁশিটি সে তুলে আনতে পারে।

যেমন ভাবনা তেমন কাজ। বেশি পানিতে নামতে হয় না তাকে। অল্প পানিতে নেমেই বাঁশিটি সে হাতে নেয়। ঠোঁটে লাগিয়ে সুরও তুলে। একটা দৈব সুর যেনো বেরিয়ে আসে বাঁশির ভেতর থেকে। নিজের বাঁশির সুরে সে নিজেও মোহিত হয়। বাঁশি ছাড়া সে আর কিছু বুঝে না। দিনরাত তার বাঁশির সুরে মাঠে-ঘাটে, বন-বনানি ধ্বনিতে প্রতিধ্বনিত হয়। তার মেষ পালও বাঁশির সুরে মুগ্ধ। আপন মনে সে বাঁশি বাজাচ্ছে। অন্য কোনোদিকে খেয়াল নেই।

এই সুযোগে হিংস্র নেকড়েরা তার পালের ওপর আক্রমণ করে। নেকড়েরা তার মেষের পালে হামলা করে দুই একটা নিয়েও যাচ্ছে। কিন্তু সেদিকেও তার খেয়াল নেই। সে জানেও না, নেকড়েরা তার মেষ নিয়ে যাচ্ছে । সে আপন মনে বাঁশি বাজিয়ে যাচ্ছে। তার গান শুনে বনদেবিরা পাহাড়ের আড়াল থেকে বেরিয়ে আসছে। এ যেনো বহুকালের দক্ষ বংশিবাদক।

নিজের বাঁশির সুরের এমন মূর্ছনায় সে বেশি আত্মহারা হয়ে ওঠে। এক সময় সে মনে করে তার সুরের এমন কারুকার্যে বাঁশির কোনো ভুমিকা নেই। সবই তার নিজের কৃতিত্ব। তার ভেতর অহঙ্কার নেমে আসে। সে ভাবে, অ্যাপোলোও তার মতো ভালো বাজাতে পারেন না, আসুক অ্যাপোলো, নিজেই দেখুক। সকলেই স্বীকার করবে, আমিই সেরা।

সামান্য রাখালের এ ধরনের দম্ভ সাথে সাথেই দেবতা অ্যাপোলোর কাছে পৌঁছে। রাখালের এ ধরনের অহঙ্কারে তার ক্রোধ জেগে ওঠে। তিনি সিদ্ধান্ত নেন তাকে উচিত শিক্ষা না দিয়ে ছাড়বেন না।
দেবতারা সাধারণত মানুষের শ্রেষ্ঠত্ব মেনে নেন না। অ্যাপোলোও তার ব্যতিক্রম থাকবেন কেনো। তিনি তার শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করার জন্য নিরীহ রাখাল মারসিয়াসের সাথে প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হবেন জানিয়ে দেন। পরিকল্পনামাফিক তিনি অন্যান্য দেবতাদের সাথে যোগাযোগ করেন। কাব্য-সঙ্গীতের নয়জন দেবতা। তাদের সাথেও যোগাযোগ করেন অ্যাপোলো। দেবতাদের সাথে মানুষের তুলনা! সাহস তো কম নয়। মারসিয়াসকে তিনি শাস্তি না দিয়ে ছাড়বেন না।

বনের ভেতর সুন্দর একটি জায়গা বেছে নেওয়া হয়। নির্দিষ্ট দিনে সকলে সেখানে হাজির। অ্যাপোলোর সমর্থকরাও কেউ বাদ যান না। কারণ দেবতার সঙ্গে মানুষের প্রতিযোগিতায় অ্যাপোলোকে হারলে চলবে না। তাহলে যে দেবতাদেরই অপমান। মারসিয়াসও এসেছে। প্রথমেই মারসিয়াসের পালা। তার বাঁশির সুরে সকলে সন্তুষ্ট। সন্তুষ্ট কাব্য ও সঙ্গীত জগতের দেবতারাও। তাদের বিশ্বাসই হচ্ছিলো না মানুষের কণ্ঠ থেকে এতো সুন্দর সুর বেরিয়ে আসতে পারে। এ যেনো স্বর্গীয়! তার সুরে বিটোফেনেরও ( বিখ্যাত জার্মান সঙ্গীতজ্ঞ ) ঈর্ষা না হয়ে পারতো না।
-উপস্থিত দেবতারা রায় দেন মারসিয়াস খুব সুন্দর গেয়েছে।

এবারে অ্যাপোলোর পালা। স্বর্গের দেবতা, তার সবকিছুই স্বর্গীয়। দেবতারাও খুশি। কিন্তু তার পরেও তারা যেনো দ্বিধা-দ্বন্দ্বে পড়ে যান। কে বেশি ভালো করেছে নির্বাচন করতে ব্যর্থ হন। শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত হয় দুইজনের মধ্যে আবারো প্রতিযোগিতা হবে।

এবারেও প্রথমেই মারসিউসের পালা। মারসিউস আগের চেয়েও বেশি মনোযোগ দিয়ে শুরু করে। মন-প্রাণ ঢেলে দেয় সে তার সঙ্গীতে। তার সুরে এবার স্বর্গীয় প্রসাদ। দেব-দেবিরা সন্তুষ্ট। তাকে তারা বাহবা দেন।

এবারে প্রতিযোগিতার চূড়ান্ত পর্ব। আসেন দেবতা অ্যাপোলো। প্রথম পর্যায়ে অ্যাপোলো তার প্রতিযোগিতায় মানবিক পর্যায়েই সীমিত ছিলেন। এবারে তিনি তার আসল চেহারা, অর্থাৎ দৈব-ক্ষমতা নিয়ে প্রতিযোগিতায় অবতীর্ণ হন। মারসিয়াসকে হারাতে বেশি সময় নেন না তিনি। দেবতারা যেমন অমর, তাদের যা কিছু ক্ষমতা, দেবতা জিউস কেড়ে না নিলে, সেগুলোও অমর। অ্যাপোলোর গান, তার কণ্ঠ, সুর, তাল লয় সবই স্বর্গপ্রদত্ত। সেখানে মারসিয়াস প্রতিযোগিতায় টিকবে এ কথা ভাবাই যায় না। স্বভাবতই সে হেরে যায়। বিচারকমণ্ডলী অ্যাপোলোকে বিজয়ী ঘোষণা করেন।

মারসিউসের প্রতি অ্যাপোলোর ক্রোধ আগের চেয়ে বেড়ে যায়। তাকে তিনি কঠিন শাস্তি দেবেন। সূর্য পশ্চিমে অস্ত যাচ্ছে। অ্যাপোলো নিরীহ মারসিয়াসকে গাছের সাথে বেঁধে নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করেন।
মারসিয়াসের করুণ মৃত্যুতে তার সঙ্গী বন-দেবতারা চোখের পানি ধরে রাখতে পারে না। তাদের চোখের পানির মিলিত ধারা নদীর রূপ ধারণ করে। নদীর নাম রাখা হয় মারসিয়াস। হতভাগা মারসিয়াসকে স্মরণ রাখতেই এ নাম।

স্বর্গের দেবতারা শক্তিশালী। মর্ত্যের মানুষকে নিয়ে তারা খেলা করেন। আনন্দ-ফুর্তি করেন। তারা নিজেদের প্রতিহিংসা চরিতার্থ করেন। পৃথিবীর নিরীহ মানুষ তাদের এ ধরনের প্রতিহিংসার শিকার। সামান্য রাখাল বালকের ক্ষণিকের অহঙ্কার দেবতা অ্যাপোলোর সহ্য হলো না। দেবতা অ্যাপোলোর ক্ষমতাকে খর্ব করার মানসিকতা নিয়ে অ্যাপোলোকে তার সামনে আসতে বলেনি মারসিয়াস। বরং নিজের গানের অসাধারণ ক্ষমতার ওপর তার একটা আত্মবিশ্বাস থেকেই সে অ্যাপোলোর কথা বলেছিলো। দেবতার প্রতি কোনোরকম অশ্রদ্ধা পোষণ করার মানসিকতা নিয়ে নয়। কিন্তু দেবতাকে কে বোঝাবে।

আসল কথা, দেবতারা যেমন কারো প্রতি সদয় হতে পারেন, আবার কারো প্রতি নির্দয়ও হতে পারেন। কোনো কোনো সময় তা বেশি ভয়ঙ্কর হয়ে ওঠে। যখন কোনো মানুষ তাদের ক্ষমতাকে চ্যালেঞ্জ করে, বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছে বলে তাদের মনে হয় তখনি তারা বেশি অসহিষ্ণু হয়ে ওঠেন। তার বিরুদ্ধে নিষ্ঠুর পথ বেছে নেন। প্রয়োজন মনে করলে তাকে হত্যাও করেন। তা হন তিনি রাজা, না হয় প্রজা।
নিরীহ রাখাল মারসিয়াস। নিজের প্রতি তার সামান্য অহঙ্কারও অ্যাপোলোর সহ্য হলো না। নিষ্ঠুরভাবে তাকে প্রাণ দিতে হলো দেবতার হাতে।

গ্রন্থনাসূত্রঃ ১. ব্রিটানিকা; ২. গ্রিক মিথস ( রবার্ট গ্রেভস ); ৩. লিজেন্ডস অব গ্রিস এন্ড রোম ( গ্রেইস এইচ, কুপার ); ৪. দ্য পেঙ্গুইন ডিকশনারি অব ক্লাসিকাল মিথালজি; ৫. গ্রিক মিথালজি ( হ্যামিলটন); ৬. ইন্টারনেট

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

অ্যাপোলো বনাম মারসিয়াস

লেখকঃ মোহাম্মদ শাহজাহান