অতি আদরের হীরা

একদা একদেশে এমন এক ব্যক্তি বাস করতো, তার অস্বীকৃত দৃঢ় সংকল্প ছিল এমন এক রমণীকে বিয়ে করা যার একের অধিক প্রেমিক থাকবে না। একদিন ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা জানালো, “হে প্রভু যদি আমার সংকল্পে প্রকৃত সত্যি ও আন্তরিকতা থাকে, তাহলে এটা যেন ঘটে যে, আমি যদি আমার দেহটাকে দুটো সমান ভাগে কাটতে পারি যার অর্ধেকটা থাকবো আমি নিজে আর বাকি অর্ধেকটা যেন এক নারীরুপে পরিণত হয় যাকে আমি বউ হিসাবে বিয়ে করতে পারি।’’

এই কথা বলে সে তার দেহটাকে দুই খন্ডে কেটে ফেললো। সত্যতা আর সততার বলে তার প্রার্থনা ন্যায্য ভাবে মঞ্জুর হলো; দেহের একটা অংশ হল সে নিজে, আর অপর খন্ডটা এক নারীরুপ ধারণ করলো। কিন্তু দেহটা চিড়ার সময় অল্প কয়েক ফোটা রক্ত তার থেকে নির্গত হয়ে কাছেই এক গাছের উপর পড়লো। এই রক্ত তৎক্ষণাৎ সাপে পরিণত হলো। এই পুরুষ এবং মহিলা উভয়েই এই ঘটনা সম্পর্কে একেবারেই অজ্ঞ রয়ে গেলো। নিজের আকাঙ্ক্ষা পূরণ হওয়ায় লোকটা অপার আনন্দে উদ্বেলিত। নিজের দেহজাত নারীর সাথে আনুষ্ঠানিক ভাবে তার বিয়ে হয়ে গেলো এবং এই ভেবে পরিতৃপ্ত হলো যে, যে নারী তার দেহের অর্ধেক অংশ থেকে জন্ম নিলো দ্বিতীয় কোন পুরুষের সাথে তার কখনো অবৈধ সম্পর্ক থাকতে পারে না।

সে প্রাণ ভরে দাম্পত্য জীবনের আশীর্বাদ উপভোগ করতো। কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয় হল ঐ মহিলা পুরুষটার নিজ রক্তজাত সাপটার সাথে গোপন সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ে এবং কার্যত সাপটাকেই তার উপপতি হিসাবে গ্রহণ করে। স্বামী বেচারী সাপের সাথে তার স্ত্রীর এই গোপন সম্পর্কের কথা ঘুণাক্ষরেও জানতো না । কিন্তু সাপটা সব সময় পথের বাঁধা স্বামীটির কাছ থেকে নিস্কৃতি পাওয়ার ফন্দি আঁটতো।

একদিন লোকটি যখন একটি গাছের নিচে উবু হয়ে বসে প্রাকৃতিক কাজ সারতে ব্যস্ত, এক বদনা জল পাশে নিয়ে স্বামীর প্রাণসংহারে বদ্ধপরিকর সাপটি সুযোগ পেয়ে গেলো এবং গাছের ডালে একটা সুবিধাজনক জায়গায় অবস্থান নিয়ে তার মস্তকে মারাত্মক ভাবে আঘাত করার উপক্রম করলো।

কিন্তু হঠাৎ করে লোকটি আক্রমণোদ্যত সাপটির ছায়া দেখতে পেলো বদনার স্বচ্ছ জলের মধ্যে এবং এভাবে আসন্ন বিপদ সম্পর্কে সতর্ক হয়ে সাপটিকে তিন টুকরো করে কেটে তার জবাব দিলো। এরপর লোকটি দ্রুত বাড়িতে ছুটলো এবং ঘটনাটি স্ত্রীকে বর্ণনা করলো। কিন্তু স্ত্রী স্বামীর কথায় মোটেই খুশী না হয়ে বরং দুঃখ পেলো। মনে মনে শোক সন্তাপে ভারাক্রান্ত হলো যে তার উপউপতিকে জীবন দিতে হলো তারই পতির হাতে।উপপতির মৃত্যুর প্রতিশোধ স্পৃহা তার মনে উঁকি দিতে লাগলো।

এই কু-মতলবে মহিলা দ্র্রুত বেগে ঘটনাস্থলে গেলো এবং সাপটির তিন টুকরো দেখতে পেয়ে হাউমাউ করে কাঁদতে কাঁদতে স্বামীর মৃত্যু কামনা করে সাপের মাথাটা নিজের হাতে নিয়ে বাড়ি ফিরলো। কয়েকদিন পরে মহিলা স্বামীকে বললো, “ প্রিয়তম আমাদের সুখের পিয়ালাতো টইটুম্বুর, ভাগ্য নিয়ে আমার আপসোস করার কিছুই নেই। সবকিছুই কিন্তু তোমার আনুকূল্য আর দয়াতেই হয়েছে। কিন্তু একটা বিষয়ে আমার তীব্র বাসনা রয়েছে। কাশি এবং জগন্নাথ এর মত পবিত্র স্থানে তীর্থ-যাত্রা করার প্রবল ইচ্ছা হয়েছে আমার। তাই, এমন পবিত্র স্থানে গমনের জন্য এক মাসের ছুটি কি তোমার কাছে প্রার্থনা করতে পারি?

আসলে সে তার স্বামীর জীবন সংহারের নিমিত্তে ফন্দি আঁটছিলো। কিন্তু দাম্ভিক বিশ্বাসপ্রবণ স্বামী ঘটনার কিছু বুঝতে পারলো না। সে কারণেই সেই বিখ্যাত প্রবাদ বাক্যের চল- “নারী হৃদয়ের তল পায়না, এমনকি ঈশ্বরও, না পারে বুঝিতে পুরুষের কপাল – মানুষ কোন ছার্।’’ তাই নির্বোধ লোকটা বিনা বাক্য ব্যয়ে সহজেই সম্মতি দিল, অনুমতি দিল কাঙ্খিত তীর্থযাত্রায় যেতে। মহিলা সাবধানে সাপের মাথাটা তার সাথে কাশী ও জগন্নাথ নিয়ে গেলো যেখানে মৃত সাপের নামে শেষকৃত্য অনুষ্ঠান সম্পন্ন করলো। তারপর স্বর্ণকারকে লকেট বানানোর জন্য পাঁচ তোলা আর মজুরী হিসাবে দশ তোলা রুপা দিয়ে সাপের মাথা দিয়ে একটি তাবিজ বানালো। তাবিজ বানানো হলে গোপনে গলায় পরে যথাসময়ে বাড়ি ফিরে এলো।

স্বগৃহে প্রত্যাবর্তনের পরপরই তার গলায় পরিহিত তাবিজ সম্পর্কে এক গোপন প্রহেলিকাময় প্রশ্নের সমাধান প্রসঙ্গে স্বামীর সাথে এক বাজি ধরার ফন্দি আাঁটলো। প্রহেলিকার উদ্দেশ্য আর কিছুই নয় স্বামীর জীবন নাশ করা। তার মিষ্টি কথার আড়ালে ছিল দুষ্ট মনের ছাপ। সে স্বামীকে বলল, “হে স্বামী এসো আমরা এক বাজি ধরি। যদি তুমি আমার জিজ্ঞাস্য প্রহেলিকার ঠিক ঠিক জবাব দিতে পার তাহলে তুমি আমার নাক কেটে চুল কেটে বাড়ি থেকে বের করে দিবে। আর যদি না পার তবে আমি তোমার জীবন হরণ করবো।’’ স্বামীকে এই শর্ত মানতে দৃঢ় শপথ করিয়ে নিল আর সরল স্বামীও নির্দ্বিধায় তা মেনে নিলো।

প্রতিশ্রুতি পাওয়া মাত্র সে ধাঁধাটা উত্তরের জন্য স্বামীর নিকট উত্থাপন করল, “কোন্ জিনিস তৈরিতে পাঁচ তোলা রুপা, আর দশ তোলা রুপা মজুরী লাগে যা হীরার চেয়েও আমার কাছে প্রিয়?’’

উত্তর খোঁজার প্রাণপণ চেষ্টা করেও স্বামী সঠিক সমাধান দিতে পারলো না। বাজিতে হেরে যাওয়ায় মহিলা স্বামীর প্রাণ সংহারে উদ্যত। স্বামী স্ত্রীর কাছে অন্তিম অনুরোধ করল, “আর কয়েকটা দিন আমাকে বাঁচতে দাও। আমার একটা বোন আছে। মরার আগে তার মুখটা শেষ বারের মত দেখতে দাও।’’ স্ত্রী স্বামীর এ অনুরোধ মঞ্জুর করল। স্বামী চার দিনের পথ দূরে বাস করা দিদিকে চরম সংকটের সংকেত জানিয়ে এক পত্র দিল। সে যে মৃত্যু পথযাত্রী, তাই অতি সত্বর আসার জন্য তাকে স্বনির্বন্ধ অনুরোধ করল। চিঠি পাওয়া মাত্র ভাইয়ের বাড়ির উদ্দেশ্যে দিদি রওনা দিল। ভাইয়ের বাড়ি যাওয়ার পথে রাত নেমে এলো বলে এক গাছের নিচে রাত যাপনের বিকল্প দেখল না।

ঐ গাছের চূড়ায় বাস করত এক চড়–ই দম্পতি। সে রাতের বেলায় জেগে থেকে স্ত্রী চড়ুইকে তার স্বামীর উদ্দেশ্যে বলতে শুনল, “গাছের পাদদেশে ঐ রমণীটি কে? আর কেনইবা সে এই রাত দুপুরে এখানে আশ্রয় চাইছে?’’ প্রথমে পুরুষ চড়–ইটা মুখ খুলতে চায়নি বরং সব ব্যাপারে আগ্রহের আতিশয্যের দরুণ তিরস্কার করে চুপচাপ থাকতে বললো। স্ত্রী চড়–ই এর ঘ্যান ঘ্যানানিতে পুরুষ চড়–ই বলতে শুরু করল, “ শোন তবে, নির্বোধ স্ত্রী একজন মহিলার অন্তর কত কুটিল হতে পারে। এই গাছের তলে এই মুহূর্তে আশ্রয় প্রার্থনা করছে যে রমনী, সে তার স্বামীর বাড়ি থেকে নিজেদের বাড়ির পথে। এর ছোট ভাই বৌ এর সাপরুপী উপপতির সাথে সম্পর্ক ছিল যে তার স্বামীর হাতে নিহত হয়েছে। উপপতির মৃত্যুর বদলা নিতে সে গোপনে স্বামীর বিরুদ্ধে চক্রান্ত করছে। ষড়যন্ত্রমূলক ভাবে সে তাই, পাঁচ তোলা রুপা দিয়ে একটা লকেট বানিয়েছে এবং যে কর্মকার বানিয়ে দিয়েছে তাকে দশ তোলা রুপা দিয়েছে। লকেটের মধ্যে সাপের মাথা পুরে সে সবসময় ওটা গলায় পরে থাকে। তার গলার লকেট নিয়ে সে একটা ধাঁধাঁ বানিয়েছে এবং তার সঠিক উত্তরের জন্য স্বামীর সাথে এক বাজিও ধরেছে। বাজির শর্ত হচ্ছে যদি ধাঁধাঁর সঠিক উত্তর পাওয়া যায় তবে স্বামী নাক, চুল কেটে তাকে বাড়ি থেকে বের করে দিবে। কিন্তু উত্তর না দিতে পারলে মূল্য হিসাবে তার প্রিয় জীবন দিতে হবে।

স্বামী বাজিতে হেরে যাওয়ায় স্ত্রীর হাতে তার জীবন যেতে বসেছে। কিন্তু স্বামী তার শেষ ইচ্ছে হিসেবে বড় দিদিকে এক নজর দেখার বাসনা বলে জানানোতে স্ত্রী তার অনুরোধে রাজি হয়েছে এবং বড় দিদিকে ডেকে পাঠানোর জন্য কিছু সময় তাকে মঞ্জুর করেছে। এ কারণে সে ছোট ভাইয়ের কাছে যাওয়ার পথে গাছের তলায় এসে পড়েছে। গাছের নিচে আশ্রয় প্রত্যাশী মহিলা পশু পাখিদের ভাষা বুঝতে দক্ষ ছিল বলে চড়–ই দম্পতির কথোপকথন সে মনোযোগ দিয়ে শুনছিলো। পূব আকাশে প্রভাতের প্রথম রেখা দেখা মাত্র দিদি দ্বিগুণ পায়ে বাড়ির দিকে ছুটে চলল।

বাড়িতে পৌঁছে সে ছোট ভাইয়ের খবরাখবর নিলো। তার দুর্দশার কথা কারণ জানতে চাইলো। ভাই অদ্ভুত প্রহেলিকায় হেরে যাওয়ার সব খবর দিদিকে জানালো।

দিদি সব চক্রান্তের খবর ফন্দিবাজি ধরে ফেললো। ভাইবউকে সামনে ডেকে তার গলার তাবিজ হেঁচকা টানে ছিঁড়ে ফেললো, লকেট খুলে তার ভেতর থেকে পূর্ণ অনাবৃত সাপের মাথা বের করলো। ওটাকে ভেঙ্গে টুকরো টুকরো করে সে ঝাঁঝাঁলো কন্ঠে বলল, “ এটাই তোমার ধাঁধাঁর সঠিক এবং যথার্থ উত্তর। দূরাত্মা মহিলা কোথাকার। এই তোমার হীরা যা তুমি এত জঁপ করতে যে তোমার স্বামী- আমার ছোট ভাই এর জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলছিলে।’’ এভাবে দুষ্টু, বেয়াদপ মহিলার পরিকল্পনা প্রকাশ করে বাজির শর্তানুযায়ী তার নাক, চুল কেটে বাড়ি থেকে বের করে দিলো।

শিশির কুমার রায়

শিশির কুমার রায়

শিশির কুমার রায়

জন্ম ২৫ ডিসেম্বর, ১৯৬৮ কুষ্টিয়া, খুলনা।

পেশায় অধ্যাপক। বিভাগীয় প্রধান, ইংরেজি বিভাগ কুষ্টিয়া সরকারি মহিলা কলেজ, কুষ্টিয়া।

আগ্রহ মূলত অনুবাদে। দেশের বিভিন্ন দৈনিক পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে অজস্র অনুবাদ। তিনি কাজ করেছেন বার্ড মুকুন্দ দাস ও কাজী নজরুল ইসলামের উপর। এখন পর্যন্ত ৩০৫টি নজরুলের গান ইংরেজিতে অনুবাদ করেছেন।

প্রকাশিত গ্রন্থ-

ইমেইল: ggck.kushtia@gmail.com

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

%d bloggers like this: